অধ্যাপক ডা. আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরী
বিভাগীয় প্রধান, কার্ডিওলজি বিভাগ,
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
০৯ মার্চ, ২০২২ ১০:০৩ পিএম
হার্টের রোগ: লক্ষণ ও দেরিতে চিকিৎসা নেওয়ার পরিণতি
শরীরের কিছু কিছু অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর পুনরায় ঠিক হয়ে যায়। যেমন: স্কিন কেটে বা ছিঁড়ে গেলে পরবর্তীতে পুনরায় সুস্থ হয়ে যায়। নখ, চুল কেটে ফেলার পর পুনরায় বড় হয়ে যায়। লিভারের পাঁচভাগের চারভাগ যদি কেটে ফেলে হয়, লিভার আবার বৃদ্ধি পায়। কিন্তু হার্টের মাসল ও ব্রেনের টিস্যু একবার নষ্ট হলে আর পুনরুদ্ধার হয় না। তাই এ রোগের চিকিৎসায় অবহেলা করলে পরিণামে ভুগতে হবে মৃত্যু পর্যন্ত।
হার্টের রোগের লক্ষণ
১. বুকে ব্যথা করা।
২. শ্বাস কষ্ট হওয়া।
৩. বুক ধড়ফড় করা।
৪. হাতে-পায়ে পানি আসা।
৫. হয়রান হয়ে যাওয়া, আর কাজ করতে না পারা।
৬. ইনফেকশন হলে জ্বর হতে পারে।
বুকে ব্যথা
বুকের ব্যথা কয়েকরকমের হতে পারে। সবচেয়ে খারাপ ব্যথা হলো ইস্কেমিক হার্ট ডিজিজ (যেখানে শরীরের একটি অংশে রক্ত প্রবাহ কমে যায়)। মানুষের হার্টে রক্ত সরবরাহ কমে যাওয়া, হার্ট খাবার না পাওয়া, অক্সিজেন না পেলে মানুষ খুব কাতরে উঠে। এটিকে অ্যাঞ্জাইনা (হৃৎপিণ্ডের পেশীতে রক্তপ্রবাহের অভাবের কারণে বুকে চাপবোধ বা ব্যথাবোধ করার ঘটনাকে বোঝায়) বলা হয়।
হার্টের অ্যাঞ্জাইনার বর্ণনা-এ ব্যথা অন্য ব্যথার মতো নয়। যেমন: কেটে গেলে, ব্যথা পেলে,আঘাত পেলে, দুর্ঘটনার কারণে যে ব্যথা হয় এটি একরকম। অন্যদিকে হার্টে সমস্যার কারণে যে ব্যথা হয় সেটি অন্যরকম। যেমন: একটু অস্বস্তি লাগা, সাধারণত বুকের মাঝখানে ব্যথা হয়, বুকটা চেপে আসে। একটু পরিশ্রম করলে, ইমোশনাল হলে, রেগে গেলে, কারো ওপর অভিমান করে কষ্ট পেলে এ ধরনের ব্যথা হয়। পরিশ্রম করতে গেলে একটি নির্দিষ্ট মাত্রা পর্যন্ত বুকে ব্যথা হয় না কিন্তু মাত্রার একটু উপরে গেলে ব্যথা শুরু হয়। আবার যখন বিশ্রাম নেওয়া হয় তখন কমে যায়। অন্য ব্যথা বিশ্রাম নিলে কমে না কিন্তু হার্টের ব্যথা বিশ্রাম নিলে কমে যায়।
অ্যাঞ্জাইনা অনেকক্ষণ ধরে থাকে না। সাধারণত দুই-তিন মিনিট থাকে। যদি ব্যথা চলমান থাকে এবং সাংঘাতিক ব্যথা হয়, তার সঙ্গে আরো কিছু দেখা দেয়, যেমন: শ্বাসকষ্ট, বমির ভাব তখন বুঝতে হবে এ ব্যথা মরণ ব্যথার কাছাকাছি। এসময় রোগীর শুধু অ্যাঞ্জাইনা না, হার্ট অ্যাটাক হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। তখন বুকের মাঝখানে ব্যথা হয় এবং সেই ব্যথা শরীরের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে। যেমন: বাম হাতের দিকে যেতে পারে, গলায় যেতে পারে, চোয়ালে যেতে পারে, পেছন পিঠের দিকে যেতে পারে, পেটের দিকে যেতে পারে, ডানদিকে যেতে পারে। হার্ট বসে আছে মাঝখানে অথচ তার ব্যথ ছড়িয়ে পড়ছে শরীরের বিভিন্ন জায়গায়।
শ্বাসকষ্ট
এটি নির্ভর করে হার্টের পাম্পিং ক্ষমতার ওপর। রোগী প্রাথমিক অবস্থায় আগে পরিশ্রম করলে যে পরিমাণ হয়রান হতো এখন আরো কম পরিশ্রম করলে বেশি হয়রান হয়ে যায়। তিনি যাদের সঙ্গে নিয়মিতি হাঁটেন তাদের থেকে এখন পিছিয়ে যাচ্ছেন। তাদের নাগাল ধরতে পারছেন না। তাদের নাগাল ধরতে গেলে শ্বাস বেড়ে যাচ্ছে। যখন স্থায়ীভাবে মারাত্মক হার্টের রোগ হয় তখন খুব অল্প পরিশ্রমে শ্বাস কষ্ট হয়। বিশ্রামের সময়ও শ্বাসকষ্ট হয়। আরো খারাপ অবস্থায় রোগী শুতেই পারে না। কারণ তার ফুসফুসে ভর্তি পানি থাকে।
বুক ধড়ফড়
এটি হঠাৎ হঠাৎ হতে পারে, মাঝে মাঝে ধুক ধুক করতে করতে থাকে আবার থেমে যায়। অথবা ধুক ধুক অনেকক্ষণ ধরে থাকতে পারে। কোনো কাজ করার কারণে ধুক ধুক হতে পারে। অথবা বিশ্রামের সময়ও হতে পারে। এ বুক ধড়ফড় নিয়মিতও হতে পারে।
পানি আসা
হার্টের পাম্পিং ক্ষমতা অনেক কমে গেলে শরীরে পানি আসে। বিশেষ করে পায়ের মধ্যে পানি আসে। এটি হার্টের সমস্যার একটি বড় লক্ষণ।
যখন হাসপাতালে যাওয়া জরুরি
হার্টে ব্যথা হয় কয়েক মিনিটের জন্য। যেমন: তিন-চার মিনিট। বিশ্রাম নিলে কমে যায়। আগে থেকেই রোগীর বুকে ব্যথা হয়, স্প্রে নিলে কমে যায়। কিন্তু যখন দেখা যাবে যে বুকে ব্যথা শুরু হয়ে চলছেই, ৫, ১০, ১৫ মিনিটি স্প্রে নেওয়ার পরও কমছে না। ব্যথার সাথে শ্বাস কষ্ট হচ্ছে, ব্যথার সাথে বমির ভাব হচ্ছে, মাথা ঘুরিয়ে পড়ে যাওয়া, ওষুধে ব্যথা কমছে না এবং এমন কোনো লক্ষণ দেখা দিয়েছে যেটি আগে ছিল না। এসব বিপজ্জনক লক্ষণ। এ অবস্থায় জরুরি হাসপাতালে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। ইসিজি করতে হবে। যথাযথ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে ভালো থাকা এবং ভালো হয়ে উঠার সম্ভাবনা অনেক অনেক বেশি।
অল্প কিছু বুকে ব্যথা ছাড়া অধিকাংশ বুকে ব্যথায় মারা যাওয়ার আশঙ্কা খুব কম। যেসব বুকে ব্যথার কারণে মানুষ মারা যায়, তার মধ্যে হার্টঅ্যাটাকের ব্যথা অন্যতম। মহাধমনী বাম নিলয়ের শীর্ষে শুরু হয়, যেটি হল হৃদপিন্ডের পেশী পাম্প করার কক্ষ। হৃদপিন্ড বাম নিলয় থেকে মহাধমনীর কপাটিকার মাধ্যমে মহাধমনীতে রক্ত পাম্প করে। খুব বেশি প্রেসার থাকলে, সেটি কিন্তু ছিঁড়ে যেতে পারে। এর কারণে মানুষ মারা যেতে পারে। প্রায় ৭০ শতাংশ রোগী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মারা যাবে যদি রোগ নির্ণয় করে প্রেসার না কমানো যায়। ফুসফুস এবং বুকের ওয়ালের মাঝখানে যদি বাতাস চলে আসে, তাহলে ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখন বুকের মধ্যে বাতাস ভর্তি কিন্তু ফুসফুসে বাতাস থাকে না। এটি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।
দেরিতে হাসপাতালে যাওয়ার পরিণতি
রোগী যদি একা হয়, তাহলে অনেক দ্রুত হাসপাতালে চলে আসে। যারা অবিবাহিত তারা তাড়াতাড়ি চলে আসে। যারা বিবাহিত তারা দেরিতে হাসপাতালে আসে। যদি বাসায় আরো লোকজন থাকে, বিশেষ করে তার যদি চিকিৎসক বন্ধু থাকে তাহলে হাসপাতালে আসতে অনেক দেরি হয়। অন্যদিকে মহিলারা কাউকে বিরক্ত করে না, তারা কষ্ট সহ্য করতে থাকে এবং দেরি করে আসে। এসব বোকামির কারণে অনেক ক্ষতি হয়। যেমন: শরীরের কিছু কিছু অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর পুনরায় ঠিক হয়ে যায়। যেমন: স্কিন কেটে বা ছিঁড়ে গেছে এটি পরে আবার সুস্থ হয়ে যায়। নখ, চুল কেটে ফেলার পর পুনরায় বড় হয়ে যায়। লিভারের পাঁচভাগের চারভাগ যদি কেটে ফেলে হয়, লিভার আবার বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু হার্টের মাসল ও ব্রেনের টিস্যু একবার নষ্ট হলে আর পুনরুদ্ধার হয় না। মায়ের গর্ভে ২০ দিন থেকে একটি শিশুর হার্ট বিট শুরু হয়। মৃত্যু পর্যন্ত এ হার্ট কাজ করে যেতে থাকে অর্থাৎ পাম্প করতে থাকে। পাম্পিংয়ের মাধ্যমে সারা শরীরে রক্ত সঞ্চালন হয়। হার্ট মাসলগুলো দিয়ে পাম্প করছে। হার্টের মাসল যদি নষ্ট হয় তার পাম্পিং ক্ষমতা কমে যায়। চিকিৎসা না করার কারণে হার্ট ফেইলিউর হয়। হার্টের মাসেলের একটি অংশ মরে গেলে আশেপাশে বড় একটি এলাকায় তখন আধা মরা টিস্যু দেখা যায়। যদি সময়মত চিকিৎসা করা হয়, বাকি বড় অংশ যে আধা মরা টিস্যু থাকে সেগুলো ধীরে ধীরে সক্রিয় হবে। হার্টঅ্যাটাকের সঙ্গে সঙ্গে এনজিওগ্রাম করে ব্লক ছুটিয়ে দিতে পারলে হার্টের মাসল ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। যদি একটিু দেরি হয়ে যায় তাহলে কিছু মাসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তার মানে হার্ট ফেইলিউরের আশঙ্কা কমে যায়। খরচ বাঁচাতে গিয়ে অনেকে রোগী হয়। এতে যতদিন বাঁচবে, হাটে ফেইলিউর নিয়ে বাঁচতে হয়। ক্রমাগত অবস্থা খারাপের দিকে যাবে। হার্ট ফেইলিউর ক্যান্সারের চেয়েও খারাপ। হার্টফেইলিউরে মৃত্যুর হার ক্যান্সার রোগীর চেয়ে বেশি। যেমন: ব্রেস্ট ক্যান্সারে খুব ভালো চিকিৎসা হলে দশ শতাংশের মৃত্যু হয়। হার্ট ফেইলিউর হলে পাঁচ বছর পর ৪০-৫০ শতাংশ রোগী মারা যায়।
এএইচ/এমইউ
-
০৯ মার্চ, ২০২২