১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৩:২৭ পিএম

সবুজ পেয়ারায় ভারী ধাতু, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

সবুজ পেয়ারায় ভারী ধাতু, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি
ছবি: সংগৃহীত

মেডিভয়েস রিপোর্ট: বাজার থেকে কেনা কিংবা গাছ থেকে সদ্য পাড়া একটি পেয়ারা। বাইরে থেকে দেখলে সবুজ, টাটকা ও আকর্ষণীয়। কিন্তু চোখে দেখা এই সতেজতার আড়ালে ফলটির ভেতরে জমা হচ্ছে ক্ষতিকর ভারী ধাতু। কিন্তু তা বোঝার কোনো উপায় নেই।

বাংলাদেশে সহজলভ্য ও জনপ্রিয় ফল পেয়ারার নিরাপত্তা নিয়ে এমনই তথ্য এনেছে নতুন এক গবেষণা। রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন জেলার পেয়ারা নিয়ে করা গবেষণায় দেখা গেছে, বাড়ির বাগানে উৎপাদিত পেয়ারার তুলনায় বাণিজ্যিক খামারে উৎপাদিত পেয়ারায় আর্সেনিক, সিসা, ক্যাডমিয়াম ও তামার উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে বেশি।

গবেষণায় বাণিজ্যিক খামারের কিছু পেয়ারায় ভারী ধাতুর মাত্রা নির্ধারিত সীমার চেয়েও বেশি পাওয়া গেছে। গবেষকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বিশ্লেষণে বিশেষ করে শিশুদের জন্য সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি উঠে এসেছে। আট জেলার ১০ এলাকার পেয়ারা পরীক্ষায়। ২০২৫ সালে রাজশাহী বিভাগের আট জেলা—রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও জয়পুরহাট থেকে পেয়ারা সংগ্রহ করে গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়।

গবেষকেরা ১০টি এলাকায় দুটি উৎপাদনব্যবস্থা থেকে নমুনা নেন। একটি ছিল বাড়ির বাগান এবং অন্যটি বাণিজ্যিক খামার। প্রতিটি এলাকায় কাছাকাছি অবস্থানের বাড়ির বাগান ও বাণিজ্যিক বাগান থেকে পরিপক্ব পেয়ারা সংগ্রহ করা হয়।

পরে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে আধুনিক রাসায়নিক উপাদান (যেমন—ধাতু ও খনিজ) শনাক্ত প্রযুক্তি ব্যবহার করে পেয়ারার নমুনায় আর্সেনিক, সিসা, ক্যাডমিয়াম ও তামার উপস্থিতি পরিমাপ করা হয়।

বাণিজ্যিক পেয়ারায় ভারী ধাতু বেশি

গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো—বাড়ির বাগানের তুলনায় বাণিজ্যিক খামারের পেয়ারায় চারটি ভারী ধাতুর মাত্রাই সামগ্রিকভাবে বেশি। বাণিজ্যিক খামারের নমুনায় আর্সেনিকের সর্বোচ্চ গড় ঘনত্ব পাওয়া গেছে ৩.৮৪ মিলিগ্রাম/কেজি, সিসা ২.০৫ মিলিগ্রাম/কেজি, ক্যাডমিয়াম ১.৮৮ মিলিগ্রাম/কেজি এবং তামা ৯.০৪ মিলিগ্রাম/কেজি পর্যন্ত।

গবেষণায় ব্যবহৃত অনুমোদিত সীমার সঙ্গে তুলনা করে দেখা যায়, বাণিজ্যিক খামারের প্রায় ৩০ শতাংশ নমুনায় আর্সেনিক, ৭০ শতাংশে সিসা এবং ৯০ শতাংশে ক্যাডমিয়ামের মাত্রা নির্ধারিত সীমার ওপরে ছিল। তামার ক্ষেত্রেও প্রায় অর্ধেক বাণিজ্যিক খামারের নমুনা সীমা অতিক্রম করেছে। অন্যদিকে বাড়ির বাগানের নমুনাগুলো তুলনামূলকভাবে কম দূষিত ছিল। এসব নমুনায় আর্সেনিক ও সিসার কোনোটি নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করেনি। তবে ২০ শতাংশ নমুনায় ক্যাডমিয়ামের মাত্রা সীমার ওপরে পাওয়া গেছে।

কেন বাণিজ্যিক খামারে বেশি?

একই ফল। একই অঞ্চল। কিন্তু উৎপাদনব্যবস্থা ভিন্ন হলে ভারী ধাতুর মাত্রায় এমন পার্থক্য কেন? গবেষণাপত্রে এর সম্ভাব্য কয়েকটি কারণের কথা বলা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ফসফেট সার ও কীটনাশকের ব্যবহার, দূষিত সেচের পানি এবং শিল্পকারখানা বা যানবাহনের মাধ্যমে পরিবেশে ভারী ধাতু ছড়িয়ে পড়া—এসব কারণে কৃষিজমিতে ভারী ধাতু জমতে পারে। সেখান থেকে তা উদ্ভিদের মাধ্যমে ফলেও প্রবেশ করতে পারে।

তবে গবেষণাটির একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা রয়েছে। গবেষকেরা মাটি বা সেচের পানির নমুনা পরীক্ষা করেননি। ফলে বাণিজ্যিক খামারের পেয়ারায় পাওয়া ভারী ধাতুর নির্দিষ্ট উৎস কী—তা এই গবেষণা নিশ্চিত করেনি। গবেষকেরা ভবিষ্যৎ গবেষণায় মাটি, সেচের পানি এবং উদ্ভিদের বিভিন্ন অংশ একসঙ্গে বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।

শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি 

একই পরিমাণ দূষিত খাবার খেলেও প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশুর ঝুঁকি এক নয়। শিশুর শরীরের ওজন তুলনামূলক কম হওয়ায় শরীরের ওজনের অনুপাতে দূষকের গ্রহণের মাত্রা বেশি হতে পারে। গবেষণায় পেয়ারার মাধ্যমে ভারী ধাতু গ্রহণের সম্ভাব্য অ-ক্যান্সারজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি নির্ণয়ে কোনো বিষাক্ত পদার্থের সংস্পর্শে মানুষের নন-কার্সিনোজেনিক স্বাস্থ্যঝুঁকি পরিমাপের (টার্গেট হ্যাজার্ড কোশেন্ট) ব্যবহার করা হয়েছে। এই সূচকের মান ১-এর বেশি হলে সম্ভাব্য অ-ক্যানসারজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকির ইঙ্গিত হিসেবে ধরা হয়।

গবেষণার হিসাবে, প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে বাড়ির বাগানের প্রায় ৩০ শতাংশ এবং বাণিজ্যিক খামারের প্রায় ৯০ শতাংশ নমুনায় সম্ভাব্য অ-ক্যানসারজনিত ঝুঁকির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। শিশুদের ক্ষেত্রে প্রায় সব বাণিজ্যিক খামারের নমুনাতেই এমন ঝুঁকির ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

ক্যান্সারজনিত ঝুঁকি

গবেষণায় সম্ভাব্য ক্যান্সারজনিত ঝুঁকিও হিসাব করা হয়েছে। এজন্য গবেষকেরা টোটাল টার্গেট কার্সিনোজেনিক রিস্ক সূচক ব্যবহার করেছেন। গবেষণায় ব্যবহৃত ঝুঁকি-মানদণ্ড অনুযায়ী এসব ফল সম্ভাব্য ক্যানসারজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়। বাণিজ্যিক খামারের পেয়ারায় সেই ঝুঁকি বাড়ির বাগানের তুলনায় বেশি। তবে গবেষণাটি কোনো ব্যক্তির ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা পর্যবেক্ষণ করেনি। বরং পেয়ারার নমুনায় পাওয়া ভারী ধাতুর মাত্রা এবং নির্দিষ্ট গাণিতিক মডেলের ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি গ্রহণের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসাব করা হয়েছে।

পেয়ারা বন্ধ নয়, দরকার নিরাপদ উৎপাদন

পেয়ারা বাংলাদেশের খাদ্যাভ্যাসে এটি সহজলভ্য, তুলনামূলক সস্তা ও পুষ্টিকর ফল। ভিটামিন সি ও খাদ্যআঁশের উৎস হিসেবেও এর গুরুত্ব রয়েছে। গবেষকদের মতে, এই গবেষণার বার্তা পেয়ারা খাওয়া বন্ধ করে দেওয়া নয়। বরং প্রশ্নটি আরও বড়—মানুষ প্রতিদিন যে ফল খাচ্ছে, সেটি উৎপাদনের পুরো প্রক্রিয়া কতটা নিরাপদ? কৃষিতে উৎপাদন বাড়াতে সার, কীটনাশক ও সেচের প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু এসব উপকরণের মান, ব্যবহারের মাত্রা এবং পানির উৎস যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না হলে খাদ্যশৃঙ্খলে ভারী ধাতু প্রবেশের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।

প্রয়োজন নিয়মিত নজরদারি

ফলে ভারী ধাতুর উপস্থিতি বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই। একটি পেয়ারা যতই টাটকা, সুন্দর বা সুস্বাদু দেখাক, তার ভেতরে কী পরিমাণ ভারী ধাতু রয়েছে—তা জানতে পরীক্ষাগারের প্রয়োজন।
গবেষকেরা ফলের ভারী ধাতু দূষণ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, নিরাপদ কৃষি উপকরণের ব্যবহার এবং সেচের পানির মান নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। বিশেষ করে বাজারজাত করার আগে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত ফল নিয়মিত পরীক্ষা করা গেলে ঝুঁকিপূর্ণ উৎপাদন এলাকা শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে। পাশাপাশি দূষণের উৎস মাটি, পানি নাকি কৃষি উপকরণ—সেটিও চিহ্নিত করা জরুরি।

কৃষকের উত্তম কৃষিচর্চা নিশ্চিত করার তাগিদ

গবেষণা দলের প্রধান ও ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির পুষ্টি ও খাদ্য প্রকৌশল বিভাগের প্রভাষক মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, গবেষণার কাজ চলেছে প্রায় আট মাস। নমুনাগুলো যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে।

তিনি বলেন, খাদ্যে ক্ষতিকর ভারী ধাতুর অনুপ্রবেশ কীভাবে কমানো যায়, তা নিশ্চিত করাই ছিল গবেষণার অন্যতম উদ্দেশ্য।

মো. সাখাওয়াত হোসেনের মতে, কৃষক পর্যায়ে বিষয়টি নজরদারির ক্ষেত্রে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কৃষকেরা কী ধরনের কীটনাশক কতটা ব্যবহার করছেন এবং সেগুলোর মান কেমন—তা নিশ্চিত করতে কার্যকর নীতিমালা ও মাঠপর্যায়ে তদারকি বাড়ানো প্রয়োজন।

তিনি ‘উত্তম কৃষিচর্চা’ অনুসরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। অর্থাৎ সঠিক নিয়ম ও পরিমাণে কীটনাশক, সার এবং সেচের পানি ব্যবহার করতে হবে। কৃষি মন্ত্রণালয় কৃষকদের উত্তম কৃষিচর্চায় উৎসাহিত করতে দেশজুড়ে কাজ করছে। তাঁর মতে, এই উদ্যোগ আরও জোরদার করা গেলে খাদ্যপণ্যে ভারী ধাতুর দূষণ কমানো এবং নিরাপদ ফসল উৎপাদন সম্ভব হবে।

দেশের চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা রাজশাহী বিভাগের আট জেলার ১০টি এলাকা থেকে বাড়ির বাগান ও বাণিজ্যিক খামারের পেয়ারা সংগ্রহ করে গবেষণাটি পরিচালনা করেন। এতে সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির আরও ছয় গবেষক যুক্ত ছিলেন।

গবেষণাটি আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী জার্নাল অব ফুড কম্পোজিশন অ্যান্ড অ্যানালাইসিসে প্রকাশিত হয়েছে।

গবেষকদের মতে, এই গবেষণার ফল দিয়ে বাংলাদেশের সব পেয়ারা বা দেশের সব বাণিজ্যিক খামারের পেয়ারা একই মাত্রায় দূষিত এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। কারণ গবেষণাটি রাজশাহী বিভাগের নির্দিষ্ট ১০টি এলাকার সীমিতসংখ্যক নমুনার ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে।

এমআর/এমইউ/

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত