ডা. ইকবাল মাহমুদ

ডা. ইকবাল মাহমুদ

এমডি (কার্ডিওলজি)
হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০৩:২৩ পিএম

যাপিত জীবনের গল্প: একজন চিকিৎসকের আত্মকথা

যাপিত জীবনের গল্প: একজন চিকিৎসকের আত্মকথা
ছবি: সংগৃহীত

এক যুবক তার বন্ধুর সূত্র ধরে আমার চেম্বারে আসেন। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে একটি বেসরকারি ব্যাংকে যোগদান করতে যাচ্ছেন। তার চাকরিতে যোগদানের জন্য ফিটনেস সার্টিফিকেট দরকার। তার বন্ধুর সাথেও আমার সম্পর্ক আরেক ছোট ভাইয়ের সূত্র ধরে।

চার-পাঁচ বছর আগে আমি এমডি কোর্সের শিক্ষার্থী থাকাকালে বন্ধুটির ছোট ভাই, হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান। সে জন্য তারা কার্ডিওলজিস্ট দেখালে ছোট ছেলেটির জন্মগত কমপ্লিট হার্ট ব্লক ধরা পড়ে। এই ব্লক রক্তনালীর ব্লক না, এটা হলো হার্টের ইলেকট্রিসিটি চলাচলের ব্লক, হার্ট বিট কনডাকশনে ব্লক। যে কার্ডিওলজিস্টকে দেখান, তিনি ছেলেটিকে পেইসমেকার বসাতে বলেন।

তখন ছেলেটির বড় ভাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত। তিনি টিউশনি করে সংসার চালান, আরও দুই ভাই-বোনের পড়াশোনা আর ছোট ভাইয়ের চিকিৎসা ব্যয়ের দারুণ ভার তাঁর চেহারায় স্পষ্ট ছিল। তাঁরা দুই ভাই আমার এক জুনিয়রের রেফারেন্সে আমার কাছে আসে কিভাবে কম খরচে চট্টগ্রাম মেডিকেলে পেসমেকারটি লাগানো যায়।

আমি আমার গুরুসহ এই ছেলেটার ইভ্যালুয়েশন করি। কেস কিছুটা জটিল হওয়ায় আসলেই পেসমেকার লাগবে কিনা তা নিয়ে আমার সন্দেহ ছিল। একটা সিদ্ধান্তের জন্য আমরা তাকে বাংলাদেশে হার্টবিটের ইরেগুলারিটির কিংবদন্তি চিকিৎসক অধ্যাপক আতাহার স্যারের কাছে পাঠাই। স্যার কিছু পরীক্ষা করে আমাদের দীর্ঘ চিঠি লিখেন। চিঠির সারমর্ম হলো, ‘আপাতত পেইসমেকার লাগবে না, পর্যবেক্ষণ করো।’

যেহেতু আগে তাদেরকে পেইসমেকার লাগানোর কথা বলা হয়েছিল, আমিসহ রোগীর বড় ভাই ভাবছিলাম কিভাবে কম খরচে তা করা যায়। এ রকম একটা মুহূর্তে যদি কেউ বলে পেইসমেকার লাগবে না। বড় ভাইটির জায়গায় দাঁড়িয়ে আমি ভাবছিলাম, এর চেয়ে খুশির আর সুখের সংবাদ কি হতে পারে?

দীর্ঘদিন তাদের দেখা নাই। নম্বর সেইভ রেখেছিলাম, কিন্তু কি নামে করছি তা ভুলে গেছি। মাঝে মধ্যে মনে হলেও যোগাযোগের পথ পাওয়া যেত না। ঠিক কয়দিন আগে কম বয়সী আরেকজন রোগী আসে জন্মগত কমপ্লিট হার্টব্লক নিয়ে। আমি ভাবছিলাম, আচ্ছা ওই ছেলেটা কেমন আছে?

কি আশ্চর্য! তার এক সপ্তাহ পর, সেই দুই ভাই আমার চেম্বারে হাজির। ছোট ভাইয়ের হঠাৎ কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছে। আসলে ছোট বললে ভুল হবে, সে এখন মহসিন কলেজে পড়ে। অনেকটা বড়। তবে আমার কাছে সে অনেক ছোট। কিন্তু এই বয়সের ছেলেদের চোখে বিশ্বজয়ের স্বপ্নের সাথে অল্প-স্বল্প রোমাঞ্চভরা দারুণ একটা সময়ের চিত্র ভাসতে থাকে। সামনে এইচএসসি দিবে। হয়তো মনে মনে সেও কার্ডিওলজিস্ট হতে চায়, আমার জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হলো না। কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ছেড়ে দেই, ভালো আছে সে।

তো রোগীর বড় ভাইয়ের বন্ধুর গল্প বলছিলাম। তাকে আমি বলেছি রাত ১০টার পর আসতে। আমি কম-বেশি রোগী যাই দেখি, রোগীর কথা শুনে পুরনো সব কাগজপত্র দেখে চিকিৎসা করতে আমার বেশ সময় লেগে যায়। ছেলেটি টিউশন থেকে আসতে দেরি হওয়াতে তাড়াতাড়ি আসতে গিয়ে পা পিছলে পায়ের দুই আঙ্গুলের নখে মারাত্মক যখম হয়। আমার চেম্বারে সে রক্তাক্ত নখ নিয়ে আসে।

আমার সহকারী এসে বলে, স্যার এক রোগী নখ-টখ উল্টিয়ে আসছে কি করবো?

আমি বললাম, পাঠাও, দেখি। সত্যিই সে নখ উল্টিয়ে এসছে। তাকে বললাম, জরুরি বিভাগে গিয়ে নখটা ড্রেসিং করে আসতা।

সে বলে, স্যার আপনি যদি চলে যান?

আমি তার ব্যাকুলতা বুঝি। অসহ্য ব্যথা নিয়ে ফালতু একটা সিস্টেমের বলি হয়ে ছেলেটা বসে আছে। মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত ছেলেদের সংগ্রামের এই ঘামের গন্ধ আমার খুব পরিচিত। আমি তার ফিটনেস সার্টিফিকেট লিখলাম।

২৬ বছর বয়স, ৬ ফিট উচ্চতার দারুণ স্বাস্থ্যের অধিকারী। দেশের প্রতিষ্ঠিত একটা ব্যাংকে যোগদান করতে যাচ্ছে। সার্টিফিকেট লেখা শেষে সহকারীকে বললাম, পভিসেপ (ড্রেসিংয়ের সল্যুয়েশন) আছে কিনা? কার্ডিওলজিস্টের চেম্বারে পভিসেপ থাকার কোনো কারণ নাই। কিন্তু আমার সাহকারী ছেলেটা দারুণ। তাকে যদি বলি, বৈশাখ মাসে তালের পিঠা খাবো, সে বলবে স্যার ব্যাপার না। দেখতেছি স্যার। 

সে কোথা থেকে একটা পভিসেপের বোতল নিয়ে আসলো, হাতে কিছু ড্রেসিংয়ের জিনিস। যুবকের ছেঁড়া পায়ে ড্রেসিং হলো। এসেছিল ফিটনেসের জন্য, সাথে একটা প্রেসক্রিপশন করে দিলাম। আমি চাইলেই তাকে নিচে জরুরি বিভাগে পাঠাতে পারতাম। একবার ভেবেছিলামও। পরে মনে হলো জরুরি বিভাগে তাঁর এই ড্রেসিং আর প্রেসক্রিপশনে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা লাগবে। বেচারা টিউশন থেকে আসছে, টাকা আছে কিনা কে জানে? 

আমি জানি এই ছেলেটাই দুইদিন পর দেশের যে কোন চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসা নেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করবে। তার পরিচিত কারো ফিটনেস সার্টিফিকেটও সে ব্যবস্থা করতে পারবে। কিন্তু আজকের দিনটা, ঠিক এই সময়টা তাঁর জন্য অন্য রকম।

আমি চট্টগ্রাম কলেজে পড়ার সময় এক বড় ভাইয়ের বাসায় কম্পিউটার দেখে খুব আগ্রহ নিয়ে বলছিলাম, ভাইয়া আমাকে একটু কম্পিউটার শিখান। তখন পথে ঘাটে কম্পিউটার থাকতো না। টেকনোলজির পথে আমার সবসময় দুর্বলতা ছিল, এখনও আছে।

উনি আমাকে সরাসরি বললেন, তোমাকে শিখায় আমার কি লাভ? তাছাড়া তুমি শিখে কি করবা? তোমার তো কম্পিউটার নাই। কথাগুলো শতভাগ সত্য আর বাস্তব, কিন্তু এভাবে শুনতে ভালো লাগছিল না। আবার সম্পর্কটাও এমন ছিল যে আবদার করা যেত।

২০০৪ সালে কম্পিউটার ছিল না। কিন্তু এখন বাজারের অন্যতম সেরা কনফিগারশনের ডেস্কটপ, সব থেকে ভালো ল্যাপটপ আমার আছে। অন্য অনেক পেশাজীবীদের চেয়ে বাড়তি কিছু প্রযুক্তি শেখার সুযোগও আমার হয়েছে। কিন্তু ২০০৪ সালের কথাটা আমার মন থেকে মুছে যায়নি। যিনি বলেছেন, উনি হয়তো কিছু মনে করে বলেননি, কিংবা বাস্তব কথাটাই বলেছেন। তারপরও আমি শিখেছি, এভাবে বলতে নাই।

নখ উল্টানো যুবক, আমাকে স্মৃতিকাতর করে দিলো। চাকরির ফিটনেস আর সত্যায়িতের জন্য কেউ আমার কাছে আসলে আমরা ইচ্ছে করে তাদেরকে উল্টা একমণ মিষ্টি খাইয়ে দেই। আমার বিসিএস যোগদানের কাগজপত্র সত্যায়িত করতে যাই আমার অর্থোপেডিক্সের সিএ ডা. আসগর ভাইয়ের কাছে। উনি আমাকে সত্যায়িত করতে করতে বলেন, কোথায় খাবা বলো?

আমি বলি, আরে মানুষ তো সত্যায়িত করতেই চায় না, আপনি আবার খাওয়াবেনও?

উনি বললো কারো চাকরির কাগজ সত্যায়িত করতে উনার খুব মজা লাগে, খুশি লাগে। হয়তো উনার থেকেই অনুপ্রাণিত হয়েছি, এখন আমারও ভালো লাগে। যুবক চেম্বার থেকে ফিরে তার বন্ধুকে ফোন করে, বন্ধুটি আমাকে এই এসএমএসটি পাঠায় ‘Amr friend ekto agei phn diye bolse "Allah onake blessings er upor e rakhuk.Onar caring, affection overall amr accident er treatment o kore dilen free te”.

আমার প্রতিদিন ফিরতে ফিরতে রাত ১২টার কাছাকাছি বাজে, কোন কোন দিন অনেক রোগী দেখলেও পকেটের স্বাস্থ্য খুব একটা ভালো হয় না। ঘরের মানুষজন মাঝে মধ্যে জিজ্ঞেস করে এত রাত কি করি? কি নিয়ে ফিরি? আমি যে কি করি আর কি নিয়ে ফিরি তা দেখা যায় না, শুধু অনুভব করা যায়। ....আলহামদুলিল্লাহ। 

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত