১৭ মে, ২০২১ ১২:০৬ পিএম

ঈদ আনন্দের একাল-সেকাল: বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের ঈদ স্মৃতি

ঈদ আনন্দের একাল-সেকাল: বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের ঈদ স্মৃতি
ছবি: সংগৃহীত

মাহফুজ উল্লাহ হিমু: মুসলামানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদ। দেশের সকল মানুষ যখন স্বজনদের সঙ্গে ঈদ উদযাপনে ব্যস্ত থাকে, তখন চিকিৎসকদের ঈদ উদযাপন হয় ভিন্ন আঙ্গিকে। ঈদকে তারা উৎসর্গ করেন সাধারণ মানুষের জন্য। যেন রোগীর রোগ মুক্তিতেই ঈদের চরম আনন্দ নিহীত।

গত দুই বছরে চিকিৎসকদের ঈদ উদযাপনে যোগ হয়েছে ভিন্ন মাত্রা। বিশেষত বৈশ্বিক মহামারী করোনাকালে চিকিৎসকরা যেন এক যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছেন। যেখানে তারা তাঁদের সকল আনন্দ উৎসর্গ করেছে মানবসেবায়।

ঈদের মতো একটি উৎসব কেমন কাটে চিকিৎসকদের? কেমন ছিল তাদের শৈশবের ঈদ, চাকরিতে প্রবেশের পর সেই আনন্দে কতটুকু পরিবর্তন হলো? এবারের ঈদে চিকিৎসকদের ঈদ আনন্দের একাল সেকাল তুলে এনেছে মেডিভয়েস। 

অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের পরিচালক হিসেবে দীর্ঘদিন কর্মরত ছিলেন তিনি। এছাড়া আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবেও কর্মরত ছিলেন তিনি। শৈশবের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মেডিভয়েসকে অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ বলেন, ‘আমার শৈশব কেটেছে গ্রাম এবং ছোট শহরে। আমরা অনেক ভাই-বোন ছিলাম। ফলে স্বভাবতই আমাদের ঈদ খুবই আনন্দে কেটেছে। আড্ডা দেওয়া, নতুন পোষাক পরা এবং ঈদের দিন সকালে উঠে নদীতে গোসল করতাম। আমাদের বাচ্চাকালে শীতকালে ঈদ হতো।’

ঈদের সকালে গোসল করার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘শীতের সকালে পানি খুব ঠান্ডা থাকায় আমরা নদীর পাড়ে গিয়ে পানিতে নামবো কি নামবো না, এ নিয়ে দ্বিধায় থাকতাম। তখন কেউ না কেউ পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে পানিতে ফেলে দিত। উপরের পানি থাকতো খুবই ঠান্ডা, কিন্তু নিচের পানি মৃদু উষ্ণ থাকতো। এই স্মৃতিটা মনে পরে। এটি খুবই সুখকর একটি স্মৃতি ছিল।’

শৈশবের স্মরণীয় ঘটনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এক ঈদে আমরা খাচ্ছিলাম। ঈদে সাধারণত চালের রুটি রান্না হত। আমরা দুই ভাই প্রতিযোগীতা করে রুটি-মাংস খাচ্ছিলাম। সেখানে আমি মোট ১৭টি রুটি খেয়েছিলাম। এতে আমার বাবা অত্যন্ত রাগান্বিত হয়। উনার ধারণা ছিল আমরা হয়তো অসুস্থ হয়ে যাবো। এটি নিয়ে আমরা এখনও হাসি। একসঙ্গে খেতে বসলে আমাদের এই স্মৃতিটা এখনও মনে পড়ে।’

ঈদ আনন্দের একাল ও সেকালের মধ্যে তুলনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রযুক্তির আগমনে আমাদের ঈদের আনন্দে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। প্রথম যখন দেশে টিভি আসল তখন আমরা তরুণ। পুরো দেশজুড়ে একটিমাত্র টিভি চ্যানেল। তখন আমরা উৎসুক হয়ে তার প্রোগ্রামের জন্য অপেক্ষা করতাম। তবে আমাদের ছেলেবেলায় টেলিভিশন ছিল না। ফলে আমরা তখন খেলাধুলা আড্ডার মাধ্যমে ঈদ উৎযাপন করতাম। অথাৎ সম্পূর্ণটাই ছিল মনুষ্য নির্ভর।’

‘টিভির পাশাপাশি এখন মোবাইল, আইপ্যাডসহ অন্যান্য প্রযুক্তির আগমন হয়েছে। আগে সাধারণত আমরা ঈদ কার্ড ব্যবহার করতাম। কিন্তু মোবাইল আসার পর আমরা মোবাইলে এসএমএস পাঠানো শুরু করালাম। প্রত্যেকের জন্য আমরা আলাদা আলাদা ঈদ কার্ড লিখতাম। আর এখন একসঙ্গে শ-দুয়েক মানুষকে মেসেজের মাধ্যমে শুভেচ্ছা জানিয়ে দিচ্ছি। সাম্প্রতিক সময়ে ফেসবুকে একসঙ্গে সকলকে শুভেচ্ছা জানাতে পারছি। পাশাপাশি ফেসবুকে ছবি দিয়ে স্মৃতি হিসেবেও তা রাখতে পারছি। আমার ছেলা-নাতিরা যে যার মতো মোবাইলে ইউটিউবে মুভি বা ভিডিও দেখছে। টিভিতেও অনেক ধরণের প্রোগ্রাম হচ্ছে। এতে আত্মীয়দের বাসায় যাওয়াটা কমে গেছে। প্রযুক্তির প্রভাবে ঈদ কার্ড পাঠানো এবং একসঙ্গে ঘুরাফেরার মতো আন্তরিক কাজগুলো কমে গেছে’, যোগ করেন অধ্যাপক বেনজির আহমেদ।

কর্মজীবনে ঈদের আমেজ

দীর্ঘ কর্মজীবনে এসব বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের স্মৃতির খাতায় যোগ হয়েছে নানা অভিজ্ঞতা। কর্মজীবনে ঈদের স্মৃতি বর্ণনায় অধ্যাপক বেনজির আহেমেদ বলেন, ‘কর্মজীবনের ঈদ থাকে অনেক বেশি বৈচিত্রময়। আমরা স্বামী-স্ত্রী দুজনই চিকিৎসক হওয়ায় আমাদের বেশিরভাগ ঈদ হাসপাতালেই কাটতো। আমরা হাসপাতালের কোয়াটারে থাকতাম। ঈদের দিন ভোর বেলায় হাসপাতাল থেকে বাড়িতে যেতাম। অনেক রাত হলেও আমরা ফিরতাম। আমাদের হিন্দু কলিগ এবং যাদের বাড়ি দূরে তারা এ সময়টাতে দায়িত্ব পালন করত। আমরা রাতে ফিরে জরুরি বিভাগের দায়িত্ব নিতাম। একবার এক কলিগ কোনো কারণবশত কিছুক্ষণ আগে বের হয়ে গিয়েছিল। দুভাগ্যক্রমে তখন গাছ থেকে পড়ে যাওয়া একজন শিশু রোগী আসে, ওই মূহুর্তে কোনো চিকিৎসক হাসপাতালে ছিল না। তখন মোবাইল ফোনও ছিল না যে আমাকে বা সেই ভদ্রলোককে কল দিবে। আমি যখন আসলাম ততক্ষণে বাচ্চাটি মারা যায়। পরে এটা নিয়ে অনেক ঝামেলা হয় এবং আমার কলিগকে সোকজ ও তদন্ত কমিটির মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।’

বর্তমান সময়ে চিকিৎসকদের ভোগান্তির কথা তুলে ধারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেকে এই পরিচালক বলেন, ‘এখনও চিকিৎসকরা উৎসবের দিনগুলোতে এভাবেই কাজ করেন যা অনেক ক্ষেত্রে অমানবিকতার পর্যায়ে পড়ে। অনেক চিকিৎসক এ সময় খাবার-দাবারেরও কষ্টে ভোগেন। আমি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে থাকাকালীন ঈদে দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের খাবার ও প্রণোদনা দেওয়া যায় কিনা তা বিবেচনায় এনেছিলাম।’

রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ উপধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. শাহাদাত হোসেন মেডিভয়েসকে বলেন, ‘আমাদের ঈদ সর্বদায় সাদামাটা কেটেছে। এর অধিকাংশই হাসপাতালে। গত কোভিডকালে ঈদের সময় একজন মহিলা হাসপাতালে ভর্তি হতে আসেন। তাঁর শারীরিক অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। আমি লক্ষ্য করলাম ওই মহিলা যদি ভর্তির যাবতীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করতে যায় তাহলে হয়তো তাকে আর ওয়ার্ডেও নেওয়া যাবে না। তখন সেখানে যারা ছিল তাদের বললাম তাকে নিয়ে আগে অক্সিজেন দিতে। দেখলাম তার ওক্সিজেন সেচ্যুরিটি লেভেল শতকরা ৬৪ ভাগে নেমে এসেছে। অক্সিজেন দেওয়ার পর তার লেভেল ৮০ ভাগে উঠে আসলো। কিন্তু কোনভাবেই তা ৯০ পার না করায় তাকে হাইফ্লোন্যাজাল ক্যানোলার মাধ্যমে অক্সিজেন দেওয়া হলো। আমাদের তখন কোভিড আইসিইউ ছিল না। পরে তাকে অন্য একটি বেসরকারি হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।’

তিনি বলেন, ‘কোভিড আক্রান্ত ওই মহিলার ঘটনাটি আমাকে এখনও নাড়া দেয়। কারণ করোনার ওই সময়ে যখন কেউই পিপিই ছাড়া রোগীর সংস্পর্শে যেত না, তখন আমি তার পাশে থেকে যতটুকু পেরেছিলাম সেবা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম।’

একই মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. খলিলুর রহমান মেডিভয়েসকে বলেন, ‘আমি শরিয়তপুর জেলায় আরএমও হিসেবে কর্মরত ছিলাম। আমরা সেখানে মাত্র দুইজন চিকিৎসক ছিলাম। আমরা নিজেরা নিজেরা ভাগ করে দায়িত্বপালন করতাম। আমরা শুধু নামজটা পড়তে পারতাম। এরপরেই জরুরি স্বাস্থ্যসেবাই নিয়োজিত হতে হতো। আমরা পরিবারকে সময় দিতে পারতাম না, এমনকি নামাজ শেষেও তাদের সঙ্গে দেখা করতে পারতাম না। প্রথম প্রথম সন্তানদের খারপ লাগত তবে এখন তারাও অভ্যস্ত হয়ে গেছে।’

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি
জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি