ডা. সাদাব সাউদ সানী

ডা. সাদাব সাউদ সানী

মেডিকেল অফিসার (৩৩তম বিসিএস), ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (২০০৫-০৬)


১৫ জানুয়ারী, ২০২২ ০৩:৪৯ পিএম

ফাইব্রোমায়ালজিয়া: সর্বাঙ্গে ব্যথা, ওষুধ দিব কোথা?

ফাইব্রোমায়ালজিয়া: সর্বাঙ্গে ব্যথা, ওষুধ দিব কোথা?
ফাইব্রোমায়ালজিয়ায় আক্রান্ত অনেক রোগী অনুভব করেন যে তাদের জয়েন্টগুলো ফুলে গেছে, যদিও আর্থ্রাইটিসের মতো কোন দৃশ্যমান ফোলা থাকে না।

সারা শরীর ব্যথার কারণ:

১. ফাইব্রোমায়ালজিয়া
২. থাইরয়েড বা হরমোনের সমস্যা হলে
৩. ভিটামিন ডি’র অভাবে
৪. বিষণ্ণতা থেকে
৫. ডেঙ্গু বা ভাইরাল ফিভার
৬. বাতজনিত

ফাইব্রোমায়ালজিয়া কি?

ফাইব্রোমায়ালজিয়া এমন একটি রোগ, যার কারণে সমস্ত শরীরের পেশী এবং নরম টিস্যুতে ব্যথা হতে পারে। ফাইব্রোমায়ালজিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের শরীরের অনেক জায়গা থাকে, যেগুলো স্পর্শ করলে অনেক ব্যথা হয়। ফাইব্রোমায়ালজিয়ার প্রকৃত কারণ এখনও অজানা।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, ফাইব্রোমায়ালজিয়া ২০ বছর বয়সের মধ্যে প্রায় দুই শতাংশ মানুষকে আক্রান্ত করে। যা ৭০ বছর বয়সের মধ্যে প্রায় 8 শতাংশে বেড়ে যায়; এটি ২০ থেকে ৫৫ বছরের মহিলাদের মধ্যে সাধারণ পেশীবহুল ব্যথার সবচেয়ে প্রচলিত কারণ। পুরুষদের তুলনায় মহিলারা এ রোগে বেশি আক্রান্ত হন।

ফাইব্রোমায়ালজিয়া কারণ

ফাইব্রোমায়ালজিয়ার প্রকৃত কারণ অজানা। বিভিন্ন শারীরিক বা মানসিক কারণ (যেমন সংক্রমণ, আঘাত বা স্ট্রেস) লক্ষণগুলিকে ট্রিগার (প্রভাবিত) করতে ভূমিকা পালন করতে পারে, যদিও অনেক রোগীর দীর্ঘস্থায়ী ব্যথার ইতিহাস থাকে।

ফাইব্রোমায়ালজিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে, পেশী এবং টেন্ডনগুলো বিভিন্ন বেদনাদায়ক উদ্দীপনা দ্বারা অত্যধিকভাবে প্রভাবিত হয়। এটি ব্যথার উচ্চতর উপলব্ধির কারণে হয় বলে মনে করা হয়, যার মেডিকেল পরিভাষা-কেন্দ্রীয় সংবেদনশীলতা। কেন্দ্রীয় সংবেদনশীলতার কারণে ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম (IBS); দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি ব্যধি (CFS); দীর্ঘস্থায়ী মাথাব্যথা, তলপেট এবং মূত্রাশয় ব্যথা; এবং চোয়াল এবং মুখের ব্যথা হয়।

কিছু লোকের মধ্যে কেন্দ্রীয় সংবেদনশীলতা কীভাবে বা কেন বিকশিত হয়, তার জন্য সাধারণভাবে কোনো সর্বসম্মত ব্যাখ্যা নেই। সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত তত্ত্বটি হচ্ছে যে, এই রোগের একটি জেনেটিক উপাদান রয়েছে। যার অর্থ হলো কিছু লোকের ব্যথার উচ্চতর অনুভূতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যাদের পিতা-মাতা বা ভাই-বোন ফাইব্রোমায়ালজিয়ায় আক্রান্ত, তাদের আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। কিছু ক্ষেত্রে সংক্রমণ (যেমন: লাইম রোগ বা ভাইরাল অসুস্থতা), জয়েন্টের প্রদাহ (যেমন: রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস বা সিস্টেমিক লুপাস এরিথেমাটোসাস), শারীরিক বা মানসিক আঘাত, বা ঘুমের ব্যাঘাতসহ বিভিন্ন ধকল/স্ট্রেস ফাইব্রোমায়ালজিয়ার বিকাশকে প্রভাবিত করে।

ফাইব্রোমায়ালজিয়া এবং এ সম্পর্কিত দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা ব্যাধিযুক্ত ব্যক্তিদের মস্তিষ্কের ইমেজিং গবেষণায় মস্তিষ্কের কার্যকারিতা এবং মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের মধ্যে সংযোগের পরিবর্তন দেখা গেছে। গবেষণা চলতে থাকায়, ফাইব্রোমায়ালজিয়ার দীর্ঘস্থায়ী ব্যথার কারণগুলো আরও ভালোভাবে বোঝা যাবে, আশা করি ভবিষ্যতে আরও ভাল চিকিৎসার দ্বার উন্মচিত হবে।

ফাইব্রোমায়ালজিয়া লক্ষণ

পেশী এবং নরম টিস্যুতে ব্যথা ফাইব্রোমায়ালজিয়ার প্রাথমিক লক্ষণ হল ব্যাপক (ডিফিউজ), দীর্ঘস্থায়ী এবং অবিরাম ব্যথা। যদিও ব্যথা পেশী এবং নরম টিস্যুতে অনুভূত হয়, তবে কোন দৃশ্যমান অস্বাভাবিকতা থাকে না। ব্যথাটিকে একটি গভীর পেশী ব্যথা, কালশিটে, শক্ত হওয়া, জ্বলন্ত বা কম্পন হিসাবে বর্ণনা করা যেতে পারে। রোগীরা হাত ও পায়ে অসাড়তা, ঝিঁঝিঁ ধরা বা অস্বাভাবিকভাবে পোকা ‘হামাগুড়ি দেওয়ার’ অনুভূতিও অনুভব করতে পারে। যদিও কিছু মাত্রার পেশীর ব্যথা সবসময়ই থাকে, তবে উদ্বেগ বা মানসিক চাপ, কম ঘুম, পরিশ্রম বা ঠাণ্ডা বা স্যাঁতসেঁতে অবস্থার সংস্পর্শে আসার কারণে এর মাত্রা বেড়ে যায়।

রোগের শুরুতে ব্যথা নির্দিষ্ট এলাকায়, প্রায়ই ঘাড় বা কাঁধে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। অবশেষে নীচের পিঠে, বাহু এবং পা এবং বুকের প্রাচীরে ব্যথা অনুভব করে। ফাইব্রোমায়ালজিয়ায় আক্রান্ত অনেক রোগী অনুভব করেন যে তাদের জয়েন্টগুলো ফুলে গেছে, যদিও আর্থ্রাইটিসের মতো কোনো দৃশ্যমান ফোলা থাকে না।

অন্যান্য ব্যথা উপসর্গ - ফাইব্রোমায়ালজিয়ার রোগীরা প্রায়ই অন্যান্য ব্যথা-সম্পর্কিত উপসর্গ দ্বারা প্রভাবিত হয়, যার মধ্যে রয়েছে:

• মাইগ্রেনসহ বারবার মাথাব্যথা 
• ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম (আইবিএস) এর লক্ষণ, যার মধ্যে ঘন ঘন পেটে ব্যথা এবং ডায়রিয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য বা উভয়ের পর্ব 
• ইন্টারস্টিশিয়াল সিস্টাইটিস/বেদনাদায়ক মূত্রাশয় সিন্ড্রোম, যেখানে ইনফেকশন ছাড়াই মূত্রাশয় ব্যথা এবং ঘন-ঘন প্রস্রাব হয় এবং দীর্ঘস্থায়ী, ব্যাখ্যাতীত তলপেট ব্যথা
• টেম্পোরোম্যান্ডিবুলার জয়েন্ট (টিএমজে) সিন্ড্রোম, যা সীমিত চোয়াল চলাচলের সাথে জড়িত হতে পারে; মুখ খোলা বা বন্ধ করার সময় ক্লিক করা, স্ন্যাপ করা বা পপিং শব্দ করা; কানের মধ্যে বা চারপাশে মুখের বা চোয়ালের পেশীগুলির মধ্যে ব্যথা; বা মাথাব্যথা
• ক্লান্তি এবং ঘুমের ব্যাঘাত-ফাইব্রোমায়ালজিয়ায় আক্রান্ত ৯০ শতাংশেরও বেশি লোকের মধ্যে ক্রমাগত ক্লান্তি দেখা দেয়।

ফাইব্রোমায়ালজিয়া কি নিরাময় করা যায়?

কিছু লোকের মধ্যে ফাইব্রোমায়ালজিয়া ভাল হয়ে যায় বলে মনে হয়। কিন্তু বেশির ভাগ মানুষের ক্ষেত্রেই এটা নিরাময় করা যায় না। তবুও পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে এবং মোটামুটি স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে শিখতে পারেন। ফাইব্রোমায়ালজিয়া সময়ের সাথে খারাপ হয় না এবং এটি জীবনের জন্য হুমকিস্বরূপ নয়। ফাইব্রোমায়ালজিয়া কি পেশী ব্যথা ছাড়াও উপসর্গ সৃষ্টি করে? হ্যাঁ, ফাইব্রোমায়ালজিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা প্রায়ই বলে যে তারা সব সময় ক্লান্ত বোধ করেন এবং ফ্রেশ ঘুম  হয় না। এছাড়াও-

• পরিষ্কারভাবে চিন্তা করতে সমস্যা
• ফ্লু-এর মতো উপসর্গ
• মাথাব্যথা
• বিষণ্ণতা এবং উদ্বেগ
• পেটে ব্যথা
• ডায়রিয়া বা কোষ্ঠকাঠিন্য
• মূত্রাশয়ে ব্যথা বা তাড়াহুড়ো করে বা প্রায়ই প্রস্রাব করার প্রয়োজন
• চোয়ালের সমস্যা

ফাইব্রোমায়ালজিয়ার জন্য কোন টেস্ট আছে? না, কোন টেস্ট নেই। এটি নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসকরা উপসর্গ সম্পর্কে প্রশ্ন করেন। প্রথমে উপসর্গের অন্যান্য কারণ অনুসন্ধান করেন, যেমন আর্থ্রাইটিস বা হরমোনের সমস্যা।

আপনার শরীরের অনেক অংশে ব্যথা থাকলে, ঘুমের সমস্যা, খুব ক্লান্ত বোধ করলে এবং পরিষ্কারভাবে চিন্তা করতে সমস্যা হলে এবং সারা শরীর ব্যথার অন্য কোন কারণ খুঁজে না পেলে আপনার চিকিৎসক ফাইব্রোমায়ালজিয়া নির্ণয় করতে পারেন। কিভাবে ফাইব্রোমায়ালজিয়া চিকিৎসা করা হয়?

ফাইব্রোমায়ালজিয়ার লক্ষণগুলোর সাথে সাহায্য করার জন্য ওষুধ এবং কৌশল রয়েছে। কিন্তু এমন কোনো চিকিৎসা নেই, যা সবার জন্য কাজ করে।

আমি নিজে কি করতে পারি?

এটা সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ যে, আপনি সক্রিয় থাকুন হাঁটা, সাঁতার বা বাইক চালানো সবই পেশী ব্যথা কমাতে সাহায্য করতে পারে। এটা সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ যে আপনি আপনার জীবন সম্পর্কে খুব নেতিবাচক না হওয়ার চেষ্টা করুন। আপনি কীভাবে ব্যথা অনুভব করেন তার উপর আপনার দৃষ্টিভঙ্গির একটি বড় প্রভাব রয়েছে। ইতিবাচক হতে যথাসাধ্য চেষ্টা করুন। 

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে