মেডিভয়েসের বিশেষ আলোচনায় অধ্যাপক রিদওয়ানুর রহমান
প্রতিদান ছাড়াই কাজ করে গেছেন অধ্যাপক ডা. তাহির
মেডিভয়েস রিপোর্ট: কিংবদন্তি চিকিৎসক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. তাহির পদের জন্য প্রত্যাশী ছিলেন না। নেতৃত্বের গুণাবলী ও কর্মদক্ষতার কারণে সহকর্মী ও শিক্ষার্থীরা তাকে বেছে নিয়েছিলেন। কোনো প্রতিদান ছাড়াই সবার জন্য কাজ করে গেছেন নির্মোহ এ মানুষটি।
মেডিভয়েসের বিশেষ আলোচনা অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে অধ্যাপক তাহিরকে নিয়ে এসব কথা বলেছেন তাঁর স্নেহধন্য সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের সাবেক প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. রিদওয়ানুর রহমান।
মেডিভয়েসের প্রধান উপদেষ্টাকে নিয়ে ‘স্মরণে তাহির স্যার’ লাইভ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে এ আয়োজনের জন্য মেডিভয়েসকে ধন্যবাদ জানান তিনি। অধ্যাপক রিদওয়ান বলেন, ‘এ রকম গুণী মানুষকে যদি আমরা স্মরণ না করি, অনুজদের সামনে তুলে না ধরি, তাহলে আমাদের পুরো জ্ঞানার্জনটা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।’
অধ্যাপক ডা. রিদওয়ানুর রহমান বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে স্যারের প্রিয় ছাত্রদের মধ্যে একজন ছিলাম। আমার মতো আরও অনেকেই স্যারের প্রিয় ছিলেন। স্যারকে কেমন দেখেছি, তা বলার চেয়ে তাঁর কাছ থেকে কি শিখেছি তা বললে চিকিৎসক ও অনুজরা বেশি উপকৃত হবেন। কারণ দীর্ঘ চলার পথে আমরা সবাই শিক্ষার্থী। অনেকের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি এবং এ পথ ধরে একটি জায়গায় এসেছি। শেখার এ ধারা এখনও অব্যাহত আছে।’
মরহুম অধ্যাপক ডা. তাহিরের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘আমি তদানীন্তন আইপিজিএমআরে ইন্টার্নি ও সহকারী রেজিস্ট্রার হিসেবে প্রায় সাত বছর চাকরি করি। আমি থাকা অবস্থায় তাহির স্যার পদায়ন হয়ে বঙ্গবন্ধু বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন। তাঁর কর্মদক্ষতা, সহকর্মীদের মধ্যে জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতার কারণে আস্তে আস্তে তিনি বিভাগীয় প্রধান হলেন, প্রো-ভিসি হলেন, তারপরে ভিসি হলেন। তিনি ডেপুটি ডিরেক্টর ছিলেন। তার পর তিনি বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ান্স এন্ড সার্জন্সের (বিসিপিএস) প্রেসিডেন্ট হলেন। তিনি সোসাইটি অব মেডিসিনের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। শেখার বিষয় হলো: এসব পদের জন্য তিনি কখনোই প্রত্যাশী ছিলেন না। কর্মদক্ষতার কারণে সহকর্মী ও শিক্ষার্থীরা দেখেছেন তাঁর চেয়ে অপেক্ষাকৃত ভালো নেতৃত্ব নেই। আর এ কারণেই প্রত্যেকটি জায়গায় তিনি নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি কোনো রাজনৈতিক বিবেচনায় বঙ্গবন্ধু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি কিংবা বিসিপিএসের প্রেসিডেন্ট হননি। আজকাল এমনটি কল্পনাও করা যায় না। এ চমৎকার সময় যারা পেয়েছেন অধ্যাপক ডা. মো. তাহির তাদের একজন।’
তিনি আরও বলেন, ‘তাহির স্যারের প্রবল একটি বাসনা ছিল, তাঁর সাবজেক্টটির বিস্তৃতি ঘটুক। তাঁর পেশাটা আরও গ্রহণযোগ্যতা পাক। স্যারের প্রত্যাশার প্রত্যক্ষ ফসল আমি। আমি আটবার পিএসসি পরীক্ষা দিয়েছি, কিন্তু কোনোবারই উত্তীর্ণ হইনি। সর্বশেষ নিউরো মেডিসিনে তিন বছর অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর থাকা অবস্থায় সিলেক্ট হলাম। তারপর তাহির স্যারকে গিয়ে বলার পর স্যারের পরামর্শে মেডিসিনের চলে আসি। অন্যথায় আমার মেডিসিনে আসা হতো না।’
‘তাহির স্যার অসংখ্য মানুষের উপকার করেছেন কিন্তু এর জন্য কোনো বিনিময় চাননি। কোনো রকমের প্রতিদান ছাড়াই তিনি সবার জন্য কাজ করেছেন’, যোগ করেন অধ্যাপক ডা. রিদওয়ানুর রহমান।
তিনি আরও বলেন, ‘চট্টগ্রামে পোস্টিংয়ে থাকা অবস্থায় স্যারের পরিবারের সঙ্গে কক্সবাজার যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। ওখানে চার-পাঁচ দিন ছিলাম। স্যারকে আমার খুব কাছে থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। তখন স্যারকে বললাম, স্যার কক্সবাজার সদরে ও রামুতে আমাদের কাজ আছে। আপনি যদি চান তাহলে এসব আপনাকে দেখাতে চাই। তিনি এজন্য পুরো এক দিন সময় দিলেন কাজগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জানার জন্য। অথচ এটা তাঁর দরকার ছিল না। কিন্তু আমাকে উৎসাহ দেওয়ার জন্য এবং মেডিসিনের একজন পারসন হিসেবে তার আগাগোড়া দেখলেন। এ রকম জানার সীমাহীন আগ্রহ স্যারের মধ্যে দেখেছি।’
অধ্যাপক ডা. মো. তাহিরের সাধারণ জীবন-যাপনে মুগ্ধ এ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘সবচেয়ে অসম্ভব একটি জিনিস আমি তাঁর মধ্যে দেখেছি; তিনি পোশাক-পরিচ্ছদ, কথা-বার্তা, চাল-চলন ও আচার-ব্যবহারসহ সব কিছুতে একটি অতি সাধারণ পন্থা অবলম্বন করেছেন। তিনি কখনো এমন ছিলেন না যে, মনে একটি আর বাইরে আরেকটা। তাঁর কোনো আচরণে এমনটি দেখিনি। আজকাল এ রকম মানুষ পাওয়া খুবই কঠিন।’
অধ্যাপক মো. রিদওয়ানুর রহমান বলেন, ‘তাঁর মধ্যে সরলীকরণের চমৎকার যোগ্যতা ছিল। বইতে যা লিখা আছে, তা সবাই পড়লেও একই রকম বুঝবে না। এ রকম জটিল বিষয়গুলো তিনি ছাত্রদের মধ্যে এমন সহজভাবে উপস্থাপন করতেন, যা অবিস্মরণীয়।’
অধ্যাপক ডা. তাহিরের চমৎকার নেতৃত্বের গুণাবলীর কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘নেতৃত্ব গুণের অভাবে অনেক জায়গায় আমাদের পেশাদারগণ সুযোগ্য নেতৃত্ব দিতে পারছেন না, অধ্যাপক ডা. তাহিরের মধ্যে নেতৃত্বের পূর্ণ যোগ্যতা ছিল। তাঁর নেতৃত্বে কোনো গ্রুপিং, ইজম বা দলাদলি স্থান পায়নি। সর্বসাধারণের মধ্যে গ্রহণযোগ্য নেতৃত্বের অধিকারী ছিলেন তিনি।’