প্রস্তাবিত স্বাস্থ্য নীতিমালা সংশোধনের দাবি
টেস্ট রিপোর্টে স্বাক্ষর প্রদান অন্তর্ভুক্তি চান বায়োকেমিস্টরা
মেডিভয়েস রিপোর্ট: প্রস্তাবিত স্বাস্থ্য নীতিমালায় বায়োকেমিক্যাল, ইমিউনোলজিক্যাল এবং মলিকুলার টেস্টে বায়োকেমিস্টদের স্বাক্ষর প্রদানের বিষয় অন্তর্ভুক্তসহ সাত দফা দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব ক্লিনিক্যাল বায়োকেমিস্টস (বিএসিবি)। একই সঙ্গে পতিত স্বৈরাচারের শাসনামলে প্রস্তাবিত স্বাস্থ্য সেবা ও সুরক্ষা অধ্যাদেশের ৯ এর ৪ উপধারাকে বৈষম্যমূলক উল্লেখ করে তা সংশোধনেরও দাবি জানায় সংগঠনটি।
আজ শনিবার (৮ ফেব্রুয়ারি) সকালে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনে (বিএমএ) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানান তারা।
বিএসিবির ব্যানারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তাঁরা বলেন, ডাক্তার, বায়োকেমিস্ট ও টেকনোলজিস্টদের হাত ধরে দেশের ডায়াগনোস্টিক সেবা এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে তৈরি স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষা আইনের খসড়া—যা সম্প্রতি স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৪ হিসেবে ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে, সেখানে ৯.৪ ধারায় বলা হয়েছে, ‘সকল ল্যাবরেটরি ও রেডিওলজি রিপোর্টে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) রেজিস্টার্ড বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের স্বাক্ষর থাকতে হবে।
বক্তারা বলেন, অধ্যাদেশের তথ্যানুযায়ী ল্যাবরেটরির সকল বিভাগে বিশেষজ্ঞ হিসেবে শুধুমাত্র চিকিৎসকরা স্বাক্ষর করতে পারবেন, আর কেউ নয়। এই সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ বৈষম্যমূলক, অগ্রহণযোগ্য ও অযৌক্তিক। এটি স্বাস্থ্য খাতে অশনি সংকেত ছাড়া কিছুই নয়। এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে ল্যাবরেটরি টেস্টের মানের অবনতি হবে। সুতরাং এর সংশোধন করতে হবে।
এ সময় বিশ্বে বায়োকেমিস্টদের অবস্থান তুলে ধরেন বক্তারা। বলেন, সারা বিশ্বে ল্যাবরেটরি খাতে স্ব স্ব ক্ষেত্রে অবদান রেখে চিকিৎসক ও বায়োকেমিস্টরা পাশাপাশি কাজ করে আসছেন। ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মধ্যপ্রাচ্য, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাজ্য, ইউরোপ ও আমেরিকায় বায়োকেমিস্টরা রোগ নির্ণয়ের জন্য স্বীকৃত। একই সঙ্গে টেস্ট রিপোর্টে তাদের সিগনেটরি অথোরিটি রয়েছে।
লিখিত বক্তব্যে আয়োজকরা বলেন, আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি), বারডেম ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বায়োকেমিস্টরা সেবা দিয়ে আসছেন। বর্তমানে দেশে বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল ও মেডিকেল ডায়াগনোস্টিক ল্যাবরেটরিতে সহস্রাধিক বায়োকেমিস্ট কর্মরত আছেন। তাঁরা সুনামের সাথে আধুনিক ও মানসম্পন্ন সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তাঁদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ল্যাবরেটরিসমূহে স্বাস্থ্য সেবার মান আজ আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলছে।
তারা বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের সেরা ডায়াগনোস্টিক সেন্টারগুলোর রিপোর্ট সারা পৃথিবীতে গ্রহণযোগ্য। এ ছাড়া মেডিকেল ডায়াগনোস্টিক ল্যাবরেটরির আন্তর্জাতিক মান সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন (আইএসও) ১৫ হাজার ১৮৯ এর উপর বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন বোর্ড কর্তৃক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মোট নিরীক্ষকের তিন-চতুর্থাংশই বায়োকেমিস্ট, যারা ল্যাবরেটরির আন্তর্জাতিক মান সনদ অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। কোভিড মহামারীর কঠিন দিনগুলোতে সবার আগে কোভিড রোগ নির্ণয়ের জন্য পিসিআর মেশিন নিয়ে এগিয়ে এসেছিলেন এই বায়োকেমিস্টরা। তাঁরা সারাদেশে পিসিআর মেশিন স্থাপন করে প্রশিক্ষণ দিয়ে দেশের আনাচে কানাচে কোভিড রোগ নির্ণয়ের উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
ল্যাবরেটরির মান নির্ণয়ের মূল কাজটি বায়োকেমিস্টরা করে থাকেন উল্লেখ করে তাঁরা আরও বলেন, আগে ল্যাবরেটরিগুলোতে অটোএনালাইজার অপারেশন, মান নিয়ন্ত্রন, টেস্ট ভ্যালিডেশন, ল্যাব অটোমেশন ও টোটাল সুপারভিশন করার কোন লোক ছিল না। ল্যাবরেটরিগুলো মূলত টেকনিশিয়ান অথবা টেকনোলজিস্ট নির্ভর ছিল। তাদেরকে দেখাশোনা বা তদারকি করার মতো কেউ ছিল না। এ কারণে ল্যাবরেটরির মান নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি ছিল সম্পূর্ণ উপেক্ষিত। বায়োকেমিস্টরা এই শূন্যতা দূর করেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বরাত দিয়ে বক্তারা বলেন, দেশে বর্তমানে উপজেলা, জেলা ও কেন্দ্রীয়ভাবে সরকারি হাসপাতাল ৬৩৯টি। এর মধ্যে আছে উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র, জেলা বা সদর হাসপাতাল, মাতৃ ও শিশুসদন, সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং বিশেষায়িত হাসপাতাল। অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে নিবন্ধিত বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালের সংখ্যা পাঁচ হাজার ৫৭৭টি। এর বাইরে সারাদেশে নিবন্ধিত ডায়াগনোস্টিক সেন্টার বা রোগ নির্ণয় কেন্দ্র আছে ১০ হাজার ৭২৭টি এবং ব্লাড ব্যাংক আছে ১৪০টি।
তারা বলেন, এসব ল্যাবরেটরিতে মেডিকেল বায়োকেমিস্ট এবং ডাক্তারের সংখ্যা নিতান্তই অপ্রতুল। এমনকি উপজেলা পর্যায়ে টেকনোলজিস্টরাই রিপোর্ট স্বাক্ষর করেন। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কোন সরকারি হাসপাতাল ল্যাবরেটরিতে কোন বায়োকেমিস্ট নেই। যেখানে ঢাকা এবং বিভাগীয় শহরগুলোতেই ডায়াগনোস্টিক সেবা দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত মেডিকেল বায়োকেমিস্ট নেই, সেখানে জেলা, উপজেলা, পর্যায়ের কথা বলাই বাহুল্য। অন্যদিকে রাজধানী থেকে জেলা পর্যায় পর্যন্ত সকল বড় বেসরকারি ডায়গনোস্টিকগুলোতে বায়োকেমিস্টরা সুনামের সাথে পুরো সময় সেবা দিয়ে আসছেন। বাস্তবতা হলো, এতগুলো ল্যাবরেটরিতে অল্প সংখ্যক মেডিকেল বায়োকেমিস্ট অথবা শুধু ডাক্তারদের পক্ষে সেবা দেওয়া সম্ভব নয়।
বায়োকেমিস্টরা বলেন, জিসিসি অনুমোদিত মেডিকেল সেন্টার অ্যাসোসিয়েশনের (জিএএমসিএ) ল্যাবরেটরিসহ মালয়েশিয়া ও অন্যান্য দেশে গমনেচ্ছুক কর্মীদের সঠিক ও মানসম্মত স্বাস্থ্য পরীক্ষায় বায়োকেমিস্টরা অবদান রাখছে। এ বিষয়ে সরকারের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা আছে।
তারা বলেন, বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) শুধুমাত্র চিকিৎসক ও দন্ত চিকিৎসকদের নিবন্ধন ও স্বীকৃতি দিয়ে থাকে। এ রকম আরও কয়েকটি কাউন্সিল আছে। কিন্তু বায়োকেমিস্টরা চিকিৎসক নন। সুতরাং তারা বিএমডিসির নিবন্ধনের আওতায় পড়েন না। কিন্তু দুঃখজনক হলো, বায়োকেমিস্ট বা ল্যাবরেটরি সাইন্টিস্টদের জন্য বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত নিবন্ধনের আলাদা কোনো কাউন্সিল নেই।
সাত দফা দাবি ও প্রস্তাবনা
সংবাদ সম্মেলন থেকে বায়োকেমিস্টরা সাত দফা দাবি ও প্রস্তাবনা তুলে ধরেন। এগুলো হলো—
১. স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইন হতে বিতর্কিত ও বৈষম্যমূলক ৯.৪ ধারা বাদ দিতে হবে এবং নিয়োগ বাধ্যতামূলক করতে হবে।
২. দেশের স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নের স্বার্থে যুগোপযোগী স্বাস্থ্য নীতি প্রণয়নের মাধ্যমে বায়োকেমিস্টদের কর্মপরিধি ও পেশাগত সুরক্ষার জন্য উপযুক্ত নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।
৩. পর্যায়ক্রমে সকল ল্যাবরেটরিকে এক্রেডিটেশনের আওতায় আনতে হবে।
৪. সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল এবং বিশেষায়িত হাসপাতালসমূহ ও সকল জেলা সদর হাসপাতালগুলোতে শিক্ষক ও বায়োকেমিস্ট বা ল্যাবরেটরি সায়েন্টিস্ট হিসেবে পুনঃনিয়োগ চালু করতে হবে।
৫. বিশেষায়িত হাসপাতালসমূহ ও সকল জেলা সদর হাসপাতাল গুলোতে বায়োকেমিস্ট ও ল্যাবরেটরি সায়েন্টিস্ট পদ সৃষ্টি করতে হবে।
৬. স্বাস্থ্যনীতি নির্ধারণী যে কোন পর্যায়ে গঠিত কমিটিতে বিএসিবির ন্যূনতম একজন প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
৭. সুনির্দিষ্ট অর্গানোগ্রমের মাধ্যমে বিভিন্ন পদের পদোন্নতির পথ খোলা রাখতে হবে।
ক্লিনিক্যাল বায়োকেমিস্টরা জানান, এ ব্যাপারে কমিশনের কাছে দাবি-দাওয়া তুলে ধরা হলেও কমিশন তাদের প্রস্তাবে সাড়া দেয়নি। এ অবস্থায় নিজেদের অধিকার আদায়ের বিষয়ে তারা শঙ্কিত। তারা বলেন, ‘আমরা সমাজের শিক্ষিত শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করি। সে জন্য দাবি আদায়ে অন্যদের মত ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি গ্রহণ করব না।’
তারা আরও বলেন, গণঅভ্যুত্থানের পর দেশে সবক্ষেত্রে একটা গুণগত উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অন্যান্য সেক্টরের মতো স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে একটি সংস্কার কমিশন গঠন করেছে। বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে প্রতিবেশী দেশে রোগীদের যাওয়া কমে এসেছে। দেশে রোগ নির্ণয়ের উপর রোগীদের আস্থা যখন ফিরে আসছে, তখন বায়োকেমিস্টদের বাদ দিয়ে আইন করে বিতর্কিত ধারা স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইনে সংযোজন করলে তা কখনো সুফল বয়ে আনবে না। এর ফলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত। এতদিন ধরে এই সেক্টরে যে অগ্রগতি হয়েছিল তা আবার পিছিয়ে পড়বে।
এমইউ/এসআই/টিআই/এনএআর/