১৮ ডিসেম্বর, ২০২৪ ০২:৫৯ পিএম

পদোন্নতির দাবিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞদের অবস্থান

পদোন্নতির দাবিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞদের অবস্থান
পদোন্নতির দাবিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে বৈষম্যের শিকার শিশুরোগ বিশেষজ্ঞদের অবস্থান কর্মসূচি। ছবি: আবু সাঈদ

মেডিভয়েস রিপোর্ট: দ্রুততম সময়ে পদোন্নতি জট নিরসনের দাবিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন বৈষম্যের শিকার শিশুরোগ বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে অন্যান্য ক্যাডারের মতো ইনসিটু অথবা ওএসডি এটাচমেন্ট পদোন্নতির মাধ্যমে অন্ত ও আন্তঃক্যাডার বৈষম্য নিরসনেরও দাবি জানান তারা।

আজ বুধবার (১৮ ডিসেম্বর) সকালে বাংলাদেশ পেডিয়াট্রিক এসোসিয়েশনের (বিপিএ) ব্যানারে কর্মসূচি পালন করেন এসব শিশু বিশেষজ্ঞ। পরে অধিদপ্তরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তারা এসব দাবি তুলে ধরেন।

শিশু চিকিৎসকরা বলেন, দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোর চিকিৎসা সেবার এক অপরিহার্য অংশ শিশুস্বাস্থ্য। প্রতিটি উপজেলা, জেলা সদর এবং মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ শিশু চিকিৎসকদের মাথাপিছু রোগীর চাপ অত্যন্ত বেশি।

এ সময় এক সমীক্ষার তথ্য তুলে ধরে বক্তারা বলেন, ২০২৩ সালে প্রায় ৩৬ লক্ষ দুই হাজার ৫০৯ জন শিশু জন্মগ্রহণ করে। এর মাঝে হাসপাতালে জন্ম গ্রহণ করে ২৩ লক্ষ ৪০ হাজার ১৮২ শিশু। দেশে ২০১৭ সালে পাঁচ বছরের নিচে শিশু মৃত্যু ছিল প্রতি হাজার জীবিত জন্মে ৪৫ জন। ২০২২ সালে শিশু বিশেষজ্ঞদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় তা কমে ৩১-এ উন্নীত হয়েছে। ২০৩০ সালের এসডিজি লক্ষ্য হলো ২৫-এ নামিয়ে আনা। 

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, স্বাস্থ্যখাতে বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক যতগুলো পুরস্কার পেয়েছে, তার অধিকাংশই শিশুস্বাস্থ্য বিষয়ে। শিশু সেবায় সময়োপযোগী আধুনিক চিকিৎসা ও রোগ প্রতিরোধকারী ইপিআই টিকা প্রদানের সাফল্যের কারণে এ সাফল্য অর্জন সম্ভব হয়েছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ থেকে গুটিবসন্ত ও পোলিও নির্মূল হয়েছে। 

বক্তারা বলেন, সরকারি ৩৭টি মেডিকেল কলেজে সমন্বিত শিশু স্বাস্থ্যসেবা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। এ ছাড়া মেডিকেল কলেজে ছাত্র-ছাত্রী সংখ্যা ক্রমাগতভাবে বেড়েছে। পুরনো মেডিকেল কলেজগুলোতে ২৫০ জন ছাত্র-ছাত্রী আছে। পাশাপাশি নতুন মেডিকেল কলেজগুলোতে প্রতিবছর ৫০ জন করে ছাত্র-ছাত্রী যোগ হয়। উপজেলা ও জেলা হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা প্রদানের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হলেন জুনিয়র ও সিনিয়র কনসালটেন্ট। সারাদেশে প্রায় ৬৩৮টি হাসপাতালে শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করেন শিশু ও নবজাতকসহ অন্যান্য সাবস্পেশালিটির বিশেষজ্ঞরা। তাহলে এ বিশাল যজ্ঞ চালাতে মেডিসিন, সার্জারি ও অবস্ অ্যান্ড গাইনি বিষয়ের সমপরিমাণ বা তার চেয়ে বেশি চিকিৎসক শিশু সেবায় থাকা কার্যত যৌক্তিক। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। যুগ যুগ ধরে এ খাতে কর্মরত চিকিৎসকরা অবহেলিত।

সংবাদ সম্মেলনে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞরা বলেন, সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে পেডিয়াট্রিকস ও সাব স্পেশালিটিতে সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপকের জন্য সৃষ্ট পদ রয়েছে ৩৬৪টি, যা প্রয়োজন এবং অন্যান্য বিষয়ের (মেডিসিন ও সার্জারি) তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। এ ছাড়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলো সারাদেশে স্বাস্থ্য শিক্ষার পুরোটা প্রদান করছে, সেই সাথে নানা অঞ্চল থেকে জটিল রেফারকৃত রোগীদের স্বাস্থ্য সেবার ৪৫ শতাংশ সেবা প্রদান করছে প্রতিষ্ঠানগুলো। কিন্তু নতুন করে নিয়োগ না হওয়ায় নতুন ও পুরাতন সকল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে শিক্ষক সংকট ও সেবা সংকট দেখা দিয়েছে, যা আমাদের স্বাস্থ্যশিক্ষার মানকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।

তারা বলেন, সেই সাথে সারাদেশের সরকারি ৬৩৮টি হাসপাতালে শিশুদের স্বাস্থ্যসেবায় শিশু বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষক রয়েছেন মাত্র ৯২৫ জন, যারা স্বাস্থ্যসেবার প্রায় ৫০ শতাংশ সেবা প্রদান করছেন। জুনিয়র কনসালটেন্ট ও মেডিকেল অফিসার হয়ে একই পদে অনেক বছর (১০-১৫ বছর) প্রমোশনের অপেক্ষায় আছেন বেশিরভাগ শিশু বিশেষজ্ঞ। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকবৃন্দ সহকারী অধ্যাপক পদে গড়ে ৮-১৩ বছর পদোন্নতির অপেক্ষায় থাকেন। অনেক বছর বিশেষজ্ঞদের নিয়োগ ও পদোন্নতি নিয়মিতকরণ করা হয়নি, যার কারণে মেডিসিন, সার্জারি, গাইনির সাথে এবং অন্য ক্যাডারের সাথে দিন দিন বৈষম্য বাড়ছে। 

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জানান, বর্তমানে অধ্যাপক হিসেবে মেডিসিনে ৯৫ জন, সার্জারিতে ৫২ জন, গাইনিতে ৪৮ জন ও জেনারেল পেডিয়াট্রিকসের ৩৪ জন কাজ করছেন। সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে মেডিসিনে ১৪৮ জন, সার্জারিতে ৯৭ জন, গাইনিতে ৬৬ জন, জেনারেল পেডিয়াট্রিকসে ৫৪ জন আছেন। এ ছাড়া সহকারী অধ্যাপক হিসেবে মেডিসিনে ১৬৯ জন, সার্জারিতে ১৫৫ জন, গাইনিতে ৯৮ জন ও জেনারেল পেডিয়াট্রিকসে ৮৬ জন কর্মরত আছেন। 

অভিযোগ করে তারা বলেন, পদোন্নতিজটে আটকে পড়ে আছেন যোগ্য পেডিয়াট্রিকস ও সাব-স্পেশালিটি চিকিৎসকরা। পদোন্নতির যোগ্যতা সম্পন্ন হয়ে দীর্ঘদিন বসে আছেন তারা, যাদের ন্যায্য পদোন্নতি হলে বেতন স্কেলের কোনো পরিবর্তনের প্রয়োজন হবে না। তাদের ২১৪ জন সহযোগী অধ্যাপক পদপ্রার্থী, যাদের মধ্যে ১০৮ জনই ৪র্থ গ্রেডে বেতন পান। এই ১০৮ জনের পদোন্নতিতে সরকারের অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ দিতে হবে না।

এ ছাড়া ৬ষ্ঠ ও তদুর্ধ্ব গ্রেডপ্রাপ্ত ৩২২ জন এবং যোগ্যতা সম্পন্ন ১৮৭ জন মিলে মোট ৫০৯ জন সহকারি অধাপক পদোন্নতি যোগ্য (জুনিয়র কনসালটেন্ট পদে প্রমোশনযোগ্যসহ)। ৩৩২ জনের পদোন্নতিতে সরকারের অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ দিতে হবে না।

চিকিৎসকরা বলেন, ৯ম গ্রেড প্রায় ৫০০ শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পদোন্নতির সকল শর্ত পূরণ করার পরেও দীর্ঘদিন অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার হয়ে বছরের পর বছর একই গ্রেডে দেশের প্রত্যন্ত এলাকায় মেডিকেল অফিসার হিসেবে নিগ্রহের সাথে কর্মরত আছেন। তারা জুনিয়র কনসালটেন্ট হিসেবে পদোন্নতি পাওয়ার যোগ্য।

কর্মসূচিতে ৪টি দাবি তুলে ধরেন তারা। এগুলো হলো— 

১. পেডিয়াট্রিকস জুনিয়র কনসালটেন্ট, সিনিয়র কনসালটেন্ট, সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক, অধ্যাপক পদে, মেডিসিন, সার্জারি ও গাইনি অ্যান্ড অবসের সাথে সমতা আনয়ন করার জন্য ওএসডি এটাচমেন্ট/ইন সিটু পদোন্নতি প্রদান প্রয়োজন।

২. পদের অতিরিক্ত পদোন্নতি ও পদায়ন এবং প্রয়োজনে ওএসডিএটাচমেন্ট/ইন সিটু পদায়ন করতে হবে। সমস্যার সমাধান না করলে নিকট ভবিষ্যতে অপূরণীয় ক্ষতি সাধন হবে। এতে এ দেশের কোটি কোটি শিশু স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়বে, বাড়বে শিশুমৃত্যু, যা এই দেশকে পিছিয়ে নিয়ে যাবে, দেশের উন্নতি ব্যাহত হবে।

৩. জনসংখ্যার ৪৫ শতাংশ শিশু হলেও সরকারি হাসপাতালের শয্যা সংখ্যার মাত্র ১৩ ভাগ শিশু রোগীর জন্য বরাদ্দ। প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে শিশু রোগীর সংখ্যার অনুপাতে হাসপাতালে বিছানার সংখ্যা বর্ধিতকরণ ও চিকিৎসকদের জন্য নতুন পদসৃজন এবং ছাত্র-ছাত্রীদের অনুপাতে শিক্ষকদের পদসৃজন ও পরবর্তীতে ইনসিটু পদোন্নতি প্রদানকারী চিকিৎসকদের সৃজনকৃত পদে আত্তিকরণ।

৪. ঢাকায় একটি আন্তর্জাতিক মানের সরকারি বিশেষায়িত ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব চাইন্ডহেলথ’ স্থাপন করা, সেখানে শিশু মেডিসিন, সাবস্পেশালিটি ও সার্জারির সমন্বিত চিকিৎসা প্রদান করা এবং উন্নত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা প্রণয়নের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করা।

বাংলাদেশ পেডিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএ) আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. মেসবাহ উদ্দিন আহম্মেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন সংগঠনের সদস্য সচিব ডা. মো. বেলায়েত হোসেন ঢালী। 

এ সময় সিলেট এম এ জি ওসমানি মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. জিয়াউর রহমান চৌধুরী, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. মোস্তাফিজুর রহমান, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. ইয়ামিন শাহরিয়ার চৌধুরী, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ডা. শফিকুল ইসলাম ও ডা. মোহাম্মদ মনির হোসেন, জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. এম এস খালেদ, টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আইনুল ইসলাম খাঁন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আব্দুর রউফ, মুগদা মেডিকেল কলেজের সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. সাজ্জাদ হোসেন, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. এ এস এম মাহমুদুজ্জামান, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. মনির হোসেন, বাংলাদেশ পুলিশ হাসপাতালের সিনিয়র কনসালটেন্টের ডা. মাসুমা আক্তার, দোহার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জুনিয়র কনসালটেন্ট ডা. মুশভাব শীরা মৌসুমী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

এমইউ/এনএআর/

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত