পাঁচ চিকিৎসকের বাড়িতে ফুল-মিষ্টি: প্রশংসায় ভাসছেন ওসি
সাখাওয়াত হোসাইন: বরগুনার আমতলী উপজেলায় বিসিএস ক্যাডারে স্বাস্থ্য ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত পাঁচ চিকিৎসকের বাড়িতে ফুল ও মিষ্টি নিয়ে অভিনন্দন জানানোর ঘটনায় প্রশংসায় ভাসছেন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহ আলম হাওলাদার।
মঙ্গলবার (২৬ অক্টোবর) সকালে তিনি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এ পাঁচ চিকিৎসকের বাড়িতে যান। এসময় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন চিকিৎসকদের স্বজনরা। এরপর ওসির প্রশংসা করেছেন চিকিৎসক সমাজ। তারা বলছেন, ‘সম্মানিত ব্যক্তিদের প্রতি সম্মান, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা দেখিয়েছেন ওসি।’
এদিকে নবীন চিকিৎসকদেরকে অভিনব পদ্ধতিতে সম্মান জানানোর কথা জানতে চাইলে শাহ আলম হাওলাদার মেডিভয়েসকে বলেন, ‘আমি নিজ উদ্যোগে বিসিএসে উত্তীর্ণ চিকিৎসকদের সম্মান জানাতে গিয়েছি। তাদের পদ্ধতিগত সেবা প্রদান বাইরে আমাদের একটু বেরিয়ে আসা উচিত। এক বিসিএসে আমতলী উপজেলায় পাঁচ শিক্ষার্থী দেশের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার জন্য উত্তীর্ণ হয়েছেন, এটা অবশ্যই আমাদের জন্য গৌরবের। তাদেরকে সম্মান জানানো ও স্বীকৃতি দেওয়া প্রয়োজন। আসলে ফুল আর মিষ্টি বড় কিছু নয়। বড় কথা হলো, তারা যে শ্রম ও মেধার পরিচয় দিয়েছেন সেটার মূল্যায়ন। তাঁদের বাবা-মা যে কষ্ট করেছেন, এসব কারণ বিবেচনা করে নিজ উদ্যোগে ও খুশি হয়ে তাঁদের বাসায় গিয়েছি। তাঁদের মেধার স্বীকৃতি ও সম্মান জানানোর জন্য।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার এ কাজটাকে মানুষ এতটা ইতিবাচকভাবে নিবে, আমি ভাবিওনি। তবে আমি চেয়েছি, মানুষের মধ্যে পুলিশের উপরের যে ভীতি ও খারাপ ধারণা আছে, এ থেকে বেড়িয়ে আসার। চিকিৎসক ও পুলিশ চাকরি জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একে অপরের সহযোগিতায় থেকে কাজ করে থাকে; সেক্ষেত্রে চিকিৎসক ও পুলিশের মধ্যে সুসম্পর্ক ও সুদৃঢ় বন্ধন থাকা দরকার।’
তিনি আরও বলেন, ‘নবীন চিকিৎসকদেরকে উৎসাহিত করার জন্য আমি তাদের বাসায় গিয়েছি। যারা লেখাপড়া করে তাদেরকে যেকোনো দপ্তরের একজন কর্মকর্তা মূল্যায়ন বা অভিনন্দন জানায়, এতে তারা উৎসাহিত হবেন। তারা ভাববেন, আমরা ভালো কিছু করলে আমাদের বাবা-মা পরিবারের কাছে স্থানীয় প্রশাসন অভিনন্দন জানাতে আসবেন। আমাদের শ্রমের মূল্যায়ন হবে। এতে শিক্ষার্থীরা উৎসাহিত হবেন। এসব কারণ বিবেচনা করে গিয়েছি।’
এ ধরনের পদক্ষেপ চিকিৎসক ও পুলিশের মধ্যে সুদৃড় সম্পর্ক স্থাপনে কতটুকু ভূমিকা রাখবে জানতে চাইলে ওসি শাহ আলম বলেন, ‘চিকিৎসক সমাজ ও পুলিশের মধ্যে বৈরিতা দূর করতে, এটা প্রথম পদক্ষেপ বলা যাবে। কারণ আমরা নিজ নিজ অবস্থানে থেকে গণস্বার্থে কাজ করি। বিশেষ করে আমরা বিচার প্রার্থীদের সঠিক বিচার নিশ্চিতে কাজ করে থাকি। অনেক সময় বিভিন্ন কারণে দেখা যায়, একটা বৈরি ভাব চলে আসে বা ভুল বোঝাবুঝি হয়। সেটা আসলে ব্যক্তিগত ভুল বোঝাবুঝি বা বৈরিতা হতে পারে। পুলিশ ও চিকিৎসক সমাজের বৈরিতা আমি বিশ্বাস করি না। যেহেতু আমি অনেক আগে থেকে অসংখ্য চিকিৎসকের কাছাকাছি গিয়েছি। তাদের সাথে খুব ভালো সম্পর্ক এখনও আছে। বিশেষ করে আমতলী থানার চিকিৎসকদের সাথে আমাদের খুব ভালো সম্পর্ক রয়েছে। আমরা একে অপরের সুবিধা-অসুবিধায় সমভাগী। প্রকৃতপক্ষে চিকিৎসক পুলিশ বা অন্যকোনো পেশার যেকোনো লোকই হোক না কেন আমাদের অপরের সহযোগিতা করা উচিত। আমাদের সবার উদ্দেশ্য রাষ্ট্রের কল্যাণে কাজ করা।’
তিনি আরও বলেন, ‘ভালো মানুষ; ভালো কাজগুলোকে ভালো চোখে দেখে। চিকিৎসকদের বাসায় গিয়ে অভিনন্দন জানানোর পর আমার খুব ভালো লেগেছে যে, বিসিএসে উত্তীর্ণ চিকিৎসক আমার কাছে এসে বলেছেন, তারা অনেক আনন্দিত ও খুবই ভালো লেগেছে। দেশের যারা মেধাবী তারাই বিসিএসে উত্তীর্ণ হন। চাকরির শুরুতে তাঁদেরকে এ ধরনের অভিনন্দন জানানো দরকার। আমি মনে করি, একজন শিক্ষার্থীর পড়াশোনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একটা অধ্যায়। আবার চাকরির শুরু থেকে শেষ আরেকটা অধ্যায়। এ চিকিৎসকদের দ্বিতীয় অধ্যায়ের সূচনায় একটু ভালো লাগা কাজ করাতে পারলাম, এটাই আমার আনন্দ। সবচেয়ে বড় পাওয়া হলো, তাদের বাবা-মার আনন্দের হাসি ও তৃপ্তি। তাদের সন্তানদের মানুষ করতে পেরেছেন, সেই স্বাকৃতি সমাজের সবাই দিচ্ছে। আর যারা আমার জন্য শুভকামনা জানিয়েছেন সবার জন্য ধন্যবাদ।’
বরগুনার আমতলী উপজেলায় ৪২তম বিসিএসে (স্বাস্থ্য) উত্তীর্ণরা হলেন: আমতলী পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ডা. লুনা বিনতে হক, ডা. তৃনা মণ্ডল, ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ডা. তাওহিদুল ইসলাম, কুকুয়া গ্রামের ডা. কাওসার হোসেন ও গোজখালী গ্রামের ডা. সুরাইয়া মনি।
অভিনন্দন পাওয়ার পর অনুভূতি জানতে চাইলে ডা. লুনা হক মেডিভয়েসকে বলেন, ‘অভিনন্দন পাওয়াতে খুব ভালো লাগছে। ওসি স্যার, যে কাজটি করেছেন, এটি খুবই প্রশংসনীয় ও ভালো উদ্যোগ। স্যার একজন সরকারি সিনিয়র কর্মকর্তা হিসেবে নবীন কর্মকর্তার প্রতি যে আন্তরিকতা দেখিয়েছেন, এটি প্রশংসার দাবিদার ও ইতিহাসে বিরল। ওসি স্যার খুবই আন্তরিক ও এ ধরনের উদ্যোগ খুব ভালো।’
ডা. তাওহীদুল ইসলাম মেডিভয়েসকে বলেন, ‘ওসি স্যার অভিনন্দন জানানোয় আব্বু ও আম্মু অনেক খুশি হয়েছেন। আমার আম্মু বলেছেন, এ রকম অমায়িক ব্যবহারের মানুষ হয় না। আমাকে অনেক কষ্ট করে আব্বু-আম্মু পড়াশোনা করিয়েছেন। ওসি স্যারের অভিনন্দন পেয়ে তারা খুব আনন্দিত। তারা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছেন। এ রকম একটি অভিনন্দন পাবেন, কখনও কল্পনাও করিনি। বিশেষ করে মজার ব্যাপার হলো ওসি স্যার যে দিন বাড়িতে আসেন, সেদিন আমি বাড়িতে ছিলাম না। আমার অভিনন্দনটা আমার বাবাকে জানিয়েছেন, এ বিষয়টা খুবই মজার ছিল।’
ডা. কাঙ্ক্ষিতা মণ্ডল তৃণা মেডিভয়েসকে বলেন, ‘অভিনন্দন পাওয়াতে খুবই আনন্দিত। এ ধরনের অভিনন্দন পাবো, কখনও কল্পনাও করিনি। ফুল ও মিষ্টি নিয়ে এসেছেন ওসি স্যার। উনাদের দায়িত্ব আমার বিষয়ে সঠিক তথ্য সংগ্রহ করা ও সরকারের কাছে উপস্থাপন করা। কিন্তু উনারা অভিনন্দন জানাতে আমার বাসায় এসেছেন, সত্যি আমি খুব ভাগ্যবতী এ রকম খুব আন্তরিক ও সৎ একজন ওসি আমার এলাকায় আছেন। এর মধ্যে দিয়ে প্রমাণ হলো পুলিশ ও চিকিৎসক সমাজের মাঝে কোনো বৈরিতা নেই।’