চিকিৎসাসামগ্রী আমদানিতে জটিলতা: বিধিমালা ও ডিজিডিএতে আলাদা সেল গঠনের দাবি ড্রেটাব’র
মেডিভয়েস রিপোর্ট: বিধিমালা প্রণয়ন না করে ডায়াগনোস্টিক রি-অ্যাজেন্ট ও চিকিৎসা সরঞ্জাম আমদানি ও বাজারজাতকরণে রেজিস্ট্রেশন ও অনাপত্তিপত্রের (এনওসি) বাধ্যবাধকতায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি, আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে নিয়ম মেনে চলতে তারা প্রস্তুত; তবে সুনির্দিষ্ট বিধিমালা ও বাস্তবসম্মত অনুমোদন ব্যবস্থা ছাড়া হঠাৎ কড়াকড়ি আরোপে বন্দরে জরুরি চিকিৎসাসামগ্রী আটকে গিয়ে সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। এতে ব্যবসার পাশাপাশি দেশের চিকিৎসাসেবাও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে রি-অ্যাজেন্ট ও মেডিকেল ডিভাইসের জন্য আলাদা বিধিমালা এবং ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরে (ডিজিডিএ) সেল গঠনের দাবি জানিয়েছে ডায়াগনোস্টিক রি-অ্যাজেন্টস অ্যান্ড ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্রেটাব)।
আজ বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) রাজধানীর শাহবাগে ঢাকা ক্লাব লিমিটেডের স্যামসন এইচ চৌধুরী সেন্টারে সংগঠনটির নবনির্বাচিত কার্যকরী পরিষদের অভিষেক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন তিনি।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ড্রেটাবের প্রধান নির্বাচন কমিশনার হাবিবুর রহমান। বাংলাদেশ মেডিকেল ইন্সট্রুমেন্টস এন্ড হসপিটাল ইকুইপমেন্ট ডিলার্স এন্ড ম্যানুফ্যাকচারার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি শরীফ উদ্দিন আহমেদ, ও সাধারণ সম্পাদক মো. জসিম উদ্দিন, বাংলাদেশ মেডিকেল ইকুইপমেন্ট ইমপোর্টার্স এন্ড সাপ্লাইয়ার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি মাহফুজ হাসান ও সাধারণ সম্পাদক মো. মাসুমুল হক এবং বিএমএ ভবন দোকান মালিক কল্যাণ সমিতির সভাপতি মো. রিয়াজুল ইসলাম (দিপক) ও সাধারণ সম্পাদক আহসানুল কবীর (তানভীর)।
অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ জামালউদ্দিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানের সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম খান (আবু)।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে হাবিবুর রহমান বলেন, ডায়াগনোস্টিক রি-অ্যাজেন্ট ও মেডিকেল সরঞ্জাম সরবরাহের সঙ্গে সরাসরি দেশের চিকিৎসাসেবা জড়িত। তাই এ খাতে মান নিয়ন্ত্রণ ও যথাযথ নিয়মকানুন যেমন প্রয়োজন, তেমনি আমদানি ও অনুমোদন প্রক্রিয়ায় অযথা দীর্ঘসূত্রতা তৈরি করাও কাম্য নয়। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে মানসম্মত পণ্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি হাসপাতাল ও ডায়াগনোস্টিক সেন্টারে প্রয়োজনীয় সামগ্রীর সরবরাহও স্বাভাবিক থাকে।
স্বাগত বক্তব্যে ড্রেটাব সভাপতি মোহাম্মদ জামালউদ্দিন বলেন, ‘বর্তমানে রি-অ্যাজেন্ট ও চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবসায়িক খাতে দেশীয় ও বৈশ্বিক নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান থেকে নানা ধরনের বিধিনিষেধ ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।’
সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত করায় সদস্যদের প্রতি কৃতজ্ঞ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের পথচলায় আপনাদের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আপনাদের সহযোগিতা ও ঐক্য থাকলে আমরা যেকোনো চ্যালেঞ্জ সফলভাবে মোকাবিলা করতে পারব, ইনশাআল্লাহ।’
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম খান বলেন, ড্রাগ ও কসমেটিক আইন, ২০২৩ এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক আমদানি নীতি-সংক্রান্ত গেজেটে রেজিস্ট্রেশন বা এনওসি ছাড়া চিকিৎসাসামগ্রী আমদানি ও বাজারজাতকরণে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার স্বার্থে ব্যবসায়ীরা নীতিমালা মানতে প্রস্তুত। কিন্তু আইন বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় সুনির্দিষ্ট বিধিমালা এখনো করা হয়নি।
তিনি বলেন, বিধিমালা ও স্পষ্ট নির্দেশনা না থাকায় বিমানবন্দর ও বেনাপোল স্থলবন্দরসহ বিভিন্ন বন্দরে আমদানি করা জরুরি রি-অ্যাজেন্ট ও চিকিৎসাসামগ্রী আটকে থাকছে। এতে একদিকে আমদানিকারকরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন, অন্যদিকে হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আমিনুল ইসলাম খান বলেন, দেশে চিকিৎসাসেবায় ব্যবহৃত ডায়াগনোস্টিক রি-অ্যাজেন্টের প্রায় ৯৫ শতাংশই আমদানি-নির্ভর। এসব পণ্য সরাসরি ওষুধ নয়। তাই ওষুধের সঙ্গে একই ধরনের অনুমোদন ও রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়ার পরিবর্তে ডায়াগনোস্টিক রি-অ্যাজেন্ট ও মেডিকেল ডিভাইসের জন্য আলাদা ও বাস্তবসম্মত কাঠামো প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, স্বতন্ত্র বিধিমালা না থাকায় কোনো কোনো পণ্যের রেজিস্ট্রেশন বা রেসিপি অনুমোদন পেতে ৬ মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত সময় লাগছে। একটি হিমোগ্লোবিন অ্যানালাইজারের অনুমোদনের আবেদন এক বছরের বেশি সময় ধরে ঝুলে থাকছে।
ডিজিডিএর বর্তমান সক্ষমতা দিয়ে বিপুলসংখ্যক পণ্যের অনুমোদন দ্রুত দেওয়া কঠিন উল্লেখ করে ড্রেটাব সাধারণ সম্পাদক বলেন, ফলে একদিকে অনুমোদন প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে অনুমোদন ছাড়া আমদানি করা পণ্য বন্দরে আটকে যাচ্ছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, সঠিক সমন্বয় ও বাস্তবসম্মত নিয়ম ছাড়া হঠাৎ কড়াকড়ি আরোপ করা হলে বাজারে চিকিৎসাসামগ্রীর সংকট দেখা দিতে পারে। ডায়াগনোস্টিক রি-অ্যাজেন্ট সময়মতো দেশে না এলে হাসপাতাল ও ডায়াগনোস্টিক সেন্টারে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ব্যাহত হতে পারে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত রোগীদের ওপরই পড়বে।
‘হঠাৎ করে আরোপিত এই গেজেটের ফলে আমাদের ব্যবসা কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তা এখনই বলা সম্ভব নয়। তবে আমরা মনে করি, এর ফলে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আমরা কখনোই তা চাই না।’
আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার ক্ষেত্রে আমরা অবশ্যই সহযোগিতা করতে চাই। একই সঙ্গে ব্যবসাবান্ধব নীতিমালা প্রণয়ন এবং ডিজি-তে মেডিকেল ডিভাইসের জন্য একটি আলাদা সেল গঠনের দাবি জানাচ্ছি।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে শরীফ উদ্দিন আহমেদ বলেন, মেডিকেল ইকুইপমেন্ট ও ডায়াগনোস্টিক পণ্যের ক্ষেত্রে মান নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এ খাতের পণ্যের ধরন ও ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে অনুমোদন ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে বাস্তবসম্মত করতে হবে। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর নিয়মিত সমন্বয় থাকলে অনেক জটিলতা দ্রুত সমাধান করা সম্ভব।
মো. জসিম উদ্দিন বলেন, দেশে স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের সঙ্গে মেডিকেল ইকুইপমেন্ট ও ডায়াগনস্টিক পণ্যের চাহিদাও বাড়ছে। এ খাতে আমদানিনির্ভরতা থাকায় বন্দরে পণ্য আটকে থাকা বা অনুমোদন প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হলে এর প্রভাব সরাসরি হাসপাতাল ও রোগীদের ওপর পড়তে পারে। তাই নীতিমালা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
মাহফুজ হাসান বলেন, ডায়াগনোস্টিক রি-অ্যাজেন্ট ও মেডিকেল ডিভাইসের জন্য পৃথক ও স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা জরুরি। এতে আমদানিকারকরা যেমন তাদের দায়িত্ব ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাবেন, তেমনি নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষেও পণ্য যাচাই ও অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ হবে।
মো. মাসুমুল হক বলেন, চিকিৎসাসামগ্রীর সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখার বিষয়টি জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাই নতুন কোনো নিয়ম কার্যকর করার আগে সংশ্লিষ্ট খাতের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। ব্যবসায়ী সংগঠন ও সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো গেলে এ খাতের সমস্যাগুলো অনেকটাই কমানো সম্ভব।
অনুষ্ঠানে ড্রেটাবের নবনির্বাচিত কার্যকরী পরিষদের সদস্যদের অভিষেক করানো হয়।
এমইউ/