দৃষ্টিশক্তি হারানোর শঙ্কায় ডা. আসাদ, বিদেশে পাঠানোর পরামর্শ মেডিকেল বোর্ডের
মেডিভয়েস রিপোর্ট: চাঁদা দাবি করে হুমকির পর সন্ত্রাসীদের ভয়াবহ হামলার শিকার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নাক, কান, গলা ও হেড-নেক সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক মো. আসাদুর রহমান এখন দৃষ্টিশক্তি হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন। হামলায় তার দুই চোখের কর্নিয়া ও রেটিনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, চোখের ভেতরেও রক্ত জমাট বেঁধে আছে। বাম চোখে ঝাপসা দেখছেন ডা. আসাদ। চিকিৎসা বোর্ডের একাধিক পরীক্ষায় চোখের এই জটিলতা ধরা পড়ার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে দ্রুত বিদেশে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা।
তার জখমের ভয়াবহতার কথা জানিয়ে আজ রোববার (২৩ আগস্ট) বিকেলে মেডিভয়েসকে তিনি বলেন, হামলাকারীদের সংখ্যা অন্তত চার থেকে পাঁচজন ছিল। তাদের বয়স আনুমানিক ২০ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। তার ধারণা, হামলাকারীদের মূল লক্ষ্য ছিল মাথা ও চোখে আঘাত করা। হামলায় দুই চোখেই গুরুতর আঘাত পেয়েছেন তিনি। বর্তমানে বাম চোখে ঝাপসা দেখছেন এবং স্বাভাবিকভাবে দেখতে পারছেন না।
তিনি আরও জানান, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিয়ে দুই থেকে তিনবার মেডিকেল বোর্ড বসেছে। তার বিভিন্ন পরীক্ষা করা হয়েছে। সিটি স্ক্যান ও এমআরআইসহ বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তার চোখের কর্নিয়ায় আঘাত লেগেছে। রেটিনায় রক্ত জমাট বেঁধেছে এবং রেটিনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে চোখের ভেতরের জলীয় পদার্থেও রক্ত জমাট বেঁধেছে।
চোখের এই ক্ষতি পুরোপুরি সেরে উঠবে কি-না, তা নিয়ে চিকিৎসকরাও নিশ্চিত নন বলে জানান তিনি। বিশেষজ্ঞদের দেওয়া প্রতিবেদনে উন্নত চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে চিকিৎসক আসাদুর রহমান বলেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। এরপর যত দ্রুত সম্ভব তাকে সিঙ্গাপুরে নিয়ে গিয়ে চোখের উন্নত পরীক্ষা ও চিকিৎসা করানোর বিষয়ে আলোচনা চলছে।
তিনি বলেন, পনেরো হাজার মার্কিন ডলার চাঁদা দাবি করে হুমকি দেওয়ার পর তার ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়েছে চক্রটি। হামলার আগে চিকিৎসকের বাসা ও চেম্বারের ছবি পাঠিয়ে ভয় দেখানো হয়। চাঁদা না দেওয়ার পর নির্ধারিত সময় পার হলে তার ওপর হামলা চালানো হয়। হামলার পরও থেমে থাকেনি হুমকি। মোবাইলে একাধিক বার্তা পাঠিয়ে ফের ভয় দেখানো হয়। সোমবার (১৭ আগস্ট) রাতে তিনি এই হামলার শিকার হন।
তিনি বলেন, গত ১৭ আগস্ট সকালে শিক্ষার্থীদের পড়ানোর পর হাসপাতালে দুটি অস্ত্রোপচার করেন তিনি। পরে বিকেলে চেম্বারে রোগী দেখা শেষে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে বাসার উদ্দেশে রওনা হন। কিছুদূর যাওয়ার পর কয়েকজন যুবক সিএনজিটি আটকে দেয়।
তারা চালককে দরজা খুলতে হুমকি দেয়। দরজা খোলার পর কোনো কথাবার্তা ছাড়াই সবাই মিলে তার ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। এতে তার চোখ, মুখ ও নাক দিয়ে প্রচুর রক্ত বের হতে থাকে। একপর্যায়ে তিনি সিএনজি থেকে বের হয়ে আসতে সক্ষম হন। পরে স্থানীয় লোকজন এগিয়ে এসে হামলাকারীদের একজনকে আটক করে।
তিনি জানান, হামলার আগে গত ৬ আগস্ট তার হোয়াটসঅ্যাপে একটি বার্তা পাঠিয়ে ১৫ হাজার মার্কিন ডলার চাঁদা দাবি করা হয়। ১৫ আগস্টের মধ্যে ওই টাকা দিতে বলা হয়। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা অন্য কারও সহযোগিতা নিলে আরও ক্ষতি হবে বলেও হুমকি দেওয়া হয়।
প্রথমে তিনি বিষয়টিকে গুরুত্ব দেননি। পরে একই নম্বর থেকে ফোন করে চাঁদার বিষয়ে জবাব চাওয়া হয়। নম্বরটি ব্লক করার পরও আবার ফোন আসে। একপর্যায়ে তার বাসার ছবি এবং তিনি যে হাসপাতালে চেম্বার করেন, সেই চেম্বারের ছবিও পাঠানো হয়। এসব ছবি পাঠিয়ে তাকে বলা হয়, তারা কারা সেটি বুঝে নিতে এবং তাদের কথামতো কাজ করতে।
ডা. আসাদুর রহমানের ভাষ্য, ১৫ আগস্ট চাঁদা দেওয়ার সময়সীমা শেষ হওয়ার পর ১৭ আগস্ট তার ওপর হামলা হয়। হামলার একপর্যায়ে তার হাত থেকে মোবাইল ফোন পড়ে গেলে হামলাকারীদের একজন সেটি তুলে তার হাতে দেয়। পরে কানে কানে তাকে বলা হয়, ‘ভাইয়ে ফোন দিবে, ফোন দিলে যা যা করতে বলে করবি।’
আসাদুর রহমান আরও জানান, হামলার কিছুক্ষণ পরই তার মোবাইলে ‘হাও ডু ইউ ফিল নাউ?’ বার্তা পাঠানো হয়। পরদিন আবার ‘ডু ইউ ওয়ান্ট টু ডু মোর মেস উইথ আস?’ লিখে বার্তা পাঠিয়ে তাদের সঙ্গে আর ঝামেলায় জড়াতে চান কি না, তা জানতে চাওয়া হয়।
এ ঘটনায় শারীরিক আঘাতের পাশাপাশি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন বলে জানান ওই চিকিৎসক। হামলার দৃশ্য বারবার চোখের সামনে ভেসে ওঠায় বর্তমানে তাকে দিনে তিন বেলা ঘুমের ওষুধ খেতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।
তিনি আরও জানান, শনিবার (২২ আগস্ট) সকাল ৬টা ৩০ মিনিটের দিকে একই নম্বর থেকে তার মোবাইলে মিসকল আসে। এরপর তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিষয়টি জানান। প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা পর পুলিশ তাকে জানায়, ওই মোবাইল ব্যবহার করে বার্তা পাঠানো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এরপর থেকে ওই নম্বর থেকে আর কোনো বার্তা আসেনি।
এরই মধ্যে এ ঘটনায় কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাদের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশও (ডিবি) জানিয়েছে, চিকিৎসকদের ভয়ভীতি দেখিয়ে বড় অঙ্কের অর্থ আদায়ের পরিকল্পনায় জড়িত কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে ডা. আসাদুর রহমান বলেন, ভবিষ্যতে যেন আর কোনো চিকিৎসক এভাবে হামলার শিকার না হন, সে জন্য সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে জুনিয়র চিকিৎসকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও কাজের সাহস দিতে হবে।
তিনি বলেন, ‘কর্মস্থলের নিরাপত্তা যদি দিতে না পারেন, তাহলে আপনি স্বাস্থ্যসেবা পাবেন না।’
চিকিৎসকদের কর্মস্থলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, দেশের মানুষের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে চিকিৎসকদের নিরাপদ পরিবেশে কাজের সুযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন তিনি।
এনএইচ/এমইউ/