অধ্যাপক ড. সৈয়দ আকরাম হোসেন

অধ্যাপক ড. সৈয়দ আকরাম হোসেন

প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
চেয়ারম্যান, রেডিওথেরাপি ফ্যাকাল্টি, বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ান্স অ্যান্ড সার্জন্স


১১ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:২৪ পিএম
স্বাধীন হাসপাতাল অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল গঠনে জোর

স্বাস্থ্যসেবা সুরক্ষা ও হাসপাতাল পরিচালনায় চাই পৃথক আইন ও সমন্বিত জবাবদিহিতা

স্বাস্থ্যসেবা সুরক্ষা ও হাসপাতাল পরিচালনায় চাই পৃথক আইন ও সমন্বিত জবাবদিহিতা
ছবি: এআই সম্পাদিত

হাসপাতালে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় দায় শুধু চিকিৎসকের ওপর চাপানোর প্রবণতা তৈরি হলেও এর নেপথ্যে থাকে জনবলসংকট, অচল যন্ত্রপাতি ও ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতা। অবহেলা আর কাঠামোগত অক্ষমতা এক নয়—এই পার্থক্য অনুধাবন করে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে দুটি পৃথক কিন্তু সমন্বিত আইন প্রতিষ্ঠা এবং সেবার মান নিশ্চিতে একটি স্বাধীন হাসপাতাল অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল গঠন এখন সময়ের দাবি।

বিদ্যমান সংকটের নেপথ্য কারণ

হাসপাতালে রোগী আসেন চিকিৎসা, নিরাপত্তা ও মানবিক আচরণের প্রত্যাশায়। কিন্তু কোনো অঘটন ঘটলেই আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসেন চিকিৎসক; আড়ালে থেকে যায় জনবলসংকট, অচল যন্ত্র, সরবরাহের ঘাটতি ও ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা। অক্সিজেন না থাকার দায়, চিকিৎসায় অবহেলার দায় এবং রোগের অনিবার্য জটিলতা এক নয়। কার্যকর আইনকে এই পার্থক্য চিনতে হবে।   

আইনের প্রয়োজনীয়তা

বাংলাদেশের জন্য তাই দুটি পৃথক কিন্তু সমন্বিত আইনি কাঠামো প্রয়োজন—স্বাস্থ্যসেবা সুরক্ষা আইন এবং হাসপাতাল পরিচালনা ও মাননিশ্চিতকরণ আইন। প্রথমটি রোগী ও স্বাস্থ্যকর্মীর অধিকার, নিরাপত্তা ও প্রতিকার নিশ্চিত করবে। দ্বিতীয়টি নির্ধারণ করবে হাসপাতাল কীভাবে চলবে, কী সেবা দিতে পারবে এবং ব্যর্থতার জন্য কে জবাবদিহি করবে।

চার দশকের পুরোনো আইন

১৯৮২ সালের মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অর্ডিন্যান্স-এ লাইসেন্স, অবকাঠামো, জনবল, ফি প্রদর্শন ও পরিদর্শনের বিধান রয়েছে। তবে চার দশকেরও বেশি সময় পরে হাসপাতালের প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও সেবার জটিলতা বদলেছে। পুরোনো আইন বলেই তা বাতিলযোগ্য নয়; বর্তমান প্রয়োজন পূরণে কোথায় ঘাটতি রয়েছে, সেটিই সংস্কারের ভিত্তি হওয়া উচিত।

বহুমুখী হাসপাতাল ও নিবন্ধন

দেশের হাসপাতালব্যবস্থাও একরকম নয়। সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, ছোট ক্লিনিক, মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল এবং বিশেষায়িত ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব ভিন্ন। রোগীনিরাপত্তার ন্যূনতম মান হবে অভিন্ন; পরিচালনার শর্ত হবে সক্ষমতা ও সেবার ধরন অনুযায়ী। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের মালিকানা, অনুমোদিত সেবা, শয্যা, লাইসেন্স ও মানস্বীকৃতির তথ্য একটি হালনাগাদ জাতীয় নিবন্ধনে প্রকাশ করতে হবে।

সুরক্ষা আইন ও দায়বদ্ধতা

সুরক্ষা আইনে রোগীর তথ্যপ্রাপ্তি, অবহিত সম্মতি, গোপনীয়তা, মর্যাদা এবং অভিযোগের প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে। স্বাস্থ্যকর্মীকে সহিংসতা থেকে রক্ষা করতে হবে এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন করতে হবে। সুরক্ষা মানে নিঃশর্ত দায়মুক্তি নয়; জবাবদিহি মানে প্রতিটি অনাকাঙ্ক্ষিত ফলাফলের জন্য শাস্তিও নয়।

পরিচালনা আইন ও জবাবদিহি

পরিচালনা আইনে মালিক, পরিচালনা পর্ষদ, পরিচালক ও চিকিৎসাসেবা নেতৃত্বের দায়িত্ব স্পষ্ট থাকতে হবে। দায়িত্ব পালনের ক্ষমতা ও সম্পদ না দিয়ে শুধু শাস্তির বিধান বাড়ালে সেবার উন্নতি হবে না। জরুরি ক্রয় ও যন্ত্র মেরামতের ক্ষমতার সঙ্গে স্বচ্ছতা, নিরীক্ষা ও কর্মসম্পাদন মূল্যায়ন যুক্ত করতে হবে। সরকারি হাসপাতালে জনবল ও বাজেটের ঘাটতি থাকলে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

করপোরেট হাসপাতালে ব্যবসায়িক লক্ষ্যমাত্রা যেন চিকিৎসার প্রয়োজন নির্ধারণ না করে। ছোট ক্লিনিকের অনুমোদিত সেবা তার সক্ষমতার সীমায় থাকতে হবে। মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসার সঙ্গে প্রশিক্ষণ ও গবেষণার দায়িত্ব বিবেচনায় নিতে হবে। সব ক্ষেত্রেই জরুরি চিকিৎসা ও নিরাপদ রেফারেলের ব্যবস্থা প্রয়োজন।

স্বাধীন অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল

এই কাঠামোর সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করতে হবে স্বাধীন বাংলাদেশ হাসপাতাল অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল। লাইসেন্স হাসপাতাল পরিচালনার অনুমতি দেয়; অ্যাক্রেডিটেশন যাচাই করে সেবার মান বাস্তবে বজায় আছে কি না।

ভারতের ন্যাশনাল অ্যাক্রেডিটেশন বোর্ড ফর হসপিটালস অ্যান্ড হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার্স (এনএবিএইচ) এবং থাইল্যান্ডের হেলথকেয়ার অ্যাক্রেডিটেশন ইনস্টিটিউট হাসপাতালের মানস্বীকৃতির প্রাতিষ্ঠানিক উদাহরণ। অস্ট্রেলিয়ায় সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের জন্য জাতীয় মানভিত্তিক অ্যাক্রেডিটেশন বাধ্যতামূলক। এসব অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের উপযোগী কাঠামো তৈরি করা সম্ভব।

কাউন্সিলের স্বাধীনতা শুধু নামের মধ্যে থাকলে চলবে না। স্বচ্ছ নিয়োগ, নির্ধারিত মেয়াদ, স্বার্থের সংঘাত নিয়ন্ত্রণ, নিরীক্ষিত অর্থায়ন এবং স্বাধীন আপিলের ব্যবস্থা প্রয়োজন। মূল্যায়নে রোগীর প্রতিনিধিত্ব থাকতে হবে; ফলাফল প্রকাশ করতে হবে। লাইসেন্স ও আইন প্রয়োগ থাকবে নিয়ন্ত্রকের দায়িত্বে, মানস্বীকৃতি কাউন্সিলের। ব্যক্তিগত অবহেলার বিচার বা ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ কাউন্সিলের কাজ হবে না।

সেবার মানদণ্ড ও অভিযোগ নিষ্পত্তি

মূল্যায়নের কেন্দ্রে থাকবে পর্যাপ্ত জনবল, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, ওষুধ ও অস্ত্রোপচারের নিরাপত্তা, সচল যন্ত্র, অগ্নিনিরাপত্তা, অক্সিজেন ও বিদ্যুতের বিকল্প ব্যবস্থা এবং রোগীর তথ্যের সুরক্ষা। অভিযোগ নিষ্পত্তি হবে সহজ, নিরপেক্ষ ও সময়বদ্ধ। রোগীর প্রতিকার পাওয়ার অধিকার এবং স্বাস্থ্যকর্মীর নিরাপদে কাজ করার অধিকার—দুটিই রক্ষা করতে হবে।

মান পূরণে অর্থায়ন ও সহায়তাও প্রয়োজন। সংশোধনযোগ্য ঘাটতিতে সময় দেওয়া যায়; তাৎক্ষণিক বিপজ্জনক সেবা সীমিত করতে হবে। হাসপাতাল বন্ধ হলে রোগীকে নিরাপদে স্থানান্তরের দায়িত্ব এড়ানো যাবে না। অ্যাক্রেডিটেশনও যেন সনদ বিক্রির ব্যবস্থা না হয়—তার সাফল্য মাপতে হবে রোগীর অভিজ্ঞতা ও প্রতিরোধযোগ্য ক্ষতি কমানোর মাধ্যমে।

জনআস্থা ফেরানোর উপায়

আইন দুটি পৃথক হবে, কিন্তু দায়িত্বে ফাঁক থাকবে না। সুরক্ষা আইন মানুষের অধিকার রক্ষা করবে; পরিচালনা আইন প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নিশ্চিত করবে; স্বাধীন অ্যাক্রেডিটেশন সেই দায়িত্ব পালনের মান যাচাই করবে। রোগী, স্বাস্থ্যকর্মী ও হাসপাতাল—সবার জন্য ন্যায়সংগত জবাবদিহিই জনআস্থা ফিরিয়ে আনার ভিত্তি।

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
স্বাধীন হাসপাতাল অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল গঠনে জোর

স্বাস্থ্যসেবা সুরক্ষা ও হাসপাতাল পরিচালনায় চাই পৃথক আইন ও সমন্বিত জবাবদিহিতা

স্বাধীন হাসপাতাল অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল গঠনে জোর

স্বাস্থ্যসেবা সুরক্ষা ও হাসপাতাল পরিচালনায় চাই পৃথক আইন ও সমন্বিত জবাবদিহিতা

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত