ডা. আবু তাহের
মেডিকেল অফিসার (অ্যানেসথেশিওলজি),
২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল, নোয়াখালী।
২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪ ০৩:৪৭ পিএম
সুন্নতে খতনার সময় শিশু মৃত্যু ও আমার একটি অভিজ্ঞতা
গত জানুয়ারি মাসের শুরুর দিকে রাজধানীর সাতারকুলে ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজে হাসপাতালে সুন্নতে খৎনা করাতে গিয়ে জলসিড়ি ক্যান্টনমেন্ট স্কুল ও কলেজের নার্সারির ছাত্র আয়ান আহমেদ রাফির মৃত্যু হয়।
এর প্রায় দেড় মাসের মাথায় মালিবাগ চৌধুরীপাড়ার জে এস ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড মেডিকেল চেকআপ সেন্টারে (জে এস হাসপাতাল) একই ধরনের সার্জারির সময় প্রাণহানি ঘটে আরেক শিশুর। আহনাফ তাহমিদ (১০) নামে ওই শিশু মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
সুন্নতে খতনা করাতে এসে রাজধানীতে দুই মাসের ব্যবধানে দুই শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় দেশব্যাপী তোলপাড় শুরু হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, ছোট সার্জারি হওয়া সত্ত্বেও খতনা করার সময় কেন মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে?
ঘটনা দুটির পর খতনার সময় কোন ধরনের অ্যানেসথেশিয়া দেওয়া উচিত তা নিয়ে মতব্যক্ত করছেন অনেকে। প্রাসঙ্গিকতার খাতিরেই এ লেখায় বিষয়টি নিয়ে কিছু বলার প্রয়াস চলবে।
কোন প্রকারের এ্যানেসথেশিয়া
আসলে অল্প একটু এ্যানেসথেশিয়া দেওয়ার কোনো গাইডলাইন নেই, এ্যানেসথেশিয়া তিন প্রকার। অপারেশন অনুসারে এর মধ্যে যে কোনো একটা প্রয়োগ করতে হয়।
লোকাল: খুব ছোট কিছু অপারেশন করা হয়, যেমন—কোথাও কেটে গেলে সেলাই করা। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই রোগীর সহযোগিতা লাগবে, কোঅপারেটিভ হতে হবে।
রিজিওনাল অ্যানেসথেশিয়া: শরীরের নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় নির্দিষ্ট সময়ের জন্য দিয়ে অবশ করা হয়। এর মাধ্যমে ছোট থেকে বড় সব অপারেশন করা যায়। এক্ষেত্রে স্পাইনাল দেওয়া যায়, এপিডুরাল দেওয়া যায়। যেমন: অন্তঃসত্ত্বা নারীর সিজারের সময় দেহের অর্ধেক অবশ করে সিজার করা হয়।
জেনারেল অ্যানেসথেশিয়া: শরীরের যে কোনো জায়গায় যত সময় ধরে ইচ্ছা অপারেশন করা যায়, ছোট/বড় অপারেশনের জন্য অ্যানেসথেশিয়ার আলাদা ওষুধ নেই।
উল্লেখ প্রয়োজন, বেশিরভাগ অপারেশনের গাইডলাইনে শিশুদের জন্য তিন নম্বর অপশনের কথাই বলা আছে। এই অপশনে রোগী মারা যাওয়ার হার ২ নম্বরের চেয়ে অনেক অনেক কম।
সঠিকভাবে প্রয়োগ হলে এক নম্বর অপশনে রোগী মারা যাওয়া ঝুঁকি নেই বললেই চলে, সাধারণত এজন্য অ্যানেসথেশিওলজিস্টকে কেউ কল দেন না।
অ্যাসথেশিয়া খুব সহজ আবার খুব জটিল। জটিলতা যিনি একবার দেখেছেন, তিনি অপারেশনে ভালো সার্জনের পাশাপাশি শহরের সবচেয়ে ভালো এ্যানেসথেশিওলজিস্টকেই প্রত্যাশা করবেন।
একজন ভালো বিশেষজ্ঞ সার্জনের গুরুত্ব রোগী এবং এ্যানেসথেশিওলজিস্টের কাছে খুবই বেশি। অপারেশন সবাই কম বেশি পারেন। কিন্ত এই পারার মধ্যেও অনেক পার্থক্য আছে, যা একজন এ্যানেসথেশিওলজিস্ট খুব ভালো করেই বুঝতে পারেন।
সৌভাগ্যবশত অল্প বয়সে একজন এনেস্থেশিওলজিস্ট হিসেবে অনেক বড় বড় সার্জনদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে। একটা জেলা শহরে এত ভালো ভালো সার্জন থাকতে পারেন, সেটা এখানে না আসলে বুঝতে পারতাম না। অনেক জটিল অপারেশন কত সহজেই তারা করে ফেলেন।
কয়েকজন সার্জন আছেন, যাদের সাথে যেকোনো অপারেশনে নির্দ্বিধায়, ভয়হীন চিত্তে এ্যানেসথেশিয়া দিতে পারি। তাদের ওপর আমার এতটাই বিশ্বাস যে, রোগী যত খারাপ হোক, তারা সফল হবেন ইনশাল্লাহ।
এ্যানেসথেশিওলজিস্ট হিসেবে অভিজ্ঞতা
ছোট জীবনে অন্তত কয়েক শত শিশুর সুন্নতে খতনার অ্যানেসথেশিয়া দিয়েছি। বেশিরভাগই সম্পূর্ণ অজ্ঞান করা হয়েছে, অল্প কিছু রিজিওনাল ব্লক দিয়ে করেছি। সাধারণত বড়দের তুলনায় শিশুদের সমস্যা খুব কম পেয়েছি, ১ ভাগও হবে না।
এখন পর্যন্ত কারও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি, তবে একটা রোগী আমাকে নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছে।
খুব অভিজাত পরিবারের এক শিশু। মা-বাবা দুইজনই উচ্চশিক্ষিত, অপারেশনের আগে সন্তানের খাবারের ইতিহাস নিলে জানালেন, সকাল থেকে খালি পেটে আছে—যা মূলত অপারেশনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অপারেশনের শেষের দিকে বাচ্চা বমি করা শুরু করলে আপেল, কমলা ও ডিম জুস একদম সতেজ। ওই মুহূর্তটা এ্যানেসথেশিওলজিস্টের জন্য কঠিন, বিশেষ করে রোগী শিশু হলে, তা অভিজ্ঞ ছাড়া কেই আন্দাজও করতে পারবেন না।
যাই হোক, সফল ম্যানেজের মাধ্যমে শিশু যখন ঝুঁকিমুক্ত হলো, তখন উদগীরণ করা খাবারগুলো মা-বাবাকে দেখালাম। ঘটনার সত্যাসত্য জানতে চাইলে তাঁরা স্বীকার করলেন, অপারেশনের এক ঘণ্টা আগে এগুলো খেয়েছে। মিথ্যা তথ্য দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে বললেন, উনারা দূরে কোথাও যাবেন, হাতে সময় ছিল না, তাড়াতাড়ি অপারেশন করে নিয়ে যাওয়ার জন্য মিথ্যা বলেছেন। আমার আর কিছুই বলার ছিল না, যদিও মরে গেলে মনে হয় না সত্যটা স্বীকার করতো। নিজের চোখে না দেখলে এটা বিশ্বাস করাও আমার জন্য সম্ভব ছিল না।
চিকিৎসক বিশেষ করে এনেস্থেশিওলজিস্টের কাছে কিছু লুকাবেন না, জীবনটা আপনার, একবার চলে গেলে আর ফিরে আসবে না।
এএনএম/