অধ্যাপক ডা. মো. মনিরুজ্জামান ভূঁইয়া
সাবেক চেয়ারম্যান, নিউরোলজি বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ)
০২ ফেব্রুয়ারী, ২০২৫ ০৮:৪০ পিএম
দেশে নিউরোলজি চিকিৎসার সক্ষমতা
নিউরোলজিক্যাল চিকিৎসায় আমরা যে পর্যায়ে পৌঁছতে পেরেছি, তা ইউরোপিয়ান পদ্ধতির কাছাকাছি। তবে রোগী সুনির্দিষ্ট নিউরোলজিস্টের কাছে সঠিক সময় আসতে হবে। সঠিক রোগ নির্ণয়, যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা যখন করে ফেলতে পারেন, তখন চিকিৎসা সহজ। তাহলে রোগ নির্ণয় করতে পারাই হলো আসল বিষয়।
বেলস পলসি রোগ
একটি উদাহরণ দিয়ে যদি বলি, বেলস পলসি একটি রোগ আছে, এ রোগটি হলে মুখ একপাশে বাঁকা হয়ে যায়, চোখ বন্ধ হয়, চোখ দিয়ে পানি পড়ে, মুখের যে পাশ পক্ষাঘাতগ্রস্ত (প্যারালাইজড) হয়েছে সে পাশে খাবার চিবাতে গেলে আটকে যায়, কুলি করতে গেলে পানি অন্য দিকে পড়ে যায়। এইটা খুব সাধারণ একটি সমস্যা। বেশিরভাগই ভাইরাসজনিত কারণে হয়ে থাকে। কানের নিচে সাত নম্বর নার্ভের কাছে এটি থাকে। এটা হলে রোগী যদি ৪৮ ঘণ্টা থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে নিউরোলজিস্টের কাছে আসে আর চিকিৎসক সঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু করে ফিজিও থেরাপি দিতে পারে, সে ক্ষেত্রে সাত থেকে ১০ দিন বা ১৪ দিনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়ে যায়।
তবে রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর প্রথম চিকিৎসকের কাছে আসছে না, কবিরাজের কাছে চলে যায়। বলা হয়, বাতাস লেগেছে। তখন বাতাস লাগার চিকিৎসা হয়, কবিরাজ ঝাড়ফুঁক শুরু করে। এক পর্যায়ে রোগী যখন ডাক্তারের শরণাপন্ন হন, তখন হয় তো ১৪ দিন চলে গেছে, এক মাস কিংবা দুই মাস চলে গেছে। তখন স্থায়ীভাবে মুখ একদিকে বাঁকা হয়ে গেল। তখন সে চাইলেও চোখ বন্ধ করতে পারে না, মুখ অন্য দিকে চলে যাচ্ছে, খুব বিলম্ব হয়ে গেল। আশার কথা হলো, সঠিক সময়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে চিকিৎসা শুরু করলে সুস্থ হয়ে যাবে।
বেলস পলসির চিকিৎসা সক্ষমতা
এক্ষেত্রে চিকিৎসার সক্ষমতার বিষয়টি নির্ভর করে রোগীর ওপর। রোগী যদি মনে করে এটি নিউরোলজির রোগ, আমি কেন কবিরাজের কাছে যাবো? আমার ওখানে যেতে হবে।
স্ট্রোকের চিকিৎসার সক্ষমতা
স্ট্রোকের চিকিৎসার সক্ষমতার কথা যদি বলি, স্ট্রোকের বিশ্বমানের চিকিৎসা এখন আমাদের দেশের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ), ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতাল (নিন্স), ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আছে এবং বেসরকারি খাতের কথা যদি বলি, এভার কেয়ার হাসপাতালেও এ চিকিৎসা চলছে।
রোগী যখন বুঝবেন, তার এক পা, এক হাত পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে যাচ্ছে, শক্তি কম পাচ্ছে, তখন চার ঘণ্টার মধ্যে নিউরোলজিস্টের কাছে আসতে হবে। চিকিৎসকের দেয়া সিটি স্ক্যানের ফলাফল নরমাল হলে তাৎক্ষণিক আইবিএল ইনজেকশন দিলে ৩০ মিনিটের মধ্যে রোগীর উন্নতি ঘটে। আমরা যেসব হাসপাতালের কথা বলেছি, সেসব প্রতিষ্ঠানে নিউরোলজির চিকিৎসা দেয়ার সেট প্রস্তুত আছে, কিন্তু রোগীরা যথাসময়ে পৌঁছাতে পারে না।
এর পর আরেকটি বিষয় হলো, এনজিওগ্রাফি করে রোগীর কোথায় ব্লক রয়েছে, তা চিহ্নিত করে কোয়েলিং, ক্লিপিং অথবা ক্যারোটিড এন্ডার্ট এরেটোমোমি—সকল কিছু করা যায়। এসব চিকিৎসা ব্যয়বহু বটে, তবে দেশে হয়। যে চিকিৎসার জন্য মানুষ ভারত, সিঙ্গাপুর ব্যাংককে যায়, তা এখন আমাদের দেশে হয়। সরকারি বা বেসরকারি উভয় জায়গাতেই হয়। আমাদের এখানে মূল সমস্যা হচ্ছে, সচেতনতা।মনে করে
আমাদের জ্যেষ্ঠ নিউরোলজিস্টরা নতুন এই পদ্ধতিগুলো সব সময় গ্রহণ করেন না। ওল্ড ইজ গোল্ড—মনে করে আগের পদ্ধতিগুলোতেই স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন। আগে এ পদ্ধতি ছিল না বলে পুরনো পদ্ধতিতে কাজ করতাম, এখন যেহেতু নতুন নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি বের হয়েছে আর এটা আমাদের দেশে পর্যাপ্ত রয়েছে, আমরা এ সুবিধাটা নেবো না কেন?
পিএলআইডির সমস্যা ও চিকিৎসা
পিএলআইডির কারণে কোমর বা মেরুদণ্ডে প্রচণ্ড ব্যথা নিয়ে রোগী চিকিৎসকের কাছে আসেন। তাদেরকেও এমআরআই করার পরে যে অস্ত্রোপচার করা হয়, সেটা যদি রোগীর অবস্থা খুব খারাপ হওয়ার আগে করা যায়, তাহলে ৭০ ভাগ রোগীর ব্যথা কমে যায়। তাদেরে মধ্যে ৬০-৮০ ভাগ কাজে ফিরতে পারেন। কিন্তু চূড়ান্ত খারাপ হয়ে গেলে চিকিৎসায় খুব একটা উপকার পাওয়া যায় না।
মাথা ব্যথা
ব্যথার সাধারণ যে সমস্যা, যথাসময়ে চিকিৎসকের কাছে আসলে তার চমৎকার চিকিৎসা হয়। কিছু কিছু রোগের চিকিৎসা আমাদের দেশে স্বল্পতা রয়েছে, যেমন—ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়া। এ রোগের ওষুধ দীর্ঘ সময় ধরে খেতে হয়। তবে ফলাফল অতটা ভালো না। এর সার্জিক্যাল চিকিৎসা আমাদের দেশে কিছু কিছু স্বাস্থ্য কেন্দ্রে করা হয়। তবে বেশিরভাগ ভারত, সিঙ্গাপুর, ব্যাংককে করতে যায়। এর চিকিৎসা ব্যয়বহুল, জটিল, ফলাফলও হতাশব্যঞ্জক।
টিআই/এমইউ