বিপ্লব পরবর্তী মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা: গবেষণা
মেডিভয়েস রিপোর্ট: জুলাই-আগস্ট বিপ্লব পরবর্তী মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন আন্দোলনে অংশ নেওয়া বাংলাদেশের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা। জুলাই-আগস্ট বিপ্লব পরবর্তী সময়ে আন্ডারগ্রাজুয়েট এবং পোস্ট গ্রাজুয়েট শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে গবেষণা শীর্ষক বিশেষ সেমিনার এ তথ্য জানানো হয়।
শনিবার (২২ ফেব্রুয়ারি) সকাল ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিরাজুল ইসলাম লেকচার হলে এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।
সেশন চেয়ার হিসেবে অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মেহজাবীন হক।
গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, পিটিএসডির হার নারীদের মধ্যে বেশি, যেখানে ৭৬.৫২ শতাংশ নারী শিক্ষার্থী গভীর মানসিক চাপে ভুগছেন, যা পুরুষদের (৭২.৯০ শতাংশ) তুলনায় বেশি। মাঝারি থেকে গুরুতর পিটিএসডির হারও নারীদের মধ্যে বেশি পাওয়া গেছে, যেখানে ৫৭.০৫ শতাংশ শিক্ষার্থী গুরুতর পিটিএসডির শিকার, অথচ পুরুষদের মধ্যে এই হার ৪৮.৩১ শতাংশ।
গবেষণায় বলা হয়, হতাশার হারও চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও বেশিরভাগ শিক্ষার্থী ন্যূনতম থেকে মৃদু মাত্রার হতাশা অনুভব করেছেন, তবুও গুরুতর হতাশার শিকার ৩৫.৪ শতাংশ নারী শিক্ষার্থী এবং ২১.৬১ শতাংশ পুরুষ শিক্ষার্থী। অনেক শিক্ষার্থী সামান্য হতাশার শিকার হলেও, উল্লেখযোগ্য অংশ গুরুতর হতাশায় ভুগছেন যা তাদের পড়াশোনা এবং সামগ্রিক সুস্থতার উপর প্রভাব ফেলতে পারে।
গবেষণায় আরও পাওয়া যায়, পুরুষদের মধ্যে ৮৬.৭৩ শতাংশ শিক্ষার্থী গভীর উদ্বেগে ভুগছেন, যেখানে নারীদের মধ্যে এই হার আরও বেশি, যা ৯২.৬৮ শতাংশ। গুরুতর উদ্বেগ ৭১.১২ শতাংশ নারী এবং ৬৬.২৮ শতাংশ পুরুষ শিক্ষার্থীর মধ্যে পাওয়া গেছে, যা প্রমাণ করে যে উদ্বেগ শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বড় মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা।
গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট সাদিয়া শারমিনসহ দু’জন গবেষক। গবেষণা ফলাফলে প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনা করে তিনি জানান, জুলাই বিপ্লবোত্তর মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে বাংলাদেশের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা।
জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের ফলে বাংলাদেশের স্নাতক ও স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থীরা, যারা অন্তত ৫ দিন এই আন্দোলনে গিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে অনেকেই মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর মাসজুড়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, এবং রাজশাহী বিভাগে গবেষণার কাজ পরিচালিত হয়।
গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল জুলাই-আগস্ট বিপ্লব পরবর্তী সময়ে বিপ্লোবত্তর মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য পরিমাপ করা। মানসিক স্বাস্থ্যর অনেক দিক থাকলেও অ্যাংজাইটি, ডিপ্রেশন অ্যান্ড পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার (পিটিএসডি) কে সামনে রেখে এই গবেষণার কাজ পরিচালনা করা হয়। যেখানে ৩৭৫ জন শিক্ষার্থীর যাদের বয়স ১৭ থেকে ২৮ বছর তাদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে ২৬ জন ডাটা সংগ্রহকারীদের প্রায় ৩ মাস সময় লেগেছিল।
বৈজ্ঞানিক সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি (শিক্ষা) ড. মামুন আহমেদ। বিশেষ অতিথির মধ্যে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সৈয়দ তানভীর রহমান, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. এস এম আবুল কালাম আজাদ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে’র (বিএসএমএমইউ) সাইকিয়াট্রি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. সেলিনা ফাতেমা বিনতে শহীদ এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখপাত্র উমামা ফাতেমা।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ জুলাই বিপ্লবের সময় মানুষের আত্মত্যাগ ও সার্বিক পরিস্থিতি কীভাবে মানসিক আঘাতের কারণ হয়ে দাঁড়ায় তা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, জুলাই-আগস্টের ঘটনা প্রচণ্ড মানসিক আঘাত ও বিষণ্ণতার কারণ হয়েছিল। আন্দোলনে আহত কিংবা প্রিয়জন হারানো ব্যক্তিরা এখনও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। এমনকি যারা বাসায় থেকে সব দেখেছেন, তারাও ওইসব ঘটনা দেখে মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখপাত্র উমামা ফাতেমা বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানে যথেষ্ট অবদান রাখা সত্ত্বেও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে না, যা তাদের মানসিকভাবে আঘাত করছে। এ ছাড়া বিপ্লবে প্রথম সারিতে থাকা মেয়েদের অবদান যথেষ্ট প্রশংসিত হচ্ছে না, যা তাদের মনে হতাশার সৃষ্টি করছে। তিনি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে কাউন্সেলিং পরিষেবা প্রকল্পের ওপর গুরুত্ব দেন এবং বাড্ডা, বাসিলা, যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন রেড জোনে গবেষণা চালানোর আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানটি গবেষণা সংসদের কার্যনির্বাহী সদস্য, স্বেচ্ছাসেবক, আয়োজক ও অতিথিদের সক্রিয় অংশগ্রহণে সফলভাবে সমাপ্ত হয়।
এমআই/
-
১১ মে, ২০২৬
-
০১ মে, ২০২৬
-
২৬ জুলাই, ২০২৫
-
২৬ এপ্রিল, ২০২৫