১৭টি হাসপাতালের সামনে শব্দ দূষণের সর্বোচ্চ মাত্রা ৮৯.৯ ডেসিবল: ক্যাপস
মেডিভয়েস রিপোর্ট: ১৭টি হাসপাতালের সামনের রাস্তায় শব্দ দূষণের মাত্রা সর্বনিম্ন ৬৯.৭ ডেসিবল এবং সর্বোচ্চ ৮৯.৯ ডেসিবল পর্যন্ত পাওয়া যায়। যেখানে নীরব এলাকার জন্য আদর্শ মান দিনের বেলায় ৫০ ডেসিবল। বায়ুমন্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস) এর গবেষণার প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এ তথ্য তুলে ধরেছেন প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার।
বৃহস্পতিবার (৩ মার্চ) সকাল ১১টায় জুম অনলাইন প্লাটফর্মে “প্রাণ প্রকৃতির উপর শব্দ দূষণের প্রভাব ও প্রতিকার” বিষয়ক ওয়েবিনার অনুষ্ঠানে এসব বিষয় তুলে ধরেন তিনি।
“আন্তর্জাতিক শ্রবণ দিবস” উপলক্ষে, বায়ুমন্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস) এবং ইকিউএমএস কনসালটিং লি. এর যৌথ উদ্যোগে এ ওয়েবিনার অনুষ্ঠিত হয়।
উক্ত সম্মেলনে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন বায়ুমন্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস) এর প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার।
অন্যান্যদের মাঝে বক্তব্য রাখেন, বাংলাদেশ প্রাণীবিজ্ঞান সমিতির প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ড. গুলশান আরা লতিফা, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক শরীফ জামিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. জাকারিয়া, শ্রবণ ব্যাধি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. নাসিমা খাতুন, প্রজনন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মোসা. রাশিদা বেগম, ইকিউএমএস কনসালটিং লি. নির্বাহী পরিচালক কাজী ফরহাদ ইকবাল, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক আলমগীর কবির, ইউএসএইড ও এফসিডও এর বায়ু ও শব্দ দূষণ প্রকল্পের প্রোগ্রাম এসোসিয়েট ইঞ্জিনিয়ার মো. নাছির আহম্মেদ পাটোয়ারী।
বায়ুমন্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস) এর প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার তার বক্তব্যে বলেন, বায়ুমন্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস) এর ১০ সদস্যের একটি গবেষক দল ২০২২ সালের মার্চ মাসে ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় ভূমি ব্যবহারের ভিত্তিতে শব্দের মাত্রা পরিমাপ করে। গবেষণার অংশ হিসেবে ধানমন্ডি আবাসিক এলাকায় অবস্থিত ১৭টি হাসপাতালের সম্মুখে শব্দের মাত্রা পরিমাপ করে। প্রতিটি হাসপাতালের সামনে শুধুমাত্র কর্মদিবসে মোট এক ঘন্টার শব্দের উপাত্ত তাইওয়ানে তৈরি Lutron ব্রান্ডের স্বয়ংক্রিয় সাউন্ড লেভেল মেশিনের সাহায্যে রেকর্ড করা হয়।
প্রাপ্ত তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে, ১৭টি হাসপাতালের সামনের রাস্তায় শব্দ দূষণের মাত্রা সর্বনিম্ন ৬৯.৭ ডেসিবল এবং সর্বোচ্চ ৮৯.৯ ডেসিবল পর্যন্ত পাওয়া যায়। যেখানে নীরব এলাকার জন্য আদর্শ মান দিনের বেলায় ৫০ ডেসিবল।
আমেরিকান স্পিস এন্ড হেয়ারিং এসোসিয়েশন (আশা) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এর তথ্য অনুযায়ী, ৭১ থেকে ৯০ ডেসিবল মাত্রায় শব্দ তীব্রতর শব্দদূষণ হিসেবে পরিগণিত হয়। মাঠ পর্যায়ের গবেষণা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ধানমন্ডি এলাকায় অবস্থিত হাসপাতালগুলোর বেশির ভাগের অবস্থান ব্যস্ততম ট্রাফিক সংযোগ এর পাশে অবস্থিত।
শব্দ দূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা ২০০৬ অনুযায়ী, আবাসিক এলাকার জন্য দিনের বেলায় নির্ধারিত আদর্শ মান মাত্রার (৫৫ ডেসিবল) সাথে ধানমন্ডি আবাসিক এলাকায় অবস্থিত হসপাতালগুলোর সামনে শব্দের মাত্রার তুলনামূলক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, ১৭টি স্থানেই আদর্শ মান (৫৫ ডেসিবল) অতিক্রান্ত হয়েছে, যেখানে আদর্শমান অতিক্রান্তের পরিমাণ বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজের সামনে ২৬.৭% (৬৯.৭ ডেসিবল) যা ১৭টি স্থানের মধ্যে সর্বনিম্ন এবং সেন্ট্রাল হাসপাতালের সামনে ৬৩% (৮৯.৯ ডেসিবল) যা ১৭টি স্থানের মধ্যে সর্বোচ্চ।
অন্যদিকে হাসপাতালগুলোকে শব্দ দূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা ২০০৬ অনুযায়ী, নীরব এলাকা হিসাবে বিবেচনা করে দিনের বেলার নীরব এলাকার মান (৫০ ডেসিবল) মাত্রার সাথে তুলনামূলক বিশ্লেষণ দেখা যায় যে, বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজের সামনে ন্যূনতম ৩৯.৪% এবং সেন্ট্রাল হাসপাতালের সামনে সবোর্চ্চ ৭৯.৮% শব্দ দূষণ বেশি পাওয়া গেছে। ১৭টি স্থানের মধ্যে শব্দের মাত্রা গড়ে ৮১.৭ ডেসিবল পাওয়া গেছে, যার মধ্যে ৯টি স্থানেই ৮০ ডেসিবলের উপরে শব্দের মাত্রা রয়েছে। যা US EPA অত্যাধিক বিপদজনক মাত্রার শব্দ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এ ছাড়াও তিনি শব্দ দূষণ রোধে করণীয় সম্পর্কে সুপারিশ প্রদান করেন।
বাংলাদেশ প্রাণীবিজ্ঞান সমিতির প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ড. গুলশান আরা লতিফা তার বক্ত্যবে বলেন, শব্দ দূষণের ফলে জলজ প্রাণীর ক্ষতি হয়, একেক ধরনের প্রাণীর শ্রাব্যতা সীমা একেক রকম ফলে মাত্রাতিরিক্ত শব্দের ফলে তার দিশেহারা হয়ে যায়। সকলকে এক ছাদের নিচে এসে সম্বলিতভাবে এই শব্দ দূষণ রোধে কাজ করতে হবে এর মাধ্যমে মানুষ ও প্রাণীর নিরাপদ শ্রবণ নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক শরীফ জামিল তার বক্ত্যবে বলেন, সকল স্তরের মানুষকে সংযুক্ত করে শব্দ দূষণ রোধে কাজ করতে হবে। হাইড্রলিক হর্ন বাজানো নিষেধের পূর্বে এর বিকল্প ব্যবস্থা করতে হবে। শব্দ দূষণ গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত ডাটাবেজ সংরক্ষণ করতে হবে এবং তা জনগণের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে এ ব্যাপারে সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন তার বক্ত্যবে বলেন, প্রাণ প্রকৃতির উপর শব্দ দূষণের প্রভাব রয়েছে, যেসব এলাকায় শব্দ দূষণ বেশি হয় ওই এলাকা থেকে প্রাণীরা অন্য এলাকায় স্থানন্তরিত হয়, ফলে উদ্ভিদের পরাগায়ণ ও প্রজননের ব্যহত হয়।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. জাকারিয়া তার বক্ত্যবে বলেন, শব্দ দূষণ নিয়ে নিয়মিত গবেষণা করা প্রয়োজন। এ ছাড়া সরাসরি শব্দ দূষণ মনিটরিং ব্যবস্থা গ্রহণ করলে নির্দিষ্ট এলাকায় শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে।
শ্রবণ ব্যাধি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. নাসিমা খাতুন তার বক্ত্যবে বলেন, মানুষের স্বাস্থ্যের উপর শব্দ দূষণের বিশেষ প্রভাবটি হলো শ্রবণ শক্তি হ্রাস। স্কুলগামী শিশুদের উপর শব্দ দূষণের প্রভাব বেশি, বর্তমানে অনলাইন প্লাটফর্মগুলোতে ক্লাস করার জন্য তারা ইয়ারফোন ব্যবহার করে পাশাপাশি অতিরিক্ত গান-বাজনা ইত্যাদি শুনার ফলে পড়াশোনায় অমনোযোগীতা দেখা দিচ্ছে এবং তাদের খাবারে অরুচি সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
প্রজনন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মোসা. রাশিদা বেগম তার বক্ত্যবে বলেন, মাত্রাতিরিক্ত শব্দের ফলে গর্ভপাত হতে পারে এমনকি গর্ভের শিশু জন্মের পর বধির হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তিনি আরও বলেন, উচ্চ শব্দের হর্ন আমদানি ও অপ্রয়োজনীয় হর্ন বাজানো রোধে সরকারের আইন প্রয়োগ শব্দ দূষণ রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
ইকিউএমএস কনসালটিং লি. নির্বাহী পরিচালক কাজী ফরহাদ ইকবাল তার বক্ত্যবে বলেন, সরকারি ও বেসকারি প্রকল্পসমূহের নির্মাণকালীন সময়ে শব্দ দূষণ রোধ করার জন্য পৃথক বাজেট ও নির্দেশনা থাকে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে এটি মানা হলেও এখনও অনেক কাজে এর প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে না। এক্ষেত্রে নির্মাণকালীন কাজগুলো চলাকালীন সময়ে পরিবেশ অধিদপ্তরকে নিয়মিত শব্দ দূষণ পর্যবেক্ষণ এর বিষয় এ আগ্রহ দেখাতে হবে এবং দূষণ রোধে কাজ করতে হবে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক আলমগীর কবির বলেন, আমরা ভবিষ্যৎ-এ বধির প্রজন্ম দিকে ধাবিত হচ্ছি, আগামী প্রজন্মকে রক্ষা করতে আমাদের শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে ও সচেতনা বৃদ্ধি করতে হবে, এ ব্যাপারে যুবকরা অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করতে পারে।
ইউএসএইড ও এফসিডও এর বায়ু ও শব্দ দূষণ প্রকল্পের প্রোগ্রাম এসোসিয়েট ইঞ্জিনিয়ার মো. নাছির আহম্মেদ পাটোয়ারী, ইঞ্জিনিয়ার মো. নাছির আহম্মেদ পাটোয়ারী বলেন, অতিরিক্ত শব্দের ফলে যারা সড়কের পাশে কাজ করে থাকেন তাদের শ্রবণ শক্তি কমে যায় এর ফলে রাতে ভালো ঘুম হয় না, মেজাজ খিটখিটে থাকে ও কাজে অমনোযোগী দেখা দেয়।
শব্দ দূষণ রোধে ১০ দফা প্রস্তাবনা:
১। শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০০৬ এর শতভাগ বাস্তবায়ন। বিশেষ করে হাসপাতাল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনের হর্ন না বাজানোর জন্য কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
২। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস এর আওতায় পরিবেশ ক্যাডার ও পরিবেশ পুলিশ নিয়োগ দিতে হবে।
৩। বিধিমালা সংজ্ঞা অনুযায়ী চিহ্নিত জোনসমূহে (নীরব, আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিল্প ও মিশ্র) সাইনপোস্ট উপস্থাপন করা ও তা মান্যতার ব্যাপারে নিয়মিত মনিটরিং করা।
৪। ৯৯৯ -এ কল সার্ভিস এর পাশাপাশি অনলাইনে ই-মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে দণ্ড প্রদান করা যেতে পারে।
৫। পরিবেশ অধিদপ্তরের সঙ্গে বাংলাদেশ পুলিশ, সিটি কর্পোরেশন, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় সরকার এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সহ অন্যান্য প্রশাসনিক দপ্তরের সমন্বয় সাধন করা।
৬। হাইড্রোলিক হর্ন আমদানি বন্ধ নিশ্চিত করা, স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদন না করা, হর্ন বাজানোর শাস্তি বৃদ্ধি, চালকদের শব্দ সচেতনতা যাচাই করে লাইসেন্স প্রদান করা এবং শব্দের মাত্রা অনুযায়ী যানবাহনের ছাড়পত্র দেওয়া।
৭। শব্দের মাত্রা হ্রাসের পদক্ষেপ গ্রহণ ব্যতীত নির্মাণ প্রকল্প ও শিল্প-কারখানা স্থাপনে ছাড়পত্র প্রদান না করা।
৮। উচ্চ শব্দ এলাকায় ইয়ার মাফ সহ ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রীর ব্যবহার করা।
৯। ছাদ, বারান্দা, খোলা জায়গায় গাছ লাগানো (গাছ শব্দ শোষণ করে) এবং সড়কের পাশে গাছ লাগিয়ে সবুজ বেষ্টনী তৈরি করা।
১০। সন্ধ্যার পর ছাদ ও কমিউনিটি হলে গান-বাজনা না করা, ব্লেন্ডার, প্রেশার কুকার ও ভ্যাকুয়াম ক্লিনার ব্যবহার না করা, ড্রিল ও গ্রাইন্ডিং মেশিন এর ব্যবহার সীমিত করা।