২৮ জুলাই, ২০২২ ০৬:৪৯ পিএম

হেপাটাইটিস: বয়স্কদের পাশাপাশি ঝুঁকিতে শিশুরাও

হেপাটাইটিস: বয়স্কদের পাশাপাশি ঝুঁকিতে শিশুরাও
চিকিৎসকরা বলেন, হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীরা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকে।

আসাদুল ইসলাম দুলাল: দেশে লিভার রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। বয়স্কদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শিশুরাও আক্রান্ত হচ্ছে এই রোগে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাসের কারণে লিভার সিরোসিস থেকে ক্যান্সার পর্যন্ত হয়। দেশে দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি হেপাটাইটিস রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি হেপাটাইটিস লিভারের কার্যক্ষমতা আস্তে আস্তে কমিয়ে দেয়। লিভারে আক্রান্তদের সংখ্যা বাড়লেও দেশে সফলভাবে চলছে লিভার রোগের চিকিৎসা।

কারণ

লিভার রোগের কারণ সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) হেপাটোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. দুলাল চন্দ্র দাস মেডিভয়েসকে বলেন, সাধারণত বাচ্চারা হেপাটাইটিস ‘এ’ ও বয়স্করা ‘ই’ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়। এটা সাধারণত অ্যাকিউট ভাইরাস। এ ভাইরাস নিজে থেকেই ভালো হয়ে যায়। হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাসকে সাধারণত ক্রনিক বলা হয়। দেশে হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাস থেকে অধিক হারে ক্রনিক হেপাটাইটিস হয়, ৪-৫% ক্ষেত্রে হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাস হয়। ক্রনিক হেপাটাইটিস সাধারণত চারটি ভাইরাসকে বলা হয়। হেপাটাইটিস এ, ই, বি ও সি ভাইরাস। আরও কিছু কিছু আছে, যাকে ফ্যাটি লিভার বলা হয়। সেটাও ক্রনিক ইমপ্লিমেন্টশন বা ক্রনিক ডিজিজ করে থাকে লিভারে। এর মাধ্যমেও লিভার আক্রান্ত হতে পারে। উইলসন ডিজিজ, যা লিভারের মধ্যে কপার (তামা) জমা হয়, ফলে লিভার আক্রান্ত হতে পারে। হেমোক্লোম্যাটোসিস জাতীয় কিছু কিছু অসুখ থেকেও লিভার আক্রান্ত হয়। এ ছাড়া গর্ভাবস্থায় কিছু কিছু রোগ হয় মহিলাদের। এইগুলো প্রধানত হেপাটাইটিস বি, সি ও ক্রনিক অ্যাকিউট থেকে হয়। এ ছাড়া হেপাটাইটিস এ, ই ভাইরাস থেকেও হয়। নবজাতক বাচ্চাদের ক্ষেত্রে সাধারণত ফিজিওলজিক্যাল জন্ডিস বলা হয়ে থাকে। এটা আপনা-আপনি ভালো হয়ে যায়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্যাথলজিক্যাল হয়, যদি বাচ্চা প্রি ম্যাচিউর বা ৩৭ সপ্তাহের পূর্বে শিশু জন্মগ্রহণ করে, তাদের ক্ষেত্রে এই জন্ডিস হতে পারে। এমনকি ইনফেকশন হলেও এই রোগ হতে পারে।

লিভার রোগের কারণ সম্পর্কে ঢাকা মেডিকেল কলেজের (ঢামেক) গ্যাস্ট্রোএন্ট্রোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. হাফেজা আফতাব মেডিভয়েসকে বলেন, লিভার রোগের বিভিন্ন কারণ রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান কারণ হচ্ছে ইনফেকশন। এর মধ্যে হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাস, যা দীর্ঘমেয়াদি। হেপাটাইটিস এ, ই ভাইরাস স্বল্পমেয়াদি। এটিতে আক্রান্ত হলে দেড় থেকে দুই মাসে ভালো হয়ে যায়। হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীরা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকে। এর মাধ্যমে লিভার সিরোসিস এবং শেষ পর্যন্ত লিভার ক্যান্সারও হয়ে থাকে। এ ছাড়া গত দুই দশক ধরে সারা বিশ্বে আরেকটা রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যাচ্ছে, সেটি হচ্ছে ফ্যাটি লিভার। এই রোগীদের দীর্ঘমেয়াদে লিভার সিরোসিস এবং লিভার ক্যান্সার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন অ্যালকোহল বা মধ্যপানের কারণে লিভার সিরোসিস হচ্ছে। আবার কিছু রোগী বিভিন্ন রোগের জন্য ওষুধ সেবন করে। সেই রোগের জন্য লিভার হেপাটাইটিস এবং লিভার সিরোসিস হতে পারে।

দেশে চিকিৎসায় সাফল্য 

চিকিৎসায় সাফল্য ও সম্ভাবনা সম্পর্কে সহকারী অধ্যাপক দুলাল চন্দ্র দাস বলেন, লিভার রোগীর চিকিৎসায় দক্ষ চিকিৎসক রয়েছে। দেশে প্রায় ১০০ জনের মতো লিভার বিশেষজ্ঞ আছেন। লিভারের চিকিৎসা আগের থেকে অনেক উন্নত। বর্তমানে লিভার চিকিৎসা ভালো হওয়ায় অ্যাকিউট হেপাটাইসিস থেকে অনেক রোগী সুস্থ হচ্ছে। একইসঙ্গে হেপাটাইসিস ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাস থেকেও কিছু রোগী সুস্থ হচ্ছে। 

লিভার রোগের চিকিৎসায় আরও উন্নত চিকিৎসা আসছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, বর্তমানে দেশে অনেক উন্নত চিকিৎসা চলে আসছে। দেশে ক্রনিক হেপাটাইসিসের ক্ষেত্রে অত্যাধুনিক ওষুধ পর্যাপ্ত পরিমাণে রয়েছে। লিভার ক্যান্সারের আক্রান্ত রোগীদের অত্যাধুনিক চিকিৎসা শুরু হয়েছে। যেমন: আর ট্রান্স-আরটারিয়াল কেমো-এম্বোলাইজেশন (টেইস) সরাসরি লিভারে গিয়ে ক্যানসার নিরাময়ে কাজ করে। রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি এবলেশন (আরএফএতে) লিভার টিউমারকে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিনের মাধ্যমে যেখানে টিউমার রয়েছে অর্থাৎ ৫ সেন্টি মিটারের মধ্যে যদি টিউমারটা হয়, সেটাকে পুড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। এটা অত্যন্ত কার্যকর চিকিৎসা পদ্ধতি। এখন দেশে লিভার ডায়ালাইসিস হচ্ছে। জন্ডিস অনেক বেড়ে যাওয়া রোগীদের বেলায় এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। 

এ ছাড়া আরও কিছু চিকিৎসা রয়েছে-অ্যাকিউট অন ক্রনিক লিভার ফেইলিউর অর্থাৎ হঠাৎ করে কারও যদি লিভার ফেইলিওর হয়ে যায়। ধরেন, আগে থেকেই হয়তো হেপাটাইসিস ‘বি’ এবং ‘সি’ ভাইরাস ছিল, কিন্তু স্বাভাবিকই ছিল। হঠাৎ একদিন তার লিভার ফেইলিউর হয়ে যাচ্ছে, সেটাকে বলা হয় অ্যাকিউট অন ক্রনিক লিভার ফেইলিওর। এই ধরনের রোগীকে চিকিৎসা করেও সুস্থ রাখা সম্ভব হচ্ছে। 

এ রোগের চিকিৎসায় আরও সম্ভাবনার আশা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে লিভার রোগ চিকিৎসায় আরও নতুন নতুন চিকিৎসা আসবে এবং সম্ভাবনা সৃষ্টি হচ্ছে। শুধু ঢাকা নয়, ঢাকার বাইরের হাসপাতালগুলোতে এই রোগের চিকিৎসা শুরু হচ্ছে।

লিভার সিরোসিস রোগীদের ৫০ হাজার টাকা অনুদান 

সাফল্য ও সম্ভাবনা নিয়ে অধ্যাপক ডা. হাফেজা আফতাব বলেন, দেশে লিভার রোগীদের সফলভাবে চিকিৎসা দিয়ে আসছি। তাদের প্রতিবন্ধকতা যে জায়গায়, সেটি হচ্ছে নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ ও নিয়মিত ফলোআপ। এ ছাড়া চিকিৎসা ব্যয় মেটানোর জন্য কিছু কিছু ক্ষেত্রে সরকারিভাবে সাহায্য করা সম্ভব হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি লিভার সিরোসিস রোগীদের এককালীন সরকার ৫০ হাজার টাকা অনুদান দিচ্ছে সরকার। রোগীদের জন্য সরকারের এ ভূমিকা ব্যাপক প্রশংসনীয়। এটিও একটি সাফল্য। তিনি বলেন, লিভার রোগীর চিকিৎসার জন্য এবং রোগ নির্ণয়ের জন্য বাংলাদেশের বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন হবে না। আর লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট পুরোপুরি শুরু হয়ে গেলে কোনো রোগীকেই বাইরে যেতে হবে না। সুতরাং দেশে লিভার রোগের বিভিন্ন চিকিৎসা ও রোগ নির্ণয়সহ সমস্ত কার্যক্রম গতিশীলতার সম্ভাবনা রয়েছে। ঢামেক গ্যাস্ট্রোএন্ট্রোলজি বিভাগ শুরু থেকে লিভার রোগীদের জন্য বিভিন্ন স্পেশাল কার্যক্রম গ্রহণ করে রেখেছে। তার মধ্যে একটি হলো, যথাযথ পরীক্ষার মাধ্যমে রোগ নির্ণয়। সব রোগীর সব রকম পরীক্ষা লাগবে না। এখানে অল্প খরচে একটি রোগীকে সম্পূর্ণ ডায়াগনস্টিক দেওয়া বা রোগটি নির্ণয় করে এটি কোন পর্যায়ে রয়েছে সে সম্বন্ধে রোগীকে অবহিত করা হয়। 

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে লিভার রোগীর চিকিৎসায় ফাইব্রোস্ক্যান নামে একটি অত্যাধুনিক যন্ত্র দিয়েছে সরকার। এর মাধ্যমে রোগ নির্ণয় থেকে শুরু করে লিভারের কতটুকু ক্ষতি হয়েছে,তা পরিমাপ করে চিকিৎসা নির্ধারণ করা সম্ভব। সাম্প্রতিক সময়ে ফ্যাটি লিভার রোগ শনাক্তকরণে এই যন্ত্রের অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রয়েছে। সুতরাং এই আধুনিক টেকনোলজি রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা প্রদানে সহযোগিতা করছে।

সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা

চিকিৎসায় লিভার রোগীদের সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে ডা. দুলাল চন্দ্র দাস বলেন, হেপাটাইটিস ‘এ’ ও ‘ই’ ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীরা সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যায়। আর হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা দেওয়া হয়। ফলে তারাও সুস্থ থাকে। লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সার—এই দুইটি ভাইরাসের মাধ্যমে হয়, যা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। এই ধরনের রোগীদের নিয়মিত ফলোআপ রাখলে ভালো রাখা যায়। এটি প্রথমত ক্রনিক হেপাটাইটিস হয়, যা পরবর্তীতে লিভার সিরোসিসে রূপ নেয়। এক পর্যায়ে এটি লিভার ক্যান্সারে রূপ হয়। এসব রোগের জন্য কিছু ওষুধ রয়েছে, এর মধ্যে কিছু মুখে খাওয়ার অথবা কিছু ইনজেকশন। এর মাধ্যমে অনেক রোগীকে ভালো রাখা সম্ভব, যার মাধ্যমে পরবর্তীতে রোগীর ভালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কোনও রোগী হেপাটাইসিস ‘বি’ ভাইরাসে আক্রান্ত হলেও অত্যাধুনিক কিছু চিকিৎসার মাধ্যমে দীর্ঘ সময় চিকিৎসা প্রদান করা হয়। আর ‘সি’ ভাইরাস হলে ১২ অথবা ২৪ সপ্তাহ চিকিৎসার মাধ্যমে ৯৫% উপরে রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যায়। তবে কোনও রোগীর যতদিন পর্যন্ত ‘বি’ ভাইরাস সক্রিয় থাকবে, ততোদিন ওষুধ প্রদান করা হয়। এক্ষেত্রে ইনজেকশন ছয় মাস অথবা এক বছর পরপর প্রদান করা হয়। কিন্তু ওষুধ নিয়মিত চালিয়ে যেতে হয়। হেপাটাইসিস ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাসের মাধ্যমে ক্রনিক রোগ হয়। প্রথমে ‘বি’ ভাইরাসে আক্রান্ত হলে ৯৫% ভালো হয়ে যায়। বাকি ৫% ক্রনিক ভাইরাসে আক্রান্ত হয়।
 
এ সম্পর্কে ঢামেক গ্যাস্ট্রোএন্ট্রোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. হাফেজা আফতাব বলেন, কোনো জটিলতা না থাকলে হেপাটাইটিস ‘এ’ ও ‘ই’ ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীরা ৬-৮ সপ্তাহে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যায়। আর হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাস জটিল অবস্থায় চলে গেলে, সম্পূর্ণ সুস্থতা সম্ভব হয় না। তখন এটা দীর্ঘমেয়াদি রোগ হয়ে যায় এবং এটা কখনো বাড়ে, অবার কখনো কমে। রোগীকে এই অবস্থার মধ্য দিয়েই যেতে হয়। এক পর্যায়ে রোগী লিভার সিরোসিস বা লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে যায়। ফলে তাদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। এসব রোগীদের কখনো সম্পূর্ণ সুস্থতা সম্ভব না। কেলব ওষুধের মাধ্যমে এই রোগকে নিয়ন্ত্রণ রাখতে হবে।

খাদ্য তালিকা

লিভার রোগ থেকে সুরক্ষায় খাবারের ব্যাপারে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়ে অধ্যাপক হাফেজা আফতাব বলেন, যে কোনো শরবত পরিশোধিত পানি দ্বারা তৈরি করা না হলে হেপাটাইটিস ‘এ’ ও ‘ই’ ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। রাস্তার যে কোনো খাবার খাওয়ার ফলে হেপাটাইটিসসহ বিভিন্ন পেটের অসুখ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এজন্য বাসায় পরিষ্কার পানি বা শরবত খেতে হবে। লিভার রোগীরা পরিমাপ মতো সমস্ত স্বাভাবিক খাবার গ্রহণ করতে পারবেন। 

খাবার সম্পর্কে বিএসএমএমইউ সহকারী অধ্যাপক ডা. দুলাল চন্দ্র দাস বলেন, সাধারণত হেপাটাইসিস ‘ই’ ভাইরাস দ্বারা অ্যাকিউট ভাইরাস হয়, এটাকে সাধারণত পানিবাহিত রোগ বলা হয়। জীবাণুযুক্ত পানি ও বাইরের খাবার খাওয়ার ফলে এটি হয়। তাই রাস্তার বা ফুটপাতের পানীয় জাতীয় খাবার বা বিভিন্ন ধরনের শরবত খাওয়া যাবে না। পানি ফুটিয়ে জীবাণুমুক্ত করে পান করতে হবে। বাইরের খাবার পরিহার করতে হবে, পরিমিত খাবার খেতে হবে। স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খেতে হবে। তৈলাক্ত খাবার যেমন-গরু, খাসির গোশত, ফাস্ট ফুড খাবার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। শাক-সবজি বেশি পরিমাণে খেতে হবে। 

হেপাটাইসিস থেকে সুরক্ষায় সচেতনতা

এ রোগ থেকে সুরক্ষায় সচেতনার বিষয়ে সচেতনতা বিষয়ে বিএসএমএমইউর সহকারী অধ্যাপক দুলাল চন্দ্র দাস বলেন, হেপাটাইসিস ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাস রক্তের মাধ্যমে ছড়ায়। মাদকসেবীরা ইনজেকশনের মাধ্যমে ড্রাগ নেওয়ার ফলে তাদের কিংবা তাদের মাধ্যমে অন্যদের এ ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি। এসব কাজ থেকে তাদের বিরত রাখতে হবে। জীবাণুমুক্ত না করে দাঁতের চিকিৎসা ও অপারেশনের যন্ত্রপাতি এবং ইনজেকশনের সিরিঞ্জ ব্যবহারের ফলে হেপাটাইটিস ‘বি’ তে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়। তাই কাউকে রক্ত দিলে রক্ত স্ক্রেনিং করে দিতে হবে, যেন এর মাধ্যমে অন্য রোগীর দেহে ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাস প্রবেশ না করে। মাদার টু চাইল্ড অর্থাৎ মায়ের এই ভাইরাস থাকলে বাচ্চার ক্ষেত্রেও হতে পারে। এজন্য গর্ভবতী মহিলাদের ‘বি’ ভাইরাস রয়েছে কিনা, সেজন্য কিছু টেস্ট করাতে হবে। 

সচেতনতা সম্পর্কে ঢামেক গ্যাস্ট্রোএন্ট্রোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. হাফেজা আফতাব বলেন, প্রথমত জনগণকে সচেতন হতে হবে। বাইরে শরবত বা খাবার পরিবেশন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন কিনা সে বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে। এজন্য বিক্রেতাকে সচেতন হতে হবে। খাদ্য পরিবেশনের ক্ষেত্রে তাকেও দায়িত্ব নিতে হবে। ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয় পক্ষকে সচেতন হতে হবে। তাহলে ভাইরাসের সংক্রমণের হার কমানো সম্ভব। এ লক্ষ্যে সরকারি পর্যায়ে তদারকি বৃদ্ধি করতে হবে।

চিকিৎসা খরচ

লিভার রোগের চিকিৎসার খরচ বিষয়ে সহকারী অধ্যাপক দুলাল চন্দ্র দাস বলেন, লিভার রোগের চিকিৎসার খরচ নির্ভর করে, আসলে কোন রোগটি হয়েছে। হেপাটাইটিস ‘এ’ ও ‘ই’ ভাইসাসে আক্রান্ত হলে বিশ্রামে থাকতে হবে। এরপর কিছু ওষুধের প্রয়োজন রয়েছে। যদি অ্যাকিউট হেপাটাইটিস ও ক্রনিক হেপাটাইটিস হয়, সেক্ষেত্রে ওষুধ ব্যবহার করা হয়। হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাস হলে কিছু ওষুধ ব্যবহার করতে হয়। এ ছাড়া ছয় মাস বা এক বছর মেয়াদি ইনজেকশন প্রদান করা হয়। হেপাটাইসিস ‘সি’ ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা আগে খুবই ব্যয়বহুল ছিল, সে সময় প্রায় ১০-২০ লাখ টাকা খরচ হতো। বর্তমান ‘সি’ ভাইরাসের ক্ষেত্রে ৮০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকায় চিকিৎসা হয়ে যাচ্ছে। দেশে সকল লিভার সিরোসিস রোগীর খরচ অত্যন্ত ব্যয়বহুল। গবেষণার তথ্যমতে, প্রতি বছর লিভার রোগীর চিকিৎসায় ২০-২৫ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়।

পরিসংখ্যান

দেশে লিভার রোগী সংখ্যা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলেন, দেশের হেপাটাইসিস ‘বি’ ভাইরাসের ক্ষেত্রে আক্রান্ত রোগী ৫.৪ %, ক্রনিক হেপাটাইসিস ‘সি’ ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১% এর মতো। হেপাটাইসিস ‘এ’ ও ‘ই’ ভাইরাসের পরিসংখ্যান নেই। তবে এটা বিভিন্ন জেলায় বা অঞ্চলে একেক ক্ষেত্রে একেক রকম হয়। প্রায় এই জন্ডিস দেখি, এটার পরিমাণ অনেক বেশি। কারণ এই জন্ডিসটা সাধারণ মানুষের প্রায়ই হয়ে থাকে। এটিই পানিবাহিত রোগ, যেটা হেপাটাইসিস ‘এ’ ও ‘ই’ ভাইরাসের মাধ্যমে হয়। এতে আক্রান্ত হওয়ার হার অনেক বেশি। গত ১০ বছরে হেপাটাইসিস ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাসে আক্রান্তের হার ৩-৪ % বেড়ে গেছে। যদি এখন সচেতন না হওয়া যায়, তাহলে এটা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

লিভার ভালো রাখার উপায়

বিএসএমএমইউ হেপাটোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক দুলাল চন্দ্র দাস বলেন, দেশে ফ্যাটি লিভারসহ অন্যান্য লিভার রোগ অনেক বেড়ে যাচ্ছে। বর্তমান পরিসংখ্যান অনুসারে ৩৩% মানুষের এই ফ্যাটি লিভার রয়েছে। এ ছাড়া কিছু জেনেটিক রোগ রয়েছে, যেগুলো নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনা সম্ভব নয়। পরিবারের কারও যদি এই রোগ থাকে, তাহলে আগে থেকে স্ক্রিনিং করা হয়। তাদেরকে পরীক্ষার আওতায় আনতে হবে। অর্থাৎ উইলসন রোগ রয়েছে, কিনা সেটা পরীক্ষা করতে হবে। এই সকল পরীক্ষা করার পর চিকিৎসার মাধ্যমে লিভারকে ভালো রাখা সম্ভব। পাশাপাশি দৈনন্দিন খাবার তালিকা, সচেতনতা ও কাজের মাধ্যমে লিভারকে ভালো রাখা সম্ভব। যথা-  

১. নিয়মিত ৩০-৪০ মিনিট হাঁটা, 
২. ব্যায়াম করা, 
৩. পরিমিত খাবার গ্রহণ,  
৪. অতিরিক্ত ভাত বা শর্করা জাতীয় খাবার পরিহার, 
৫. তৈলাক্ত খাবার, যেমন-গরু, খাসির গোশত ও ফাস্ট ফুড এড়িয়ে চলা,
৬. বাইরের খাবার পরিহার,
৭. বাইরের পানি, শরবত পরিহার করতে হবে। এর মাধ্যমে ‘এ’ অথবা ‘ই’ ভাইরাস থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব।
৮. নিরাপদ রক্ত গ্রহণ/প্রদান করতে হবে। রক্ত দেওয়া-নেওয়ার সময় পরীক্ষা করে হেপাটাইসিস ‘বি’ এবং ‘সি’ ভাইরাসের বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে নেওয়া। পরিষ্কার করা ছাড়া একজনের সুই আরেকজন ব্যবহার করতে পারবে না।

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  ঘটনা প্রবাহ : হেপাটাইটিস
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি
জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি