অধ্যাপক ডা. ইফতেখার মো. মুনির

অধ্যাপক ডা. ইফতেখার মো. মুনির

বিভাগীয় প্রধান, গ্লুকোমা বিভাগ, 
জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট
মহাসচিব, বাংলাদেশ গ্লুকোমা সোসাইটি। 


১৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২২ ০৪:৫২ পিএম

গ্লকোমা: লক্ষণ, কারণ ও চিকিৎসা

গ্লকোমা: লক্ষণ, কারণ ও চিকিৎসা
গ্লকোমা চোখের একটি রোগ। ছবি: সংগৃহীত

গ্লকোমা সম্পর্কে তেমন কোনো প্রচার-প্রচারণা না হওয়ায় অনেক মানুষ এটা সম্পর্কে তেমন জানেন না। বিশ্বে গ্লকোমাজনিত রোগীর সংখ্যা প্রায় ছয় কোটি সত্তর লাখ। সচেতনতার অভাবে এক বিরাট জনগোষ্ঠী অপরিবর্তনযোগ্য অন্ধত্বের শিকার হন। স্থায়ীভাবে এ রোগের কোনো প্রতিকার নেই, প্রতিরোধই একমাত্র উপায়। প্রথমেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে রোগটি প্রতিরোধ করা সম্ভব। 

গ্লকোমা

গ্লকোমা চোখের একটি রোগ। শরীরের রক্তের যেমন একটা নির্দিষ্ট প্রেশার আছে, যেটাকে ব্লাড প্রেশার বলা হয়। চোখেরও একটি নির্দিষ্ট প্রেশার আছে, যার মাত্রা থাকবে দশ থেকে একুশ মিলিমিটার মার্কারি। যদি প্রেশার এ মাত্রায় থাকে তাহলে এটিকে চোখের স্বাভাবিক প্রেসার বলে। কোনো কারণে যদি এ প্রেশার ২১ মিলিমিটার মার্কারির বেশি হয়, তাহলে চোখের যে নার্ভ দৃষ্টি শক্তির সাথে সম্পৃক্ত রয়েছে, সে নার্ভের ক্ষয় হওয়া শুরু হয়। ফলে, রোগী চোখে কম দেখতে শুরু করে। চোখের প্রেশার বেড়ে যাওয়ার জন্য অপটিক নার্ভের ক্ষয় হওয়া এবং রোগী চোখে কম দেখা এগুলোকে সমন্বিতভাবে গ্লকোমা বলা হয়। 

লক্ষণ

গ্লকোমার প্রকারভেদের ওপর রোগের লক্ষণ নির্ভর করে। তিন ধরনের গ্লকোমা দেখতে পাওয়া যায়:-প্রাইমারি ওপেন এ্যাঙ্গেল গ্লুকোমা, ন্যাড়া এ্যাঙ্গেল গ্লকোমা ও কনজেনিটাল গ্লকোমা। সাধারণত ওপেন এ্যঙ্গেল গ্লকোমা উপসর্গহীন। রোগী আক্রান্ত হলেও বলতে পারে না। রোগী যখন ডাক্তারের কাছে আসেন তখন ধরা পড়ে। যেমন: চোখের প্রেশার বেড়ে যাওয়া, অপটিক নার্ভের ক্ষয় হয়ে ভেতরে কাফিং দেখা যাওয়া এবং রোগীর দৃষ্টির ব্যাপ্তি সঙ্কুচিত হওয়া। অন্যদিকে ন্যাড়া এ্যঙ্গেল গ্লকোমার লক্ষণ হলো-চোখে অনেক ব্যথা হওয়া ও চোখ লাল হওয়া। কনজেনিটাল গ্লকোমা শিশুদের হয়ে থাকে। এর লক্ষণ হলো-শিশু জন্মের পর পর চোখ বড় হয়ে যাওয়া, চোখ থেকে পানি পড়া ও রুমের লাইট জ্বালানো হলে শিশু চোখ বন্ধ করে ফেলা। 

কারণ

ছানি অপারেশন না করলে তা থেকে বেশি পেকে গিয়ে চোখের প্রেশার বেশি হতে পারে। 
চুলকানির জন্য স্টেরয়েড বেশিদিন ব্যবহার করলে হতে পারে। 
চোখের ভেতরে প্রদাহজনিত কারণে হতে পারে। 
চোখে ব্যথা ফেলে এবং ব্লেডিং হলে হতে পারে। 

যাদের চোখ পরীক্ষা করা জরুরি

প্রাইমারি গ্লকোমার কেনো হচ্ছে তা জনা যায় না, কিন্তু সেকেন্ডারি গ্লকোমা কেনো হয় তা জানা যায়। প্রাইমারি গ্লকোমা সাধারণত পঁয়ত্রিশ বছরের পরে হয়। এজন্য যারা প্রাপ্ত বয়স্ক তারা পরীক্ষার মাধ্যমে নিজের চোখের প্রেশার জেনে নেওয়া প্রয়োজন। যেমন: মানুষ ব্লাড প্রেশার নির্ণয় করতে আগ্রহী হয় ঠিক একইভাবে চোখের প্রেশার কত তাও জেনে নেওয়া উচিত। বিশেষ করে যাদের পরিবারে গ্লকোমা রয়েছে, চোখে আঘাতজনিত কারণ রয়েছে, প্রদাহজনিত কারণ রয়েছে, যাদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, মাইগ্রেন ইত্যাদি রোগ আছে, মাইনাস পাওয়ারের চশমা ব্যবহার করেন তাদের উচিত প্রতিবছর একবার চোখের প্রেশার পরীক্ষা করা। গ্লকোমার সন্দেহ হলে চিকিৎসক যেসকল পরীক্ষা-নিরীক্ষা দেয় সেগুলো করে নেওয়া উচিত। হয়তো উপজেলা থেকে পরীক্ষা করানো সম্ভব হবে না। জেলা সদরেও যদি সম্ভব না হয় তাহলে মেডিকেল কলেজ বা যেখানে এটা করা সম্ভব সেখানে থেকে পরীক্ষাগুলো করতে হবে। 

চিকিৎসা

গ্লকোমা পুরোপুরি নিরাময়যোগ্য নয় তবে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপের মতো এই রোগের চিকিৎসা সারাজীবন করে যেতে হবে। এ রোগে দৃষ্টি যতটুকু হ্রাস পেয়েছে তা আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। তবে দৃষ্টি যাতে আর কমে না যায় তার জন্য চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হবে। এ রোগে প্রচলিত তিন ধরনের চিকিৎসা রয়েছে-ওষুধের দ্বারা চিকিৎসা, লেজার চিকিৎসা ও সার্জারি (শৈল্য চিকিৎসা)। সরকারিভাবে চিকিৎসার জন্য জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউসহ বেশ কয়েকটি সরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এ ছাড়া বেসরকারি হাসপাতালেও এ রোগের সু-চিকিৎসা রয়েছে। দেশে চোখের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের আধুনিক যন্ত্রপাতি রয়েছে। সাব-স্পেশালিটি এক্টিভিটি হিসেবে গ্লকোমার চিকিৎসায় আমাদের দেশে অনেক এগিয়ে গেছে। আগে অনেক রোগী চিকিৎসার জন্য বাহিরে যেতেন। এখন গ্লকোমা রোগ নির্ণয়ের জন্য এবং চিকিৎসার জন্য সর্বাধুনিক প্রযুক্তি দেশেই রয়েছে। আমাদের দেশে উন্নত চিকিৎসা করা যায় তাই বাহিরে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নাই। 

অপারেশনের প্রয়োজনীয়তা

গ্লকোমার চিকিৎসাকে তিনভাগে করা হয়েছে। প্রথমে গ্লকোমা নিণয় করে রোগীকে মেডিকেলের আওতায় এনে ড্রপ দিয়ে তার চোখের প্রেশারটা  কমিয়ে একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে নিয়ে আসা। রোগী ঠিকভাবে ওষুধ সেবন করলে এবং ওষুধের কোনো পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া না হলে সিংহভাগ রোগীর অবস্থা নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। ডায়াবেটিকস, ব্লাড প্রেসার যেমন সারা জীবনের রোগ, তেমনি গ্লকোমাও হচ্ছে সারা জীবনের রোগ। ওষুধ দিয়ে এটিকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। সারা জীবন ড্রপ ব্যবহার করতে হবে। সময় সময় একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হতে হবে। যারা ওষুধ নিতে চায় না আবার কোনো রোগীকে যদি ওষুধ দিয়ে প্রেশার নিয়ন্ত্রণে না আনা যায় তাহলে সার্জিকেল অপশনে যাওয়া প্রয়োজন হয়।

ব্যয়

গ্লকোমার ওষুধ একটু ব্যয়বহুল। আগে সব ওষুধ বাহির থেকে আমদানি করা হতো, এজন্য দাম অনেক বেশি ছিল। বর্তমানে বাংলাদেশে ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানিগুলো অনেক দূর এগিয়ে আসছে। দেশে এন্টি গ্লকোমার যেসব ড্রাগ আছে সেগুলোর মেজর ব্রান্ড বাংলাদেশের। দেশি ফার্মাসিউটিক্যালসগুলো তৈরি করছে। ফলে ওষুধের দাম অনেক কমে আসছে। সরকারি হাসপাতালে সার্জিকেল চিকিৎসা অনেক কম খরচ করা যায়। যারা গরিব তাদেরকে সরকার ফ্রি চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। যাদের আর্থিক স্বচ্চলতা রয়েছে তাদের জন্য মিনিমাম খরচ সরকার নির্ধারণ করেছে। সে হিসাবে সরকারি হাসপাতালগুলোতে তেমন খরচ নেই। যন্ত্রপাতির দাম বেশি হওয়ায় বেসরকারি খাতে সরকারি খাতের চেয়ে খরচ একটু বেশি। তবে বাহিরের তুলনায় আমাদের দেশে বেসরকারি খাতেও এটার তেমন খরচ পড়ে না।

গ্রামে আক্রান্তদের করণীয়

দেশে গ্লকোমা বিশেজ্ঞ সীমিত সংখ্যক এবং তারা বড় বড় শহরগুলোতে থাকে, যেমন: ঢাকা, চট্টগ্রাম। কিন্তু চক্ষু বিশেষজ্ঞ জেলা শহর বা উপজেলা শহরে পাওয়া যেতে পারে। ফলে গ্রামে কারো যদি গ্লকোমা সন্দেহ হয়, তাহলে প্রথমত তিনি চক্ষু বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হবেন। গ্রামাঞ্চলে গ্লকোমা নির্ণয় করা কঠিন ব্যাপার। যন্ত্রপাতি নেই, প্রয়োজনীয় জনশক্তিও নেই। এজন্য গ্লকোমা সিস্ট যারা আছে, তারা প্রচারণা করে গ্লকোমা সম্পর্কে মানুষকে জানানো উচিত। তাহলে সে চিকিৎসা নিতে সুবিধা হবে।

প্রতিরোধ

এই রোগের স্থায়ীভাবে কোনো সমাধান নেই। তাই সময়মতো চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে নিয়মিত চক্ষু পরীক্ষা ও তার পরামর্শ মেনে চলা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নিয়মিত ওষুধ ব্যবহার করা। এ ছাড়া প্রচার-প্রচারণা চালানো ও মানুষের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। 

এএইচ 

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
মাসুদ কামালের প্রতি ড্যাবের হুঁশিয়ারি

ক্ষমা না চাইলে আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে প্রস্তুতি নিন

মাসুদ কামালের প্রতি ড্যাবের হুঁশিয়ারি

ক্ষমা না চাইলে আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে প্রস্তুতি নিন

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত