অধ্যাপক ডা. রিদওয়ানুর রহমানের মৃত্যুতে বিশিষ্টজনদের শোক
মেডিভয়েস রিপোর্ট: মেডিসিনের দেশবরেণ্য চিকিৎসক, শিক্ষক অধ্যাপক ডা. রিদওয়ানুর রহমানের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন বিশিষ্টজনেরা। তারা বলেছেন, ক্ষণজন্মা এ চিকিৎসকের বিকল্প পাওয়া কঠিন। তার বিদায়ে দেশের স্বাস্থ্যখাতের অভাবনীয় ক্ষতি হয়ে গেল। কর্ম ও দক্ষতায় রিদওয়ানুর রহমানকে অনুসরণ করার মাধ্যমে চিকিৎসা বিজ্ঞানে কাঙিক্ষত উন্নতি সাধন সম্ভব।
প্রখ্যাত এ মেডিসিন বিশেষজ্ঞের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ।
চিকিৎসা বিজ্ঞানে তাঁর অবদানের কথা স্মরণ করে তিনি মেডিভয়েসকে বলেন, ‘অধ্যাপক ডা. রিদওয়ানুর রহমান আমার ব্যক্তিগত পরিচিত ও খুব কাছের মানুষ ছিলেন, আমাকে অনেক সম্মান করতেন। বয়সে আমার একটু জুনিয়র হলেও আমি তাকে সম্মান করতাম। তাঁর মৃত্যুতে আমি অত্যন্ত দুঃখিত ও মর্মাহত।’
অধ্যাপক রিদওয়ানুর রহমানের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘হাজার হাজার শিক্ষার্থী মরহুম রিদওয়ানুর রহমানের জন্য দোয়া করবে, আমিও দোয়া করি, আল্লাহ তাঁকে বেহেশত নসিব করুন।’
অধ্যাপক এবিএম আব্দুল্লাহ আরও বলেন, ‘করোনা ও ডেঙ্গু মহামারিতে মানুষকে সচেতন করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন ডা. রিদওয়ানুর রহমান। জনস্বাস্থ্য বিষয়ে যে কোনো সমস্যা সমাধানে সরকারকেও অসংকোচে পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। সম্মুখসারির যোদ্ধা হিসেবে কাজ করেছেন। তাঁর অবদান অনস্বীকার্য, জাতিকে তাঁকে মনে রাখবে।
শোক বার্তায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার (এনসিডিসি) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. রোবেদ আমিন বলেন, প্রফেসর রিদওয়ানুর রহমান আমার শিক্ষক, আমার পরামর্শক, একজন অবিশ্বাস্য মানুষ, একজন নিবেদিত প্রাণ, গবেষক, দার্শনিক, জাদু শিক্ষাবিদ, সত্যিকারের ইন্টার্নিস্ট, কিংবদন্তি শিক্ষক, একজন স্বপ্নদর্শী এবং বাংলাদেশের মেডিকেল খাতের সবচেয়ে বড় হৃদয়ের মালিকানাধীন স্কলাস্টিক ব্যক্তিত্ব। তার মৃত্যু একটি বিশাল কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট এবং তার অনন্ত একমুখী যাত্রা চালাচ্ছি...।
তিনি বলেন, রিদওয়ানুর রহমান বাংলাদেশের চিকিৎসা ইতিহাসে সর্বকালের সেরা চিকিৎসা শিক্ষক ও ইন্টার্নিস্ট ছিলেন। তিনি একজন হাস্যরসাত্মক, ভদ্র এবং সহজ সরল চরিত্রের অধিকারী ছিলেন, যা খুব কমই পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। প্রফেসর রিদওয়ান স্যার ছিলেন অনন্য কেন্দ্রীয়ভাবে আকর্ষণীয় আশ্চর্যজনক নিষ্পাপ আত্মা সঙ্গে একটি গলে যাওয়া নরম হৃদয়, যা কেউ কখনও দেখতে পারে না। তিনি আমাদের সবার সাথে কী ছিলেন তার তুলনায় শব্দগুলো কিছুই নয়। আমি গভীরভাবে শোকাহত এবং আমার চোখ থামাতে পারছি না। রিদওয়ানুর রহমান শুধু রিদওয়ানুর রহমানই নন, জিনিয়াস তার মধ্য নাম।
শোক জানিয়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজির বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মাহমুদুজ্জামান মেডিভয়েসকে বলেন, মেডিকেল ডায়াগনোসিসসহ যেকোনো ব্যাপারেই অধ্যাপক ডা. রিদওয়ানুর রহমান সবাইকে হাসিমুখে সাহায্য করতেন, তিনি খুবই আন্তরিক ছিলেন। মেডিকেল গবেষণায়ও তাঁর বিরাট অবদান রয়েছে। এমন বিদগ্ধজনকে হারানো জাতির জন্য অনেক বড় ক্ষতির বিষয়।
তিনি বলেন, ‘মেডিকেল গবেষণায় বিখ্যাত অধ্যাপক ডা. ফয়েজ স্যার আর রিদওয়ান স্যার এক সঙ্গে কাজ করতেন। গবেষণায় এই দুইজনের অবদান অনেক। স্যারকে হারানো জাতির জন্য অনেক বড় ক্ষতির। আমরা অনেক বেশি শোকাহত।’
ডা. মোহাম্মদ মাহমুদুজ্জামান আরও বলেন, ‘সহকর্মী ছাড়াও স্যার আমাদের শিক্ষকের মতো ছিলেন। বড় কথা হচ্ছে, স্যারের কাছে খুব সহজেই পৌঁছানো যেত। আমরা যারা মেডিকেল সাইন্সে আছি, তারা স্যারকে অনেক বেশি অনুভব করবো। স্যারকে আল্লাহ বেহেশত নসিব করুক।’
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) অধ্যাপক ডা. মাহবুব মোতানাব্বি বলেন, অধ্যাপক ডা. রিদওয়ানুর রহমান প্রায় আমার সমবয়সী। তাঁর স্ত্রী অধ্যাপক রাশেদা সামাদ আমাদের পেডিয়াট্রিক্সের ছোট বোন। পরিচয়ের অনেক আগেই তাঁর জ্ঞান, বুদ্ধি, বিবেচনা নিয়ে অনেক কিছু শুনেছি। সাধারণত এ রকম জ্ঞানী মানুষদের কাছে ভিড়া মুশকিল। কিন্তু প্রথম পরিচয়েই এমনভাবে কথা বললেন যেন অনেক দিনের পরিচিত।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের অল্প কিছু মানুষ যারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে টেবিল চাপড়ে কথা বলার ক্ষমতা রাখেন। রিদওয়ান ভাই তাঁদেরই একজন। রিসার্চ গেটে তিন হাজারের বেশি সাইটেশনের কথা উল্লেখ করা আছে। এমন মানুষের ইউটিউবে অ্যাপ্রোচ টু এ ফিভার ক্লাস দেখে আমি থ। এই ক্লাস আমিও নেই। কিন্তু এতো সাধারণ, এতো সহজ ভাষা! জ্ঞানের কোনো প্রকাশই নেই। বোঝার উপায়ই নেই লোকটি এতো জানেন। এতো ভেজাল শিক্ষকের ভিড়ে একজন সত্যিকারের শিক্ষককে হারালাম। মৃত্যুর কোনো অকাল নেই। সবই মহান স্রষ্টার পূর্ব নির্ধারিত। তবে এমন মানুষ আরও একশ’ বছর বাঁচলেও মনে হতো, যথেষ্ট হয়নি। এসব মৃত্যু স্মরণ করিয়ে দেয়, চিকিৎসকরা কিভাবে নিজের আয়ু,আরাম আয়েশ উৎসর্গ করছেন অন্যদের জন্য। মহান আল্লাহ আমাদের ছোট বোন রাশেদা ও পরিবারের সদস্যদের ধৈর্য ধারণ করার তৌফিক দিন।
শোক জানিয়ে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. আসিফুর রহমান বলেন, ‘অধ্যাপক ডা. রিদওয়ানুর রহমান স্যার যা পড়াতেন তার বেশিরভাগই তার নিজের ব্রেনে ফিল্টার করে সাজানো থাকতো। তিনি ১০০ বইয়ের রেফারেন্স একসাথে কম্পাইল করতে পারতেন, কি নিখুঁত! আমি তখন এফসিপিএস পার্ট-১ করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতা মেডিসিন ট্রেনি করছি। Admission ডে, হঠাৎ করেই রাউন্ডে এসে এক রোগীর দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে CA বিশ্বজিত দাদাকে ডেকে বললেন- ‘Massive pleural effusion in the right side, x ray করেছেন বিশ্বজিত?’ আমরা অবাক! আমরা সবাই ভাবলাম, রোগী স্যারের পরিচিত, কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, স্যারকে কবে দেখিয়েছেন? রোগী বলে, আমি হেরে চিনিই না! দ্রুত এক্স রে করে দেখলাম- ফুসফুসের ডান পাশ পুরা সাদা! তখন CA বিশ্বজিত দা আর আমরা মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছি, এটা কেমনে সম্ভব! ১০ ফুট দূর থেকে রোগীর রোগ বলে দেয়া! পরের দিন দ্য লিজেন্ড রাউন্ডে এসে বললেন, আসো বাচ্চারা! আজ তোমাদের Decubitus পড়াবো, কোন রোগী কোন পজিশানে থাকলে কি কি রোগ মাথায় আনবা!’ আহা ক্লাস! আহা রোগ নির্ণয়। আহা পড়ানোর স্টাইল, আহা কনফিডেন্স!
কুমিল্লা জেনারেল হাসপাতালের কনসালটেন্ট ডা. তাইফুর রহমান স্মৃতিচারণ করে বলেন, একজন রিদওয়ান স্যারের মৃত্যু! কি যে অপূরণীয় ক্ষতি হলো এই বাংলাদেশের! কে বুঝবে এই অভাগা বাংলায়? সেই ৯২ সালে স্যারের সাথে দেখা কক্সবাজারে। কক্সবাজারের মেডিসিন কনসালটেন্ট। বেশ নামডাক, একচ্ছত্র আধিপত্য। স্যারকে বললাম, স্যার আপনি আমাদের মেডিকেল কলেজে চলে আসেন। আমরা আপনার কাছ থেকে অনেক কিছু শিখতে পারবো। স্যার হাসি দিয়ে বললেন, আমি বাঘের লেজ হওয়ার চাইতে বিড়ালের মাথা হওয়া পছন্দ করি। আমাদের ছাত্র থাকা অবস্থায়ই স্যার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে আসলেন বদলি হয়ে। মাথা হয়েই আসলেন। মা-বাবা, আত্মীয় স্বজন কেউ আসলেই স্যারের কনসালটেশন নিতাম। পঞ্চম বর্ষে থাকা অবস্থায় আমার বাবা বারডেম হাসপাতালের আজাদ স্যারকে দেখালেন পেটের সমস্যার জন্য। আজাদ স্যার ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দিলেন। স্যারের সাথে আলাপ করলাম। স্যার বললেন চিটাগংয়ে নিয়ে আসো। স্যার পরীক্ষা নিরীক্ষা করে বললেন আপনার কোনো রোগ নেই। আব্বা বললেন, আমার তো অস্বস্তি লাগে। স্যার বললেন, আমার একজন ছাত্রের বাবাকে রোগ নাই বলার আগে আমি দশবার চিন্তা করেছি।
তিনি বলেন, ইন্টার্নির সময় আমার শ্বাসকষ্ট শুরু হলো। স্যার আধাঘণ্টা সময় নিয়ে আমাকে ইনহেলার নেওয়া শিখালেন। বললেন, ইংল্যান্ডে শতকরা ৬৫ ভাগ মানুষ ইনহেলার নিতে পারে না। আমি তোমাকে শিখালাম, যাতে তুমিও তোমার রোগীদেরকে শিখাও। স্যার, রোগী দেখা ছেড়ে সার্বক্ষণিক গবেষণায় মনোনিবেশ করেছিলেন। ডব্লিউএইচও’র কনসালটেন্ট হয়ে সারা পৃথিবী চষে বেড়াচ্ছিলেন। স্যারের গবেষণায় আমাদের দেশের কত স্ট্যাটিসটিকস বেড়িয়ে আসতো। সে আর হলো না। হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গেল সব। থেমে গেলো এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের পথচলা।
টিআই/