ডা. আশিকুর রহমান রুপম
এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য), এফসিপিএস-২য় পর্ব (অর্থোপেডিক্স)
অর্থোপেডিক ফিজিশিয়ান এবং স্বাস্থ্য কলামিস্ট
১৩ অক্টোবর, ২০২৪ ০২:৩২ পিএম
মেরুদণ্ডের রোগ ‘স্পন্ডাইলোলিস্থেসিস’ থেকে পরিত্রাণের উপায়
৪০ বছর বয়সী শিউলি হঠাৎ পা পিছলে বাথরুমে পড়ে যান। এরপর নিজে নিজেই উঠে দাঁড়িয়ে কষ্ট করে কক্ষে আসেন। পড়ে যাওয়ায় কোমরে বেশ আঘাত পান তিনি। ব্যথায় একপর্যায়ে বিছানায় শুয়ে পড়েন। এ অবস্থা দেখে আত্মীয় স্বজনরা এসে তাকে ওষুধ খাওয়ান এবং কোমরে গরম তেল মালিশ করে দেন। ফলে তার ব্যথা কিছুটা কমে যায়।
এ অবস্থায় তিনি ঘুমিয়ে পড়েন। তবে ঘুম থেকে উঠে আবার আগের মতো ব্যথা অনুভোব করেন। তার মনে হচ্ছে কোমর থেকে নিতম্ব বেয়ে ব্যথা নিচের দিকে যাচ্ছে। এমনকি পায়ের পাতাতেও মনে হচ্ছে ব্যথা লাগছে। এরপর তিনি তার ব্যথা থেকে পরিত্রাণের জন্য চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলেন। সব শোনার পর চিকিৎসক কিছু শারীরিক পরীক্ষা করার চেষ্টা করে এক্স-রেসহ বেশ কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা দিলেন তাকে।
উপরে যে রোগটির কথা বলা হলো সেটি হচ্ছে—স্পন্ডাইলোলিস্থেসিস। এটি একটি আঘাতজনিত মেরুদণ্ডের রোগ।
স্পন্ডাইলোলিস্থেসিস
আমাদের মেরুদণ্ডের হাড়সমূহের মধ্যে যদি একটা হাড় আরেকটি হাড়ের উপর সামনের দিকে বা পেছনের দিকে সরে যায়, তবে এই সরে যাওয়াকে বলে লিস্থেসিস। এই শব্দটি ১৮৫৪ সালে প্রথম ব্যবহার করেছিলেন গ্রিক বিজ্ঞানী কিলিয়ান। তিনি বলেন, ‘স্পন্ডাইলোস’ মানে মেরুদন্ড আর ‘অলিস্থেনিন’ মানে সরে যাওয়া। অর্থাৎ এর পুরো অর্থ দাঁড়ালো মেরুদণ্ডের হাড়ের সরে (স্লিপ) যাওয়া।
ক্লিনিক্যালি হাসপাতালে রোগীদের ক্ষেত্রে এটি প্রথম ব্যবহার করেন বেলজিয়ামের গাইনি সার্জন হারবিনিয়াক্স। তিনি দেখেন, বাচ্চা ডেলিভারির পর মায়েদের মেরুদণ্ডের হাড় এভাবেই সরে যাচ্ছে।
যে কারণে হয় এই রোগ
আমাদের মেরুদণ্ডের হাড়গুলো একটা আরেকটার ওপর অনেকটা বাক্সের মতো সাজানো থাকে। দুই শক্ত হাড়ের মাঝে থাকে নরম হাড়। সাধারণ মানুষ যাকে ‘কচকচি’ বলে থাকে। পেছনে হাড়ের কয়েকটি অংশ থাকে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ জয়েন্ট হলো—উপরের ‘সুপেরিয়ার’ এবং নিচের ‘ইনফেরিয়ার’ ইন্ট্রা-আর্টিকুলার জয়েন্ট। এগুলো এক ধরনের ফ্যাসেট জয়েন্ট (বিশেষ ধরনের জয়েন্ট)।
উপর আর নিচের এই দুই জয়েন্টের মাঝখানের অংশকে বলে পার্স ইন্ট্রা-আর্টিকুলারিস বা ইস্থমাস। এই অংশকে ইংলিশে বলে bridge between two joint (দুই জয়ন্টের মাঝের সেতু)। এই অংশ যদি কোনো কারণে (আঘাতের ফলে বা জন্মগত ত্রুটির ফলে) ভেঙে যায়, তবে ঐ বরাবর সামনের হাড় পিছে বা সামনে সরে যেতে পারে। আবার সুপিরিয়ার বা ইনফেরিয়ার ইন্ট্রা-আর্টিকুলার জয়েন্ট ক্ষয়ে যাওয়ার ফলে বা অন্য কোনো অসুখে ড্যামেজ হয়ে গেলেও ঐ বরাবর মেরুদণ্ডের হাড় সরে যেতে পারে।
স্পন্ডাইলোলিস্থেসিস রোগের ধরণ
এই রোগের অনেক কারল রয়েছে। কারণগুলি ব্যাখ্যা করেন চিকিৎসাবিদ উইলজ, ম্যাকনাব এবং নিউম্যান। তারা বলেন—
ডিস্প্লাস্টিক বা হাড়ের জন্মগত ত্রুটি: বাচ্চা প্রসবের সময় মেরুদণ্ডের পার্স ইন্ট্রা-আর্টিকুলারিস বা ইস্থমাস এতটাই দুর্বল বা ত্রুটিপূর্ণ থাকে যে, বাচ্চা যত বড় হয়, মেরুদণ্ডের হাড়গুলো একটা আরেকটার উপর সরে যেতে থাকে।
ডিজেনারেটিভ (ক্ষয় রোগ): পার্স ইন্ট্রা-আর্টিকুলারিস ক্ষয় হতে হতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ফ্র্যাকচার বা হাড় ভেঙে যায়। একে বলে মাইক্রো-ফ্র্যাকচার। এর ফলেও মেরুদণ্ডের হাড় সরে যেতে পারে।
ট্রমাটিক আঘাত: আঘাতের ফলে মেরুদণ্ডের জয়েন্টগুলো (সুপেরিয়ার বা ইনফেরিয়ার ইন্ট্রা-আর্টিকুলার ফ্যাসেট জয়েন্ট) ভেঙে গেলে বা ক্ষয়প্রাপ্ত হলে একই সমস্যা দেখা দিতে পারে। মেরুদণ্ডের অন্য কোনো অসুখ হলে এই রোগ হতে পারে। যেমন—ইনফেকশন, যক্ষ্মা, ক্যান্সার ইত্যাদি।
আয়াট্রোজেনিক বা অপারেশনজনিত: মেরুদণ্ডের অন্য কোনো অপারেশন করতে গিয়ে যদি উপর-নিচের জয়েন্টগুলো আঘাতপ্রাপ্ত হয়, তবে আঘাতপ্রাপ্ত স্থান বরাবর মেরুদণ্ডের হাড় সরে যেতে পারে।
লক্ষণ
১. কোমরে প্রচণ্ড ব্যথা, যা নিতম্ব এবং এর নিচ দিক দিয়ে পা পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে।
২. এতে রোগীর হাঁটা চলার ক্ষমতা কমে যায়। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে ব্যথা হয়।
৩. স্পাইনালকর্ডে চাপ/টান লাগলে পায়ের নিচের দিকের নার্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে পায়ে ঝিনঝিন করে, অবশ লাগে। বেশি আঘাত লাগলে পা অবশও হয়ে যেতে পারে।
জন্মগত ত্রুটিপূর্ণ বাচ্চাদের যা হয় (ডিস্প্লাস্টিক)
১. নিতম্ব একদম ফ্ল্যাট বা সমতল হয়। পেছনের হাড় বা স্যাক্রাম পজিশন নষ্ট হয়ে যায়।
২. স্যাক্রাম এবং কোমরের মেরুদণ্ডের হাড়ের (লাম্বার)মাঝে একটা উঁচু স্ট্রাকচার পাওয়া যায়। একে বলে লাম্বোস্যাক্রাল স্টেপ।
৩. আক্রান্ত বাচ্চারা হাঁটু এবং নিতম্ব বাঁকা করে রাখে বাচ্চারা। একে বলে হিপ-নি ফ্লেক্সন ডেফরমিটি।
৪. এ ধরনের বাচ্চাদের নার্ভ পরীক্ষা করলে দেখা যায় নার্ভ রুট কমপ্রেশন আছে। যাকে বলে Slight Leg rise/SLR test পজিটিভ।
পরীক্ষা-নিরীক্ষা
এক্সরে করলেই অসুখ হয়েছে কিনা তা নিশ্চিত হওয়া যায়। এক্স-রে লেটেরাল ভিউয়ে দেখা যায় কেমন অবস্থায় রয়েছে মেরুদন্ড। তবে পারস ইন্ট্রা-আর্টিকুলারিস ফ্র্যাকচার আছে কিনা ভালোভাবে বুঝতে oblique view দেখতে হয়। তখন এই পারস ফ্র্যাকচারকে ‘স্কটি ডগ নেক সাইন’ বলে। অর্থাৎ স্কটল্যান্ডের এক জাতের কুকুরের অবয়বের মত দেখায় এটাকে।
এক্স-রেতে এই রোগটির ভালো থেকে খারাপের দিকে যাওয়ার বিভিন্ন পর্যায়/ মাত্রা বর্ণনা করেন মেয়েরডিং। তাই তার নামানুসারে একে মেয়েরডিং গ্রেডিং বলা হয়। উপরের হাড় নিচের হাড়ের উপর কতটুকু সরে গেছে তা নির্ণয় করতেই এই গ্রেডিং করা হয়।
গ্রেড-১: ২৫% সরে গেলে
গ্রেড-২: ২৫-৫০% সরে গেলে
গ্রেড-৩: (৫০-৭৫%) সরে গেলে
গ্রেড-৪:(৭৫-৯৯%) সরে গেলে
গ্রেড-৫: ১০০% সরে গেলে
শেষ গ্রেডটি হচ্ছে যখন উপরের হাড় নিচের হাড়ের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে যায়। একে বলে স্পন্ডাইলোপ্টোসিস (spondy-loptosis)। এরকম হলে অবশ্যই দ্রুত অপারেশনের প্রয়োজন হয়।
চিকিৎসা
ওষুধ এবং অন্যান্য উপাদান দ্বারা (নন-অপারেটিভ):
১. হাড় ভাঙলে পূর্ণ বিশ্রাম। অর্থাৎ বিছানাতেই প্রস্রাব-পায়খানা-গোসলের ব্যবস্থা করা।
২. ব্যায়াম করা। মেরুদণ্ডের, বুক-পেটের মাংসপেশীর ব্যায়াম করতে হবে।
৩. অল্প মাত্রায় (মাইল্ড) বা গ্রেড-১ হলে মাঝেমধ্যে কোমরের বেল্ট ব্যবহার করতে হবে। তবে ব্যথা কমে গেলে স্বাভাবিক কাজেকর্মে ফিরে যেতে হবে। তখন আর অহেতুক বিশ্রাম বা বেল্ট পড়ার দরকার নেই।
৪. তবে খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রে ব্যথা চলে যাওয়ার আরো ৩ মাস পর থেকে খেলাধুলায় ফেরার পরামর্শ দেওয়া হয়।
অস্ত্রোপচার (অপারেটিভ):
১. যখন উপরোক্ত চিকিৎসায় উন্নতি হয় না তখন চিকিৎসক অস্ত্রোপচারের নির্দেশনা দেন।
২. সাধারণত ৩ মাসের অধিক সময় ধরে তীব্র ব্যথা, সাথে পায়ের অবশ ভাব বা ঝিনঝিন করা, ব্যথা কমার বদলে আরো বাড়া, এমন হলে অস্ত্রোপচার জরুরি হয়ে পড়ে।
৩. অস্ত্রোপচার করে মূলত উপরের হাড়ের সাথে নিচের হাড় জোড়া লাগিয়ে দেওয়া হয়। একে বলে লাম্বার ইন্টার-বডি ফিউশন (এলআইএফ)। অপারেশনের মাধ্যমে এন্টেরিয়ার, পস্টেরিয়ার বা টোটাল লাম্বার ইন্টারবডি ফিউশন করা হয়। আর যেখানে নার্ভ রুট চাপ খেয়ে থাকে, সেখানে চাপ ছাড়ানো হয়, একে বলে ডেকম্প্রেশন।
জটিলতা
১. পিঠে বিভিন্ন ধরনের বিকৃতি হতে পারে। যেমন—পিঠ কুঁজো হয়ে যেতে পারে (কাইফোসিস)। আবার কারো কারো ধনুকের মত উলটো দিকে বাঁকা হতে পারে (লর্ডোসিস)।
২. হাটা চলায় ব্যাপকভাবে প্রভাব পড়তে পারে।
৩. প্রস্রাব-পায়খানায় সমস্যা হতে পারে (কডা ইকুইনা সিন্ড্রোম)।
৪. দীর্ঘমেয়াদি ব্যথা তৈরি হতে পারে, যা আর পুরোপুরি ভালো নাও হতে পারে।
৫. পা অবশ বা প্যারালাইসিস হয়ে যেতে পারে।
৬. সমস্যাযুক্ত হাড়ে ওস্টিও-আর্থ্রাইটিস হতে পারে।
প্রতিরোধ
১. নিয়মিত ব্যায়াম করা। শিরদাঁড়ার ব্যায়াম করা।
২. সুষম খাবার গ্রহণ করা। পর্যাপ্ত প্রোটিন খাওয়া, যাতে হাড় মজবুত থাকে।
৩. ধূমপান বা মদ্যপান বর্জন করা। এগুলো মেরুদণ্ডের হাড়ের ক্ষতি করে।
৪. কোনো ভারী জিনিস সাবধানে তুলতে হবে।
৫. ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা। ওজন বেশি হলে মেরুদণ্ডের হাড়ে প্রচণ্ড চাপ পড়ে। তাই ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।
পরিশেষে, স্পন্ডাইলোলিস্থেসিস অসুখটিকে খুব গুরুত্বের সাথে দেখা উচিত। বাচ্চা প্রসবের সাথে সাথে একজন শিশু চিকিৎসককে দিয়ে বাচ্চাকে দেখিয়ে নিতে হবে। শরীরের অন্যান্য অঙ্গের চেকআপের পাশাপাশি মেরুদন্ডও দেখিয়ে নিতে হবে। অচল শরীরের চেয়ে সচল শরীর উত্তম। দেহকে কষ্টনির্ভর করে তৈরি করেছেন আল্লাহ তায়ালা। অলস জীবন যাপন বহু রোগ ডেকে আনে। তাই আমাদের দেহকে পরিশ্রমের মধ্যে রাখা উচিত। সুনিয়ন্ত্রিত জীবন-যাপন পারে সুস্থ দেহ
উপহার দিতে।
এনএএন/