ডা. পুস্পিতা শারমিন

ডা. পুস্পিতা শারমিন

বন্ধ্যত্ব রোগ বিশেষজ্ঞ,কনসালটেন্ট, ইনফারটিলিটি কেয়ার এন্ড রিসার্চ সেন্টার।


২০ নভেম্বর, ২০২২ ০৫:১১ পিএম

বন্ধ্যত্ব: কারণ ও চিকিৎসা

বন্ধ্যত্ব: কারণ ও চিকিৎসা
মাসিকের দশম দিন থেকে ২০তম দিন সময়টাকে ফার্টাইল পিরিয়ড বলা হয়, অর্থাৎ এই সময় দম্পতি নিয়মিত চেষ্টা করলে এবং এক বছর চেষ্টা করার পরেও যদি দেখা যায়, স্ত্রী গর্ভধারণ করছেন না তখন তারা বন্ধ্যত্ব বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে পারেন।

জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার না করেও কোনো দম্পতি এক বছর এক সঙ্গে থেকে সন্তান নেওয়ার চেষ্টার পরও সফল না হলে তাকে বলে বন্ধ্যাত্ব। অনেক দম্পতিই বন্ধ্যত্ব সমস্যায় ভুগছেন। সঠিক সময়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। 

বন্ধ্যত্ব সমস্যা বোঝার উপায়

কোনো জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার ছাড়া নিয়মিত সহবাস এবং যাদের মাসিক নিয়মিত তারা নির্দিষ্ট একটা সময় সহবাস করলে বাচ্চা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। যেমন- মাসিকের দশম দিন থেকে ২০তম দিন সময়টাকে ফার্টাইল পিরিয়ড বলা হয়, অর্থাৎ এই সময় দম্পতি নিয়মিত চেষ্টা করলে এবং এক বছর চেষ্টা করার পরেও যদি দেখা যায়, স্ত্রী গর্ভধারণ করছেন না তখন তারা বন্ধ্যত্ব বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে পারেন।

কখন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন

বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে বন্ধ্যত্ব সমস্যাও বৃদ্ধি পেতে থাকে। দেখা যায়, মেয়েদের প্রজননকাল খুব দীর্ঘ না। একটা নির্দিষ্ট বয়সের পর (মেনোপজ) তাদের জন্মধারণ ক্ষমতা শেষ হয়। স্ত্রীর বয়স যদি ৩০ বছরের নিচে থাকে এবং দম্পতি এক বছর নিজেরা চেষ্টা করার পরও গর্ভধারণ না হলে তারা বন্ধ্যত্ব বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হতে পারেন। স্ত্রীর বয়স বেশি বা যাদের বেশি বয়সে বিয়ে হয়েছে অথবা বেশি বয়সে বাচ্চা নেওয়ার চেষ্টা করছেন, এমন ক্ষেত্রে স্ত্রীর বয়স ৩৫ বা তার বেশি হলে তারা ছয় মাস চেষ্টার করার পরই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে পারেন।

বন্ধ্যত্ব সমস্যায় নারী-পুরুষ উভয়ই দায়ী

গষেণায় দেখা গেছে, বন্ধ্যত্বের জন্য নারী-পুরুষ উভয়ই সমানভাবে দায়ী। শতকরা ৪০ শতাংশ বন্ধ্যত্বের জন্য নারীরা দায়ী আর ৪০ শতাংশ পুরুষ দায়ী। আর বাকি ২০ শতাংশ বন্ধ্যাত্ব সমস্যার কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। এজন্য নারী-পুরুষ উভয়ে সমান দায়ী। কাউকে এককভাবে দোষ দেওয়া যাবে না। এমনকি এ সমস্যার জন্য কেউ নিজে থেকে দায়ী নন। এটা বিভিন্ন কারণে হয়ে থাকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে হরমোনাল কারণেও বন্ধ্যত্ব হতে পারে।

মেয়েদের বন্ধ্যত্বের কারণ 

ডিম্বাশয় ও ডিম্বুনালীতে কোনো সমস্যা অথবা জরায়ুতে সমস্যার কারণে বন্ধ্যত্ব সমস্যা হতে পারে। মেয়েদের প্রতি মাসে নির্দিষ্ট একটা সময় একটি ডিম বড় হয়ে ডিম্বস্ফোটন হয়, যাকে ওভুলেশন বলে। কোনো কারণে নিজে থেকে ডিম বড় না হলে এবং ঠিক মতো ডিম্বস্ফোটন না হলে বন্ধ্যত্ব সমস্যা হতে পারে।

বন্ধ্যত্বে নারীর চিকিৎসা

নারীদের ক্ষেত্রে হরমোন এনালাইসিস করা হয়। হরমোন পরীক্ষার মাধ্যমে তার কিছু কারণ নির্ণয় করা হয়। যেমন- ত্রিশোর্ধ্ব নারীর ডিমের পরিমাণ কেমন আছে তা দেখা হয়। পাশাপাশি থাইরয়েড হরমোনের পরীক্ষা করা হয়। এ ছাড়া রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে তার শরীরে কোনো ক্ষত আছে কি না তাও দেখা হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ টেস্ট ট্রান্স ভ্যাজাইনাল সনোগ্রামের মাধ্যমে জরায়ুর ডিম্বাশয়ের সমস্যা দেখা হয়। আর এর মাধ্যমে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এক পর্যায়ে যদি দেখা যায়, ডিম বড় হওয়ার পরেও গর্ভধারণ ঘটছে না, তখন দেখা হয় ডিম্বুনালী কেমন আছে অর্থাৎ ডিম্বুনালী খোলা আছে কি না। এর জন্য কিছু পরীক্ষার প্রয়োজন হয়। যেমন- স্যালাইন ইনফিউশন সনোগ্রাফি অথবা ল্যাপারোস্কপি। ডিম্বনালী খোলা থাকলে বয়স এবং ডিমের পরিমাণ অনুযায়ী ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা করা হয়। এরপরও ওষুধের মাধ্যমে গর্ভধারণ না হলে আইইউআই চিকিৎসা পদ্ধতিতে গর্ভধারণের চিকিৎসা দেওয়া হয়। এ পদ্ধতি দুই থেকে তিন সাইকেল অনুসরণের পরও কনসিভ না হলে এই ধরনের রোগীদের টেস্ট টিউব চিকিৎসা পদ্ধতির প্রয়োজন পড়ে।

গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমান সময় মহিলাদের অল্প বয়সেই ডিমের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে ৩০ বছরের কম বয়সী মেয়েদেরও ডিমের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে কমে যাচ্ছে। এমনটা জেনেটিক বা পরিবেশগত কারণে হতে পারে। পরিবেশের দূষণ, খাবারে কীটনাশক এবং প্লাস্টিক উপকরণ ব্যবহারের কারণে নারী-পুরুষ উভরই প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে।

পুরুষের বন্ধ্যত্বের কারণ

পুরুষের শুক্রাণুর জন্য বন্ধ্যত্ব হতে পারে। যেমন- শুক্রাণুর তারতম্য হলে, শুক্রাণুর সংখ্যা কমে গেলে বা গতি কমলে অথবা শুক্রাণুর বাহ্যিক আকৃতিতে সমস্যা দেখা দিলে পুরুষের বন্ধ্যত্ব হতে পারে। এ ছাড়া হরমোনাল কারণেও নারী-পুরুষ উভয়ের বন্ধ্যত্ব হতে পারে।

পুরুষের বন্ধ্যত্বের লক্ষণ

পুরুষের বন্ধ্যত্বের সাধারণত কোনো লক্ষণ থাকে না। ফলে এই রোগ হলে অনেকেই বুঝতেও পারেন না। সাধারণত যৌন অক্ষমতা বা সহবাসের সমস্যা ছাড়া পুরুষের তেমন কোনো বন্ধ্যত্বের লক্ষণ প্রকাশ পায় না। ফলে দম্পতিরা চিকিৎসা নিতে আসলে বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষার পর পুরুষের সমস্যা চিহ্নিত হয়। দেখা যায়, শুক্রাণুর সংখ্যা কম বা গতি কম। এক্ষেত্রে সমস্যা অনুযায়ী চিকিৎসা করা হয়। যেমন- শুক্রাণুর সংখ্যা যদি ১০ মিলিয়ন বা তার কম থাকে, তাহলে আইইউআই  চিকিৎসা পদ্ধতিতে চিকিৎসা করা হয়। আর শুক্রাণু যদি অতিমাত্রায় কম থাকে, তাহলে আইভিএফের একটি এডভান্স টেকনোলজি আইসিএসআই (ইক্সি) পদ্ধতিতে চিকিৎসা করতে হয়।

পুরুষের বন্ধ্যত্বের চিকিৎসা

পুরুষের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শুক্রাণু পরীক্ষা করা। এর মাধ্যমে পুরুষের শুক্রাণুর সংখ্যা ও গতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এভাবেই নারী-পুরুষের বিভিন্ন পরীক্ষা করার পরে বন্ধ্যত্বের কারণ নির্ণয় করা হয়। এরপর যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।

কৈশোরে ওভারি সিস্ট ও পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোমে আক্রান্ত হলে

পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম প্রকৃত পক্ষে সিস্ট নয়। এতে মেয়েদের শরীরে পুরুষ হরমোনের মাত্রা স্বাভাবিকের থেকে কিছুটা বৃদ্ধি পায়। টেস্টোস্টেরন হরমোনের মাত্রা বেড়ে গেলে মাসিক অনিয়মিত হয় এবং ডিমগুলো নিজে থেকে বড় হতে পারে না। তখন ডিমগুলোতে ওভারিতে সিস্টের মতো দেখায়। এ কারণে একে বলা হয় পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম। এখানে আশার কথা হলো, পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম রোগীদের ডিমের পরিমাণ ভালো থাকে। এই ধরনের রোগীদের যথাযথ চিকিৎসা হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কনসিভ করে থাকেন। তবে পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম রোগীদের ওজন বৃদ্ধির সাথে সাথে এই ধরনের সমস্যাগুলো বাড়তে থাকে। ওজন বৃদ্ধির ফলে হরমোনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়, মাসিক অনিয়মিত হয় আর বাচ্চা না হওয়ার সমস্যা আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে। কিশোরী বয়স থেকেও পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম শুরু হতে পারে। তাই কিশোরী মেয়ের মাসিক অনিয়মিত হলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। আর কিশোরী বয়স থেকে পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোমে ভুগলে তাকে জীবন-যাপনে পরিবর্তন আনতে হবে। এমন নারীদের ওজন নিয়ন্ত্রণে শরীর চর্চা ভালো উপায় হতে পারে। পাশাপাশি এই ধরনের রোগীরা শর্করা জাতীয় খাবার কম খাবেন এবং প্রোটিন, ফ্যাট, আঁশ জাতীয় খাবার ও সবিজ পর্যাপ্ত পরিমাণে খেতে হবে। এতে তার ওজন বাড়বে না।

পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোমের রোগীদের চিকিৎসা

পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোমের রোগীদের অপটিমাম ডোজ যথাযথভাবে দেওয়া হলে অধিকাংশ রোগী কনসিভ করে। তবে কিছু রোগী আছে যাদের ওষুধ, ইনজেকশন দেওয়ার পরেও ডিম বড় হচ্ছে না। এক্ষেত্রে ল্যাপারোস্কোপিক ওভারিয়ান ড্রিলিং করা হয় অর্থাৎ ডিম্বাশয় ড্রিলিং বলে একটি পদ্ধতি আছে, তা প্রয়োগ করা হয়। তবে ড্রিলিং খুব কম সংখ্যক রোগীর ক্ষেত্রে প্রয়োজন হয়। এর সুবিধা-অসুবিধা দুটোই আছে। যার শুধু প্রয়োজন তাকেই করা হয়। সবাইকেই ড্রিলিং করতে হবে এমন না।

বন্ধ্যত্ব নিরাময় অসম্ভব যখন

পুরুষের ক্ষেত্রে শুক্রাণু তৈরি না হলে অর্থাৎ পুরুষের শুক্রাণু একেবারেই পাওয়া না গেলে নিরাময় সম্ভব হয় না। আর মেয়েদের বেলায় ডিমের পরিমাণ এতটাই কমে গেছে, যা কোনোভাবেই পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এটি একটি সমস্যা হতে পারে। আবার কিছু কিছু রোগী আছে, যাদের জরায়ুর ভিতরের আবারণ নষ্ট হয়ে যায়। যখন ডিম্বাণু ও শুক্রাণু পাওয়া যায় না। তখন অন্য জনের জরায়ুতে ভ্রণ স্থানান্তর করার পদ্ধতিতে রোগীর চিকিৎসা দেওয়া হয়। এগুলো এ্যাডভান্স টেকনোলজি।

কাদের জন্য টেস্ট টিউব পদ্ধতি

স্ত্রীর দুটি ডিম্বুণালী বন্ধ থাকলে আইভিএফ পদ্ধতি ছাড়া অন্য কোনো উপায় থাকে না। এ ছাড়া কিছু দম্পতি আছে, তাদের সব কিছু স্বাভাবিক থাকার পরেও কনসিভ হচ্ছে না। এটাকে বলা হয় আনএক্সপ্লেইনড ইনফার্টিলিটি (ব্যাখ্যাতীত বন্ধ্যত্ব)। যখন কোনো দম্পতিকে শেষ পর্যন্ত আইভিএফ পদ্ধতিতে যেতে হয় তখন তাদের কাউন্সিলিং করা হয়। এরপর যদি তারা টেস্ট টিউবে যান, তখন সাধারণ এই চিকিৎসা পদ্ধতি শুরু করা হয়। এ ক্ষেত্রে সাধারণত স্ত্রীর উপর প্রধান চিকিৎসাটা শুরু হয়। যেমন- মাসিকের সময় ইনজেকশন দিয়ে ডিম বড় করা। ডিম বড় করতে ১০ থেকে ১২ দিন সময় লাগে। তবে কারো কারো দুই দিন কম বেশি সময় লাগতে পারে। এরপর ডিম বড় হয়ে গেলে ট্রান্সভ্যাজিনাল আল্ট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়। এরপর পুরুষের শুক্রাণু প্রস্তুত করার পর সেই শুক্রাণু এবং ডিম্বাণু নিষিক্ত করার পর মাইক্রোস্কোপ আন্ডার মাইক্রোস্কোপে একটি ডিমের ভিতরে একটি শুক্রাণু নিডেল দিয়ে প্রবেশ করিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে দেখা হয় নিষিক্ত হলো কি না এবং ভ্রুণ তৈরি করলো কি না। ভ্রুণ তৈরি হওয়ার পরে সেটি স্ত্রীর জরায়ুতে প্রতিস্থাপন করা হয় এবং প্রতিস্থাপনের দুই সপ্তাহ পরে রক্ত পরীক্ষা করে বোঝা যায় যে, কনসিভ হয়েছে কি না। এই পুরো প্রক্রিয়ায় প্রায় এক মাসের মতো সময় লাগে। এ্যাডভান্স পদ্ধতি হওয়া এটা একটু ব্যয়বহুল। টেস্ট টিউব পদ্ধতিতে গড়ে সাধারণত খরচ তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা। এই চিকিৎসা পদ্ধতির সফলতার হার ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ। তবে স্ত্রীর বয়স কম হলে সফলতার হার বেশি হয়। 

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত