নগর স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করতে ‘আলো ক্লিনিক’ মডেল সম্প্রসারণের উদ্যোগ
মেডিভয়েস রিপোর্ট: সুবিধাবঞ্চিত নগর জনগোষ্ঠীর শিশু, নারী ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর জন্য মানসম্মত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা আরও সহজলভ্য করতে ‘আলো ক্লিনিক’ মডেল সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য একটি ধারণাপত্র প্রস্তুত করতে ইউনিসেফকে অনুরোধ জানিয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়।
আজ বুধবার (৯ জুলাই) রাজধানীর একটি হোটেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আয়োজিত ‘আলো ক্লিনিক’ বিষয়ক জাতীয় ফলাফল উপস্থাপন কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সারদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এ তথ্য জানান।
কর্মশালায় আলো ক্লিনিক মডেলের চার বছরেরও বেশি সময়ের বাস্তবায়ন অভিজ্ঞতা, অর্জিত ফলাফল এবং ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করা হয়।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষের জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করা বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। প্রতিটি নাগরিকের মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। তিনি যেখানেই থাকুন না কেন বা তার আর্থিক সক্ষমতা যেমনই হোক, সবাইকে স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনতে হবে। এজন্য সহজপ্রাপ্য, জবাবদিহিমূলক, জনগণমুখী ও সহনশীল স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার কাজ করছে।
দ্রুত নগরায়ণের ফলে শহরের ভাসমান ও নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে জানিয়ে তিনি বলেন, আলো ক্লিনিক যেভাবে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের দোরগোড়ায় মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিচ্ছে, তা সত্যিই অনুসরণযোগ্য। আগামী সপ্তাহের মধ্যেই তিনি নিজে একটি আলো ক্লিনিক পরিদর্শন করবেন এবং সেখানকার বাস্তব অভিজ্ঞতা পর্যবেক্ষণ করবেন।
মন্ত্রী জানান, সম্প্রতি সিটি করপোরেশন থেকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে আসা ১৯২টি নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আলো ক্লিনিকের সফল অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো হবে। এসব কেন্দ্রে সেবার মান উন্নয়ন এবং আধুনিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, বিপুল অর্থ ব্যয় করে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই সরকারি হাসপাতালগুলোকে এমন পর্যায়ে উন্নীত করা হবে, যাতে মানুষ আস্থা নিয়ে সেখানে চিকিৎসা নিতে পারেন। চিকিৎসার অভাবে দেশের একটি মানুষকেও মরতে দিতে চায় না সরকার। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছেও সহজে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া সরকারের অঙ্গীকার।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, উপজেলা হাসপাতাল, জেলা হাসপাতাল এবং জেলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে পর্যায়ক্রমে কিডনি ডায়ালাইসিস সেবা চালু করা হবে। পাশাপাশি দুর্গম এলাকার রোগীদের দ্রুত উন্নত চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছে দিতে পর্যাপ্ত অ্যাম্বুলেন্স সেবা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
কর্মশালায় জানানো হয়, ২০২১ সাল থেকে ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে পরিচালিত ছয়টি আলো ক্লিনিকে বিনামূল্যে সমন্বিত ও ডিজিটাল প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হচ্ছে। এসব ক্লিনিকে মাতৃস্বাস্থ্য, নবজাতক ও শিশুসেবা, টিকাদান, পুষ্টি পরীক্ষা, রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসাসহ বিভিন্ন ধরনের সেবা দেওয়া হয়। প্রতিদিন গড়ে ১৬৮ জন রোগী এসব সেবা গ্রহণ করেন।
এ ছাড়া কমিউনিটি পর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে গর্ভবতী নারী শনাক্ত করেন, শিশুদের বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ করেন এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে পরিবারগুলোকে যুক্ত করেন। চারটি আলো ক্লিনিকে ২৪ ঘণ্টা ধাত্রী পরিচালিত স্বাভাবিক প্রসবকেন্দ্র চালু রয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত এসব কেন্দ্রে এক হাজারের বেশি নিরাপদ প্রসব সম্পন্ন হয়েছে।
কর্মশালায় উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, আলো ক্লিনিক পরিচালিত এলাকায় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রসবের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে নবজাতক, শিশু এবং পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুহার কমেছে। আলো ক্লিনিক মডেল নগর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদারে কার্যকর প্রমাণিত হওয়ায় সরকার এটি আরও বিস্তৃত পরিসরে বাস্তবায়নের সম্ভাবনা বিবেচনা করছে।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে অংশীদারত্বে এবং সুইডেন সরকারের অর্থায়নে ইউনিসেফ আলো ক্লিনিক মডেলটি বাস্তবায়ন করেছে। সরকার এ উদ্যোগে ইউনিসেফের কারিগরি সহায়তা এবং সুইডেন সরকারের সহযোগিতার প্রশংসা করে।
এ সময় কর্মশালায় উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস, বাংলাদেশে ইউনিসেফের উপপ্রতিনিধি অ্যামানুয়েল অ্যাব্রোক্স, ইউনিসেফের স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান ডা. মালালাই আহমেদজাই, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশ প্রতিনিধি ডা. আহমেদ জামশেদ মোহাম্মদসহ স্বাস্থ্য খাতের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
এনএইচ/এমইউ