নীলাভ চোখ ও ভাঙা হাড়ের গল্প
উপজেলা আউটডোরে শিশু বিভাগে রোগীর উপচে পড়া ভিড় থাকে। যেথায় কৃশকায় থেকে স্থুলকায় শিশুর মায়েদের অভিযোগ একটাই বাচ্চা খায় না, শক্তি পায় না, হাঁটতে গেলে পড়ে যায় ও হাত-পা ভাইঙা-চুইরা আসে। হেনো কোনো মা নেই যে, এই কথাগুলো বলে না।
ভর দুপুরে আমার রুমে অনেকটা নাচতে নাচতে এলো ছয় বছরের একটি ছোট্ট মেয়ে। ধরে নিই নাম তার পরী। পরীর মা আমার সামনে উপবিষ্ট টুলে বসে অস্পষ্ট সুরে বলল, মেয়েটি খালি পড়ে যায়, পড়ে হাত পা ভাইঙা যায়।
গড়ে দুই’শ রোগীর মা একই কথা বলেন, তাই কথা ধরতে না পারলে অতি সহজেই যে কারও উপসর্গ বোঝা যাবে না। পাশে বসা দুই ইন্টার্ন সহজলভ্য দৃষ্টিতে পরীর মা’কে দেখে নির্বিকার ভঙ্গিতে বললো, হাত পা ভেঙে-চুরে আসে এই বয়সেই? খাইতে চায় না তাই না? এই বলে আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি।
আমি: নাহ এটা খুব সম্ভবত অন্য কোন কেইস। বাচ্চার মা’কে জিজ্ঞেস করলাম, কি ভেঙে যায়? হাত-পা?
পরীর মা: হ্যা, খালি পড়ে যায়, পড়ে গেলেই হাত-পা ভেঙে যায়।
পরী আপন মনে খেলছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। আমি তৎক্ষণাৎ ওর চোখের দিকে তাকালাম, ওর নীল বর্ণের নিলাভ চাহনি মুহূর্তেই অনেক কিছু বলে দিল আমাকে।
আমি: কত বার ভাঙছে এ পর্যন্ত?
পরীর মা: কয়েক বার চার হাত-পাই ভাঙছে।
আমি কথা বলতে পরীর মায়ের চোখে চোখ রাখলাম, তিনি নিরাস করল না। তার চোখের রঙও হুবুহু পরীর মত।
আমি: বংশে আর কারো আছে?
পরীর মা: হ্যা, আমার ও এমন, অল্পতেই হাত-পা ভেঙে যায়।
আমি: আর কারও নেই? বাবা, নানী, মামা, খালার?
পরীর মা : আমার মারও এমন, একটা ভাইও এমন, আর আমার বোনের ছেলে মেয়েরও এমন হয়।
আমি বুঝলাম, এটিকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় pedigree বলে। অর্থাৎ পরিবারের সবার ওপর এ রোগ প্রভাব বিস্তার করে। পরীর মা বলল, সবারই একই লক্ষণ, হাত পা ভেঙে যায় সহজে।
ইতোমধ্যে পরীর সাথে কথা বলে বুঝলাম, আপাত দৃষ্টিতে কানে শুনতে অসুবিধা নেই ওর। পরীর বার বার ভেঙে যাওয়া হাড় ও নীলাভ চোখের চাহনি আর কিছু নয়, চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ‘Osteogenesis Imperfecta’.
Osteogenesis Imperfecta মোটা দাগের Autosomal Dominant শ্রেণির একটি বংশগত রোগ। আমাদের শরীরে কোলাজেন নামে বিভিন্ন ধরনের প্রোটিন আছে, যা শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ তথা টিস্যুকে শক্তি যোগায়।
বিভিন্ন অঙ্গের মধ্যে অন্যতম হলো cartilage (তরুণাস্থি), tendon, bone (হাড়), skin (ত্বক), sclera (চোখের সাদা অংশ)। বিভিন্ন প্রকার কোলাজেনের মধ্যে type-1 collagen হলো-bone ও skin এর অন্যতম ExtraCellular matrix, যা bone, skin ও অনান্য connective tissue (যোজক কলা) এর শক্তি আর নমনীয়তা প্রদান করে থাকে।
Type-I collagen গঠিত হয় দুটি pro-α1 (I) chains (যা আবার তৈরি হয়ে থাকে COL1A1 gene থেকে) ও একটি pro-α2(I) chain থেকে (যা তৈরি হয়ে থাকে COL1A2 gene থেকে)। দুটি pro-α1 (I) chains ও একটি pro-α2(I) chains মিলে রশির ন্যায় তৃমাত্রীয় triple-stranded procollagen তৈরি হয়।
অত:পর এই Procollagen একে অপরের সাথে যুক্ত হয়ে নিজেদের মধ্যে cross link ঘটিয়ে cell তথা টিস্যুসমূহের মাঝে এক সূক্ষ্ম সমন্বয় সংস্থাপন করে। আর এভাবেই তৈরি হয় strong mature type-I collagen fibers, যা অস্থি,ত্বকসহ অনান্য connective tissue র rigidity and elasticity দিয়ে থাকে।
সহজ ভাষায় এই COL1A1 and COL1A2 Gene প্রোটিন তৈরিতে নির্দেশাবলি দিয়ে থাকে, যা Type-I collagen তৈরি করে।
Osteogenesis Imperfecta মূলত হয়ে থাকে এই COL1A1 or COL1A2 genes এর mutations এর কারণে।
COL1A1 or COL1A2 জিনের mutation এর ফলে type-1 collagen Structural or quantitative defects হয়, যাতে Bones তথা অস্থিতে অস্বাভাবিকভাবে osteoclast activity বেড়ে যায়। আর অস্বাভাবিক osteoblast differentiation হয়, ফলশ্রুতিতে OI তে অস্থি ভঙ্গুর হয়, এজন্য অতি সহজে ভেঙে যায়। তাই এটিকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় Brittle bone disease ও বলা হয়।
চোখ নীলাভ হওয়ার কারণ
আমাদের চোখের সাদা অংশ মূলত type-1 collagen দিয়ে গঠিত। এখানে যেহেতু collagen এর অভাব থাকে তাই চোখের সাদা অংশ অনেকটা পাতলা হয়ে যায়। যার কারণে বাইরে থেকে চোখের venous drainage (শিরাস্থ নিষ্কাশন) দেখা যায়, তাই চোখ নীল দেখায়।
collagen protein দাঁতে যেহেতু ডেন্টিন তৈরিতে সহায়তা করে, যেহেতু OI তে collagen এর অভাব থাকে তাই অস্বাভাবিক ডেন্টিন উৎপন্ন হয়। আর এতে করে দাঁত সহজে ভঙ্গুর হয়, দাঁতের রঙ স্বচ্ছ ধূসর-নীল ও হলুদাভ-বাদামী বর্ণ ধারণ করে। যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় Dentinogenesis imperfecta।
একই কারণে ককলিয়াতে defective bone formation ও ককলিয়ার হেয়ার সেলগুলো atrophy হয়ে যাওয়ার কারণে বধিরতা দেখা দেয়। এ ছাড়াও খর্বাকৃতি, জয়েন্টে নমনীয়তা, চামড়া পাতলা বা কালশিটে দাগ হয়ে যাওয়া, মেরুদণ্ড বেকে যেতে পারে। তবে রোগের প্রকটতা ও লক্ষণ নির্ভর করে প্রকারভেদের উপর।
পরীর লক্ষণ বলে দিচ্ছে, সে Type-I (mild) শ্রেণির অন্তর্গত। রোগের লক্ষণের পাশাপাশি কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা আছে, যা দিয়ে ডায়াগনোসিস করা যায়, যদিও এদেশে তা বহুলপ্রচলিত নয়। Mild শ্রেণির হওয়ায় পরীর ভবিষ্যতে খুব একটা সমস্যা হবে না, এটি বলা যায়। তবে এই রোগে আক্রান্ত রোগীরা সহজেই হৃদরোগ ও ফুসফুসজনিত জটিলতায় ভুগে থাকে।
ভালো থাকুক নীলাভ চোখের চাহনি।