ডা. মো. জয়নাল আবেদীন টিটো
২১তম বিসিএসের একজন সদস্য
সাবেক লাইন ডিরেক্টর, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর
১৪ ডিসেম্বর, ২০২৩ ০১:৫৬ পিএম
সন্তোষজনক চিকিৎসা নিশ্চিতে কেমন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা চাই
মাঝে মাঝেই একটা প্রশ্ন উত্থাপিত হয়, চিকিৎসার জন্য রোগীরা বিদেশ যায় কেন? এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষ আছেন, তারা এর সঠিক জবাব দিবেন।
এ দেশের সামরিক, আধা সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা প্রশিক্ষণ গ্রহণের উদ্দেশ্যে জনগণের ট্যাক্সের পয়সা খরচ দেশের বাইরে যাচ্ছেন। এতে খরচ হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা। অবশ্য এর রিটার্নও পাওয়া যাচ্ছে।
দেশে সামরিক বেসামরিক অফিসারদের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র তৈরি করা হলে এই সমস্যার সমাধান হয়ে যায়।
এ দেশে জায়গা জমি থাকতেও বিদেশে বাড়ি-ঘর কেন করেন—এমন প্রশ্ন কি প্রবাসীদেরকে এবং অর্থ পাচারকারী দুর্বৃত্তদের কেউ করেছেন?
এ দেশে তো অনেক শপিং মল আছে। তাহলে কেনাকাটার জন্য বিরাট সংখ্যক মানুষ বিদেশ কেন যান? এ দেশের মানুষ শপিং করে কোটি কোটি টাকা (ডলারে রূপান্তর করে) বিদেশে ঢেলে আসেন, এ জন্য ব্যবসায়ী সমিতির কাছে জবাবদিহিতা চাওয়া হয়েছে?
দেশে থাকতেও বিদেশ থেকে ওষুধ কেন?
এদেশে Aspirin, Clopidogrel, Metformin, Linagliptin, Beta blocker, Angiotenssin Receptor Blocker প্রচুর পরিমাণে উৎপাদিত হয়। এমনকি বিদেশে রপ্তানিও হয়। এ ওষুধগুলো সেবনের মাধ্যমে এদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষের উচ্চ রক্তচাপ এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে আছে। তারপরও দেখছি, কিছু মানুষ বছরের পর বছর ধরে এসব ওষুধ ইন্ডিয়া থেকে আনাচ্ছেন। তাদেরকে কেউ কি জিজ্ঞেস করেছেন, সহজলভ্য এ ওষুধ কেন আপনারা বিদেশ থেকে আনাচ্ছেন? পয়সা কি এদেরকে কামড়ায়?
চিকিৎসা খারাপ হলে সরকারি হাসপাতাল খালি থাকতো
এ দেশে চিকিৎসার মান খারাপ হলে সরকারি হাসপাতালগুলো খালি পড়ে থাকতো। অথচ, প্রতিটি সরকারি হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, অন্তর্বিভাগ এবং বহির্বিভাগে রোগীদের উপচে পড়া ভীড়। কেউ যদি তার কোনো আত্মীয়কে দেশের সরকারি হাসপাতালের অন্তর্বিভাগে ভর্তি করাতে চান, তাহলে তিনি বিছানা খালি পাবেন না, অতিরিক্ত রোগী হিসেবে তাকে ফ্লোরে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হবে।
পাকিস্তান আমলে এ দেশে মান সম্পন্ন চিকিৎসক ছিলেন না। একনায়ক শাসক আইউব খানের আমলে প্রয়োজনীয় সংখ্যক চিকিৎসক তৈরির জন্য সাতটি মেডিকেল কলেজ স্থাপন করা হয়। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তৈরি করার জন্য সরকারি খরচে এদেশ থেকে ডাক্তারদেরকে ইংল্যাণ্ডে পাঠিয়ে এমআরসিপি এবং এফআরসিএস ডিগ্রি করিয়ে আনা হতো। পোস্ট গ্রাজুয়েশনের পর তাদেরকে সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হতো। (বিলাত ফেরত এমন কয়েকজন চিকিৎসক মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন।)
প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে বিলাতের রয়্যাল কলেজ ফিজিশিয়ান্স অ্যান্ড সার্জন্সের আদলে তৈরি করা হয় পাকিস্তান কলেজ অব ফিজিশিয়ান্স অ্যান্ড সার্জন্স। স্বাধীনতার পরে এটা বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ান্স অ্যান্ড সার্জন্সের (বিসিপিএস) নামে নামকরণ করা হয়।
পাকিস্তান আমলে সম্ভব হলেও এমআরসিপি, এমআরসিএস অথবা ক্লিনিক্যাল বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করার জন্য কোনো চিকিৎসককে এখন সরকারি খরচে বিদেশে পাঠানো হয় না।
বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রত্যাশী একজন চিকিৎসক আট-দশ বছর অমানুষিক পরিশ্রম করে অর্থ উপার্জন করে, তারপর সেই অর্থ খরচ করে সরকার হতে ছুটি নিয়ে ডিগ্রি অর্জন করে আসেন।
২০ বছরের আগের সেটআপ কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা দুরুহ
সারা পৃথিবী বদলে যাচ্ছে। নতুন নিয়ম, নতুন ব্যবস্থাপনা, নতুন টেকনোলজি—এসব নিয়ে সারা বিশ্ব তাল মিলিয়ে চলছে। সুতরাং আমাদেরও এভাবে চলতে হবে।
১৫-২০ বছরের আগের সেটআপ দিয়ে খুব সুন্দর ও কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া এখন আর সম্ভব না। এই সময়ে আমি যা খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে করছি, সেটা হলো—একটি চমৎকার ইমার্জেন্সি বিভাগ গড়ে তোলা, যেখানে ২৪ ঘণ্টা ২/৩ জন চিকিৎসক, তিনজন নার্স, এসএসিএমও, ওয়ার্ড বয়, প্যাথলজিস্ট, রেজিওলজিস্ট, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট থাকবেন। এখানে ইনভেস্টিগেশন হবে। রোগী আসার সঙ্গে সঙ্গে সম্মানজনক ব্যবহারের মাধ্যমে এক স্টাফ সুন্দরভাবে রিসিভ করবেন। এর পর কর্তব্যরত চিকিৎসক রোগীকে দেখবেন।
অনেক সময় রোগীকে ওয়ার্ডে নিতে দশ মিনিট সময় ক্ষেপণ হয়ে যায়, এতে গুরুতর রোগীর কিছুটা ক্ষতি হয়ে যায়। যেমন—মারাত্মক রক্তক্ষরণ, হার্ট অ্যাটাক, সড়ক দুর্ঘটনায় আহত রোগী। এজন্য জরুরি বিভাগ এমন হওয়া উচিত, যাতে সেখানে সব ধরনের চিকিৎসক থাকবেন। ফলে এক মিনিটের মধ্যে জরুরি সেবা শুরু হয়ে যাবে। হতে পারে রোগীর রক্তের গ্লুকোজ অনেক পড়ে গেল, অথবা অনেক বেড়ে গেল, সেজন্য অনতিবিলম্বে যেন সেখানেই প্যাথলজিক্যাল, আল্ট্রাসনো করার সুযোগ থাকে। পাজরের হাঁড় ভেঙে যাওয়া রোগীর এক্স-রে করার সুবিধা যেন থাকে। রোগীর অবস্থার উন্নতি হলে পরে সেখান থেকে ওয়ার্ডে পাঠানো হবে।
এমন ওয়ানস্টপ সার্ভিস সেন্টার থাকতে হবে। সারা পৃথিবীতে এটি অনুসরণ করা হচ্ছে। জনস্বার্থে আমাদেরও এই ব্যবস্থা চালু করার উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
স্বাস্থ্য ব্যয় বিনিয়োগ
আরেকটি বিষয় হলো, স্বাস্থ্য খাতের ব্যয়কে অনেকে কেবলই ব্যয় মনে করেন, অপচয় মনে করেন। এটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। স্বাস্থ্য খাতের খরচ মূলত বিনিয়োগ। এই বিনিয়োগ ভবিষ্যতে রাষ্ট্রকে অনেক বেশি রিটার্ন দেবে।
আমাদের দেশে এখনো মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ০.৯ শতাংশ স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় হয়। এর মধ্যে চিকিৎসকের বেতন, নতুন নতুন অবকাঠামো তৈরি, রোগীদের ওষুধ কেনা, গজ-ব্যান্ডেজ কেনা, প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্ত। অথচ শ্রীলঙ্কার ব্যয় ৬ শতাংশ। মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে স্বাস্থ্যখাতে আমাদের চেয়ে অনেক বেশি ব্যয় আছে।
গতকাল বিবিসির একটি প্রতিবেদনে বিশ্বের কোন দেশে মানুষ বেশি থাকতে পছন্দ করে, এমন একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে। এতে অধিকাংশ মানুষের শীর্ষ পছন্দের দেশ, যেখানে নিরাপত্তা বেশি। দ্বিতীয় অবস্থানে আছে সেসব দেশ, যেখানে সহজে-সুলভে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া যায়।
আমাদের জনবল আছে, যাদেরকে চমৎকার উপায়ে কাজে লাগানো সম্ভব। এদেশে সুন্দর একটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে পারলে গরিব জনগণের একটি মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা যাবে।
জেলা-উপজেলায় চাই মানসম্মত হাসপাতাল
এ ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় মেডিকেল কলেজ না গড়ে, জেলায় এবং উপজেলায় মানসম্মত হাসপাতাল গড়ে তোলা এখন খুবই প্রয়োজন। এটা অবশ্যই সম্ভব। এ জন্য দরকার সুষ্ঠু পরিকল্পনা, স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান এবং সেটা বাস্তবায়নে দরকার দৃঢ় সংকল্প ও নিবেদিতপ্রাণ একদল কর্মী।
আমি নিশ্চিত, ভালোভাবে চেষ্টা করলে এদেশের জেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালগুলোকে 'ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টারে' রূপান্তর করা সম্ভব। এজন্য 'ট্যালেন্ট হান্ট' 'আইডিয়া হান্ট' করা খুবই প্রয়োজন।
চীনারা চাচ্ছে, এদেশের জেলা শহরগুলোতে ৫০,০০০ শয্যার হাসপাতাল তৈরি করবে, এবং এদেশের চিকিৎসক, নার্সদের সে হাসপাতালে চিকিৎসা সেবায় নিয়োগ করবে।
আমরা যদি নিজেদের স্বপ্ন নিজেরা বাস্তবায়ন না করি, তাহলে অন্য কেউ আমাদের স্বপ্ন ছিনতাই করবে এবং তার মতো করে সেটা বাস্তবায়ন করবে।
এএনএম/