পানিতে ডুবে পবিপ্রবির শিক্ষার্থীর মৃত্যু
অন কলে থাকা চিকিৎসককে অবহেলার অভিযোগে ওএসডি
মেডিভয়েস রিপোর্ট: পানিতে ডুবে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (পবিপ্রবি) মৃত্যুর ঘটনায় দায়িত্বের অপেক্ষায় (অন কল) থাকা চিকিৎসককে দায়িত্ব অবহেলার অভিযোগে বরখাস্ত করার প্রতিবাদে মানববন্ধন ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজের চিকিৎসক-শিক্ষার্থী ও নার্সিং ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা। এ ছাড়া তিন দফা দাবিতে হাসপাতালের বহির্বিভাগের চিকিৎসাসেবা বন্ধ করে দেন ইন্টার্ন চিকিৎসকরা।
আজ বৃহস্পতিবার (১৭ এপ্রিল) দুপুর ১২টায় দিকে প্রশাসনিক ভবনের সামনে প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী কর্মসূচিতে তিনদফা দাবি ঘোষণা করেন তাঁরা।
দাবিগুলো হচ্ছে—ডা. শামীম আল আজাদের ওএসডির আদেশ প্রত্যাহার, হাসপাতালে নিরাপত্তা নিশ্চিত ও নতুন ভবন চালু করা।
জানতে চাইলে মানববন্ধনে অংশ নেওয়া পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ সামিত আজ বৃহস্পতিবার (১৭ এপ্রিল) রাতে মেডিভয়েসকে বলেন, এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় জেলা প্রশাসন একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তবে কমিটির কাজ শেষ হওয়ার আগেই দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে ‘অন কলে’ থাকা কার্ডিওলজি বিভাগের জুনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. এ এস এম শামীম আল আজাদকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়েছে, যা অযৌক্তিক।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দফায় দফায় বিক্ষোভ করার পর বুধবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তাকে ওএসডি করতে বাধ্য হয়।
তিনি আরও বলেন, ‘এমনকি আমাদের কাছে এমন তথ্যও রয়েছে যে, এত বড় একটি ছেলে, যার আশপাশে দশ-বারো জন বন্ধু ছিল। এতো মানুষের উপস্থিতিতে তাকে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে কিংবা জোরপূর্বক পানিতে ফেলে দিয়েছিল কি-না, সেটিই আসল বিষয়। এটি সন্দেহজনক। কিন্তু তারা সেই বিষয়ে তদন্ত না চেয়ে পুরো দায় আমাদের হাসপাতালের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।’
এ প্রসঙ্গে দায়িত্বে অবহেলার মুখে থাকা ডা. শামীম আল আজাদ আজ বৃহস্পতিবার (১৭ এপ্রিল) সন্ধ্যায় মেডিভয়েসকে জানান, গত ১৪ এপ্রিল বিকেল ৪টা ২২ মিনিটে অন কলে থাকা অবস্থায় হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের অন্তর্বিভাগে দায়িত্বরত ইন্টার্ন চিকিৎসক তাকে জানান যে, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ১৯ বছর বয়সী এক ছাত্র পানিতে ডুবে অচেতন অবস্থায় ভর্তি হয়েছেন।
‘আমি জানতে পারি, রোগী অচেতন, নাক ও মুখ দিয়ে রক্ত ও ফেনা বের হচ্ছে, নাড়ি দুর্বল এবং রক্তচাপ মাপা সম্ভব হচ্ছে না। এরপর আমি তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসা শুরুর নির্দেশনা দিয়ে ন্যাসোগ্যাস্ট্রিক সাকশন, অক্সিজেন প্রয়োগ, নেবুলাইজেশন, শিরায় স্যালাইন, ইনজেকশন কর্টিসন, ক্ল্যামক্স ও ক্যাথেটারাইজেশন প্রয়োগের পরামর্শ দিই। একই সঙ্গে আমি নিজেও দ্রুত হাসপাতালে যাওয়ার প্রস্তুতি নিই’—যোগ করেন তিনি।
ডা. শামীম আল আজাদ জানান, হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তিনি সহকারী অধ্যাপক, তত্ত্বাবধায়ক এবং ইনচার্জ নার্সের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং রোগীর অবস্থা ও গ্রহণযোগ্য চিকিৎসা সম্পর্কে সবাইকে অবহিত করেন।
তিনি বলেন, ‘বিকাল ৪টা ৩৭ মিনিটে আমি হাসপাতালে পৌঁছাই। তখন পরিবেশ ছিল অস্বাভাবিক, আতঙ্কজনক। বিশ্ববিদ্যালয়ের শতশত শিক্ষার্থী ওয়ার্ড ও বারান্দায় অবস্থান করছিলেন, ইতোমধ্যে দু’দফা ভাঙচুরও হয়েছে। দায়িত্বরত ইন্টার্ন চিকিৎসক, জরুরি বিভাগের চিকিৎসক, নার্স এবং আয়ারা সবাই ভীত ছিলেন।’
তিনি জানান, রোগীকে পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, নাড়ি স্পন্দন ও রক্তচাপ নেই, হৃদস্পন্দন ও শ্বাসপ্রশ্বাস অনুপস্থিত। হাই-ফ্লো অক্সিজেন ও অন্যান্য চিকিৎসা চলছিল। এরপর তিনি দ্রুত সিপিআর শুরু করেন এবং তিনটি সাইকেলে প্রয়োগ করেন, কিন্তু কোনো জীবনচিহ্ন ফিরে আসেনি।
হাসপাতালে চিকিৎসা সুবিধার সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এই হাসপাতালে তথাকথিত যে আইসিইউ রয়েছে, সেখানে প্রশিক্ষিত জনবল, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, ভেন্টিলেটর বা ইনটিউবেশনের ব্যবস্থা নেই। শুধু কয়েকটি মনিটর ও হাই-ফ্লো অক্সিজেন আছে, যা প্রকৃত আইসিইউ সুবিধা নয়।’
তিনি দাবি করেন, রোগীর বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হলেও, তদন্ত শেষ না করেই তাকে ওএসডি করা হয়েছে—যা অনভিপ্রেত ও অযৌক্তিক।
ওই রাতেই জেলা প্রশাসক আবু হাসনাত মোহাম্মদ আরেফীন, পবিপ্রবির উপাচার্য অধ্যাপক কাজী রফিকুল ইসলাম ও পুলিশ সুপার মো. আনোয়ার জাহিদ দ্রুত হাসপাতালে উপস্থিত হয়ে শিক্ষার্থী ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেন। পরে আট সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করা হয়। এরপর আশিকের মরদেহ হাসপাতাল থেকে ময়নাতদন্ত না করেই নিয়ে যান বন্ধুরা।
জানতে চাইলে পটুয়াখালী ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক দিলরুবা ইয়াসমিন রাতে মেডিভয়েসকে বলেন, ‘ডা. এ এস এম শামীম আল আজাদকে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে বরখাস্ত করার বিষয়ে অবহিত আছি এবং অন-কল দায়িত্বে থাকার বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।’
এর আগে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ঢাকা-কুয়াকাটা মহাসড়কের লেবুখালী এলাকায় পায়রা সেতুর টোল প্লাজা অবরোধ করে বিক্ষোভ মিছিল ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন পবিপ্রবির শিক্ষার্থীরা। এ সময় ‘দোষী চিকিৎসকের’ বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে কঠোর আন্দোলনের হুশিয়ারি দেন তাঁরা।
এ বিষয়ে পবিপ্রবি’র প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রোভিসি) অধ্যাপক ডা. এস. এম. হেমায়েত জাহান আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বিষয়ে মেডিভয়েসকে বলেন,‘আমরা শিক্ষার্থীদের বলেছিলাম, যেন তারা জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে যেন আন্দোলন না করে। তারা আমাদের কথা শুনেছে এবং ক্লাসে ফিরে গেছে।’
টিআই/এমইউ