ঢাবির ৩য় সাপ্লি আয়োজনে ‘নিয়মের ব্যত্যয়’, ২ বছর পিছিয়ে যাওয়ার শঙ্কা শিক্ষার্থীদের
মেডিভয়েস রিপোর্ট: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) অধিভুক্ত মেডিকেল কলেজগুলোর তৃতীয় সাপ্লিমেন্টারি প্রফেশনাল পরীক্ষা নির্ধারিত সময়ে আয়োজনের দাবি জানিয়েছেন ২০১৮-১৯ সেশনের পরীক্ষার্থীরা। তারা বলেন, মেডিকেলের বিদ্যমান কারিকুলাম অনুযায়ী, মে-জুনে নিয়মিত এবং নভেম্বরে সাপ্লিমেন্টারি প্রফের আয়োজন করা হয়। সব সেশনের শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ও সাপ্লি পরীক্ষা এ নিয়মেই হয়ে আসছে। তবে ২০১৮-১৯ সেশনের শিক্ষার্থীদের জানানো হয়, তাদেরকে নভেম্বরের পরিবর্তে ডিসেম্বরে পরের ব্যাচের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সাপ্লি দিতে হবে, নভেম্বরে আলাদা কোনো পরীক্ষার আয়োজন করা হবে না। এতে ইতিমধ্যে এক বছর পিছিয়ে যাওয়া এসব শিক্ষার্থী জাতীয় নির্বাচনের ডামাডোলের প্রেক্ষাপটে আরও পিছিয়ে যাওয়া এবং ফাইনাল প্রফেশনাল পরীক্ষার প্রস্তুতি চরমভাবে বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজধানীর স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের ২০১৮-১৯ সেশনের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমাদের অনেকেই কিছু সমস্যার কারণে মে-২৩ এ অনুষ্ঠিত নিয়মিত প্রফেশনাল পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারেনি। আবার অনেকেই পরীক্ষা দিয়ে খারাপ করে। ডিন স্যারের সাথে কথা বলে জানতে পারি, প্রফেশনাল পরীক্ষা একটাই হবে, ডিসেম্বরে ১৯-২০ সেশনের পরীক্ষা, যাদের ভাইভা শুরু হবে ফেব্রুয়ারিতে। তাদের সঙ্গেই ১৮-১৯ সেশনে সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষায় বসতে হবে।
বিদ্যমান কারিকুলাম অনুযায়ী সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষাকে মেডিকেল শিক্ষার্থীদের প্রাপ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিএমডিসি নিয়ম অনুযায়ী নভেম্বর মাসে এ পরীক্ষা হয়। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সেশনের সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষা সম্পন্ন হয়ে ফলাফলও প্রকাশিত হয়েছে। তারা উত্তীর্ণ হয়ে রেগুলার সেশনে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছে, কিন্তু আমরা যেতে পারছি না।’
করোনায় শিক্ষা কার্যক্রম দারুণভাবে ব্যাহত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘করোনা মহামারীর কারণে আমরা এমনিতেই অনেক পিছিয়ে পড়েছি। আমাদের প্রথম প্রফেশনাল পরীক্ষা ২০১৯ সালের মে মাসের পরিবর্তে পরের বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় প্রফেশনাল পরীক্ষা পিছিয়ে শুধু কারিকুলাম ঠিক রাখতে মে ২০২১ নেওয়া হয়। এ কারণে ইতিমধ্যে আমরা ১ বছরের বেশি সময় পিছিয়ে আছি।’
এ পরিস্থিতিতে নভেম্বরে পরীক্ষায় বসার সুযোগ না পেলে আরও পিছিয়ে যেতে হবে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘এতে মানসিকভাবে অনেকেই বিপর্যস্ত হয়ে পড়বো। তা ছাড়া নির্ধারিত সময়ের এক মাস পর জুনিয়রদের সাথে পরীক্ষায় বসলে তাদের ফাইনাল প্রফে বসা অনিশ্চিতয়তায় পড়বে।’
সাপ্লিমেন্টারি কারিকুলামের অংশ
সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষা মেডিকেল কারিকুলামের অংশ উল্লেখ করে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক শিক্ষার্থী মেডিভয়েসকে বলেন, বাংলাদেশ মেডিকেল এন্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) বিদ্যমান নিয়ম হলো, একটি নিয়মিত প্রফের পর একটি সাপ্লিমেন্টারি প্রফ হবে। আগের নিয়ম অনুযায়ী, মে-জুন মাসে নিয়মিত প্রফ নভেম্বরে সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষা হতো। এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ছিল ফাইনাল প্রফ পরীক্ষা। কারণ ফাইনাল প্রফ নভেম্বরে হতো। কিন্তু করোনা মহামারির কারণে পাঁচ-সাত মাস পিছিয়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে এটি ওলটপালট হয়ে যায়। তার পরও আমাদের আগের ও পরের সকল ব্যাচেরই নিয়মিত প্রফের পাশাপাশি সাপ্লিও হয়েছে। আমাদের বেলায় বলা হচ্ছে, পরের নিয়মিত ব্যাচের সঙ্গে পরীক্ষা আয়োজন হবে। শুধু ১৮-১৯ সেশনে এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটলো, যা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।
এমবিবিএস জীবনে সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষার মুখোমুখি হননি এমন শিক্ষার্থীর সংখ্যা নেহাতই হাতেগোনা বলেও জানান তিনি।
শিক্ষাবর্ষ থেকে পিছিয়ে যাওয়ার গল্প
অন্য ব্যাচের চেয়ে এ সেশনের শিক্ষার্থীদের অপেক্ষাকৃত বেশি পিছিয়ে যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে ঢাকা মেডিকেল কলেজের এই শিক্ষার্থী বলেন, ‘২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে আমাদের প্রথম প্রফ পরীক্ষা হয়। তখন বলা হয়েছিল, একই সনের নভেম্বরে-ডিসেম্বরে সেকেন্ড প্রফ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। সেকেন্ড প্রফের বিষয়গুলো যেমন—ফরেনসিক মেডিসিন, কমিউনিটি মেডিসিন অতটা জটিল না হওয়ায় সময়ের ব্যবধান কমিয়ে আনার কথা শুনে পরীক্ষা দিই। তখন স্যার জানান, এ প্রক্রিয়ায় হারিয়ে যাওয়া সময়টা আমরা সমন্বয় করে ফেলবো। পরবর্তীতে ২১ সালের নভেম্বরে সেকেন্ড প্রফ না নিয়ে ২০২২ সালের মে মাসে দ্বিতীয় প্রফ পরীক্ষার আয়োজন করেন। অথচ রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও সিলেট—তারা সময়টা কমিয়ে নিয়ে আসেন। কিন্তু আমাদের বেলায় ঘটে এর উল্টো চিত্র। এ কারণে আমরা অন্য ব্যাচের তুলনায় পুরো এক বছর পিছিয়ে গেছি।’
‘আমাদের থার্ড প্রফটা এক বছর পর গত মে-জুন মাসে আয়োজন করা হয়। আমাদের পরের ব্যাচের সেকেন্ড প্রফ ছয় মাস এগিয়ে জানুয়ারি মাসে নিয়ে আসা হয়েছে। এ কারণে তাদের সঙ্গে আমাদের ফারাকটা কমে গেছে, সাধারণত তা থাকার কথা এক বছর। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২১ সনের নভেম্বরে আমাদের দ্বিতীয় প্রফ আয়োজন করা হলে এই ব্যবধান এক বছরই থাকতো। কিন্তু তা না করায় তাদের সঙ্গে আমাদের ব্যবধান হয়ে গেল মাত্র ছয় মাসের’—যোগ করেন তিনি।
নিয়মিতদের সঙ্গে সাপ্লিতে বসলে যেসব ক্ষতি
চিকিৎসা বিজ্ঞান অনুষদের ডিনের প্রস্তাব অনুযায়ী পরের ব্যাচের সঙ্গে সাপ্লিতে বসলে তাদের ব্যাপক ক্ষতি হবে জানিয়ে এক শিক্ষার্থীরা বলেন, অনেকে নানা কারণে নিয়মিত থার্ড প্রফে বসতে পারেননি। তারা সাল্পিমেন্টারিতে বসবেন। এখানে যদি দুর্ভাগ্যবশত তার আরও একটি সাপ্লি আসে, তাহলে ফাইনাল প্রফে বসার একটি অপশন কমে যাবে। সাপ্লি পরীক্ষায় শিক্ষার্থী কম থাকায় কম সময়ে শেষ হয়ে যায়। এ ব্যাচে ১০-১৫ জন সাল্পি পরীক্ষার্থী আছে, এটা একদিন ভাইভা নিলেই শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু নিয়মিত প্রফে এক-দেড় মাস ধরে ভাইভা হবে। কোনো এক বিষয়ে সাপ্লি খেলে তাকে নিয়মিতদের সঙ্গে পুরো চার মাস ধরে পরীক্ষার প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকতে হবে।
পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে জানিয়ে তারা বলেন, ‘১৯-২০ সেশনের নিয়মিতদের লিখিত পরীক্ষা হবে ডিসেম্বর মাসে। ওদের ভাইভা নেওয়ার আগে নির্বাচনের জন্য একটি বিরতি দেওয়া হবে। এর পর ভাইভা শুরু হবে। এভাবে ২/৩ মাস সময় চলে যাবে। সকল প্রক্রিয়া শেষে নিয়মিতদের পরীক্ষা সম্পন্ন হতে ফেব্রুয়ারির শেষ অথবা মার্চ ছুঁয়ে যাবে। ফলাফল পেতে এপ্রিল চলে আসবে। থার্ড প্রফের সাপ্লির জন্য মানসিকভাবে ঝুলে থাকার পাশাপাশি এর মধ্যে ফাইনাল প্রফের প্রস্তুতিও নিতে হবে, এটা তো অসম্ভব।’
দুই বছর পিছিয়ে যাওয়ার শঙ্কা
এখানেই সংকটের শেষ নয় উল্লেখ করে মেডিকেল শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘প্রত্যেকটা মেডিকেলেই ইন্টার্নি সংকট আছে। আমাদের আগের ব্যাচে শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপ গত ৩০ সেপ্টেম্বর শেষ হলো, ফলে মেডিকেল কলেজগুলো ইন্টার্নশূন্য। তাদের ফাইনাল প্রফ পরীক্ষা নভেম্বরে নেওয়ার কথা থাকলেও ইন্টার্ন সংকট ঘোছাতে তাদের পরীক্ষা মে মাসে নেওয়া হয়। তাহলে আমাদের বেলায়ও তাই ঘটতে যাচ্ছে। অর্থাৎ ২০২৪ সালের নভেম্বরে আয়োজনের কথা থাকলেও ৫-৬ মাস এগিয়ে মে-জুনে নিয়ে আসা হবে। তাহলে আমরা তো ফাইনাল প্রফের প্রস্তুতির সময়ই পাবো না। মূল কথা হলো, থার্ড প্রফ ক্লিয়ার না থাকলে আমাকে ব্লক পোস্টিংয়েই বসতে দেওয়া হবে না। ইতিমধ্যে আমি এক বছর পিছিয়ে আছি, নতুন করে থার্ড প্রফের জটিলতায় আরও এক বছর পিছিয়ে যাবো।
গভীর উৎকণ্ঠায় বেসরকারি মেডিকেলের শিক্ষার্থীরা
শিক্ষাক্রমের পরিধি বেড়ে যাওয়ায় অবর্ণনীয় ভোগান্তির শঙ্কায় পড়েছেন বেসরকারি মেডিকেলের শিক্ষার্থীরা। শিক্ষাবর্ষের সময় বেড়ে যাওয়ায় বাড়তি সেশন ফি গুণতে হবে জানিয়ে রাজধানীর শহীদ মনসুর আলী মেডিকেল কলেজের এক শিক্ষার্থী মেডিভয়েসকে বলেন, ‘অনেকেই আমরা প্রাইভেট মেডিকেল কলেজে পড়ি। আমাদের পরিবারের উপর বাড়তি একটা টাকার চাপ পড়বে।’
তিনি জানান, বেসরকারি অনেক মেডিকেলে ক্যারিঅন পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় না। এমন পরিস্থিতিতে জুনিয়রদের সঙ্গে সাপ্লি পরীক্ষা দিলে ওরা কখনোই নিয়মিত পরীক্ষায় বসতে পারবে না। সরকারি মেডিকেলের শিক্ষার্থীরা শেষ মুহূর্তে ক্লিয়ারেন্স পেলে হয় তো বসার সুযোগ পাবে, কিন্তু বেসরকারি মেডিকেলের শিক্ষার্থীরা কখনোই পাবে না, বরং জুনিয়রদের সঙ্গেই বসতে হবে। এক্ষেত্রে তাদের ছয় মাস অতিরিক্ত সময় যুক্ত হলে টিউশন ফি গুণতে হবে। কলেজ কর্তৃপক্ষ তখন ষাট বেতনে সন্তুষ্ট থাকবে না। টাকা এবং সময় দুই ঘানিই টানতে হবে তাদের। বেসরকারি মেডিকেলের শিক্ষার্থীদের বেলায় সময়ের চেয়ে টাকাটাই বড় হয়ে দাঁড়ায়, কারণ বাবার কাছ থেকে কত টাকা আনা সম্ভব।
দাবি নিয়ে তিন দফা ডিন কার্যালয়ে
জানা গেছে, দাবি-দাওয়া নিয়ে তিনবার ডিন কার্যালেয়ে গিয়েছেন ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের তৃতীয় পেশাগত সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষার্থীরা।
শিক্ষার্থীরা বলেন, গত ২৪ ও ২৭ সেপ্টেম্বর একই দাবি নিয়ে ডিন অফিসে যান তারা। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) চিকিৎসা বিজ্ঞান অনুষদের ডিন, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ কমিটির চেয়ারম্যান ডা. শাহরিয়ার নবী এ ব্যাপারে তাদের সঙ্গে ওভাবে কিছুই বলতে চাননি। তাঁর পরিষ্কার বক্তব্য, তোমাদের কোনো কথা শুনবো না। দুইবারের ধারাবাহিকতায় ডিনের সঙ্গে দেখা করে নিজেদের দাবি-দাওয়া তুলে ধরতে রোববার (১ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৮টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে একত্রিত হন শিক্ষার্থীরা। পরে সেখান থেকে ডিন কার্যালয়ে যান এবং তাঁর সঙ্গে দেখা করেন। এ সময় তাঁর কাছে দাবি-দাওয়া সম্বলিত দরখাস্ত হস্তান্তর করেন তারা।
শিক্ষার্থীরা জানান, দেশের অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অধিভুক্ত মেডিকেল কলেজসমূহে ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা নিয়মিত প্রফ এবং সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষায় সাফল্য পেয়ে ইতোমধ্যে ফাইনাল প্রফের পড়ায় নিয়মিত হয়েছেন। এ পরিস্থিতিতে নীতিমালা অনুসারে নভেম্বরে তৃতীয় সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষা আয়োজনের দাবি জানান তারা।
বিষয়টি নিয়ে মেডিভয়েসের পক্ষ থেকে ঢাবি ডিনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু একাধিকবার চেষ্টা করেও তাঁকে ফোনে পাওয়া যায়নি।
এমইউ/এএইচ