ডা. সামসুল চৌধুরী শাহান

ডা. সামসুল চৌধুরী শাহান

ডা. সামসুল চৌধুরী শাহান
রেসিডেন্ট চিকিৎসক, নিউইয়র্ক জ্যাকোবি অ্যালবার্ট আইনস্টাইন কলেজ অব মেডিসিন
সাবেক রেসিডেন্ট চিকিৎসক, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়


০২ জুলাই, ২০২৬ ০৬:৫০ পিএম

আমেরিকায় ইন্টারনাল মেডিসিনের রেসিডেন্সিতে এক বছর: অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি

আমেরিকায় ইন্টারনাল মেডিসিনের রেসিডেন্সিতে এক বছর: অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি
ছবি: সংগৃহীত ও সম্পাদিত

আমার আমেরিকায় ইন্টারনাল মেডিসিন রেসিডেন্সি ট্রেনিংয়ের এক বছর পূর্ণ হয়েছে। এখানে মেডিকেল ট্রেনিংয়ের মূল শক্তি বই মুখস্থ করা নয়; বরং এমন একটি সিস্টেম, যেখানে দায়িত্ব, জবাবদিহি, টিমওয়ার্ক এবং রোগীকেন্দ্রিক সেবার মাধ্যমে প্রতিদিন শেখা হয়।

কাজই শেখার প্রধান উৎস

রেসিডেন্সিতে এসে সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি দেখেছি, তা হলো—পড়াশোনার চেয়ে কাজের মাধ্যমেই শেখা বেশি হয়। কারও হাতে বই দেখি না, বাসায় গিয়েও বই নিয়ে বসতে দেখি না। কাজ করতে করতে কখন যে ১০-১২ ঘণ্টা চলে যায়, তা বুঝা যায় না। প্রত্যেক প্রথম বর্ষের রেসিডেন্টকে সাধারণত সর্বোচ্চ ১০ জন ভর্তি রোগীর চিকিৎসার দায়িত্ব নিতে হয়। রোগীদের জন্য তিনিই প্রথম যোগাযোগের চিকিৎসক। নার্সসহ অন্যান্য বিভাগ রোগীসংক্রান্ত বিষয়ে মূলত তার সঙ্গেই যোগাযোগ করে। প্রতিটি রোগীর জন্য ইলেকট্রনিক মেডিকেল রেকর্ডে (ইএমআর) বিস্তারিত নোট লিখতে হয়, যেখানে গত ২৪ ঘণ্টার সব তথ্য লিপিবদ্ধ থাকে।

এই ডকুমেন্টেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোগীর চিকিৎসার সঙ্গে জড়িত সবাই এসব নোট পর্যালোচনা করেন। একবার নোট লেখা হয়ে গেলে তা পরিবর্তনের সুযোগ নেই। চিকিৎসা-সংক্রান্ত প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনে যুক্তি লিখতে হয় এবং তা হতে হয় প্রমাণভিত্তিক। অন্যথায় আইনি জটিলতার ঝুঁকি থাকে।

এখানে ‘Learning by Doing’ বা কাজ করতে করতেই শেখার সংস্কৃতি সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। কনসালট্যান্টকেও সবকিছু মুখস্থ জানতে হয় না। সবার সামনেই কম্পিউটার থাকে। প্রয়োজন হলে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই গাইডলাইন খুলে দেখে নেওয়া যায়। ফলে মুখস্থবিদ্যার চেয়ে সঠিক তথ্য খুঁজে বের করে প্রয়োগ করার দক্ষতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ফিজিক্যাল এক্সামিনেশনকে কেন্দ্র করে অযথা বাড়াবাড়ি নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মেডিসিন টিম রোগী দেখার আগেই প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়ে যায়। অনেক সময় সিটি স্ক্যান, এমনকি এমআরআইও দ্রুত সম্পন্ন হয়। তাই রোগীর ইতিহাস গ্রহণ ও শারীরিক পরীক্ষা মূলত চিকিৎসা সিদ্ধান্তে যেটুকু প্রয়োজন, সেখানেই সীমাবদ্ধ থাকে।

পরীক্ষার চাপও তুলনামূলক কম। বছরে একটি ইন-ট্রেনিং পরীক্ষা হয়, যা অনেকটা USMLE-এর মতো কম্পিউটারভিত্তিক পরীক্ষা। এর জন্য কাউকে আলাদা প্রস্তুতি নিতে দেখিনি। তিন বছরের রেসিডেন্সি শেষ করাই মূল লক্ষ্য। সাধারণত USMLE-এর তিনটি ধাপ পেরিয়ে আসার পর সবার মেডিসিন-সংক্রান্ত জ্ঞানভিত্তি যথেষ্ট শক্তিশালী থাকে।

হাসপাতালে ভিআইপি একজনই—রোগী

আমেরিকার হাসপাতাল ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো রোগীকেন্দ্রিকতা। এখানে প্রফেসর কে, চেয়ারম্যান কে—এসব রোগীর জন্য খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। প্রতিনিয়ত মনে হবে, এত আয়োজন শুধু রোগীদের জন্য। আপনি প্রাপ্য স্যালারির বিনিময়ে একটি দায়িত্ব পালন করছেন। তবে রোগীরও কাউকে অসম্মান করার সুযোগ নাই। হাসপাতালে পুলিশ এবং নিজস্ব সিকিউরিটি থাকে। এমনকি ভর্তি রোগী ডাক্তারের ছাড়পত্র ছাড়া হাসপাতাল থেকে বেরও হতে পারে না। চিকিৎসা সম্পূর্ণ হওয়ার আগে চলে যেতে হলে বন্ড সাইন করে যেতে হয়।

হায়ারার্কি খুবই কম

হাসপাতালের কর্মীদের মধ্যে হায়ারার্কি বা শ্রেণিভিত্তিক দূরত্ব খুবই কম। যোগ্যতা ও দায়িত্ব অনুযায়ী সুযোগ-সুবিধার পার্থক্য থাকলেও কাউকে অন্যের ওপর অযথা কর্তৃত্ব করার সুযোগ নেই। নার্সদের নিজস্ব সুপারভাইজার রয়েছেন। কোনো সমস্যা হলে তারা নাম প্রকাশ করে বা গোপন পরিচয়ে অভিযোগ করতে পারেন এবং প্রতিকারও পান। ফলে কেউ সাধারণত পেশাগত সীমা অতিক্রম করেন না। অধিকাংশ যোগাযোগই EMR-এর মাধ্যমে হওয়ায় বিষয়টি আরও সহজ হয়েছে। চিকিৎসকদের মধ্যেও হায়ারার্কি খুব কম। প্রফেসর, অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর—এসব পরিচয় মূলত জীবনবৃত্তান্তে  থাকে; বাস্তবে সবাই অ্যাটেন্ডিং বা কনসালট্যান্ট হিসেবেই পরিচিত। মাত্র রেসিডেন্সি শেষ করে আসা একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকও তার ইউনিটে সব সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত কর্তৃপক্ষ। রোগী ছাড়া তাকে অন্য কারও কাছে জবাবদিহি করতে হয় না।

মনস্তাত্ত্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়

এখানে ভুলের জন্য ব্যক্তিকে দোষারোপ করা হয় না। বরং ভুল থেকে শেখার পরিবেশ তৈরি করা হয়। গঠনমূলক মতামত (Constructive Feedback) ব্যক্তিগতভাবে দেওয়া হয়। সবাই সবাইকে ফিডব্যাক দেন। এমনকি প্রথম বর্ষের একজন রেসিডেন্টও কনসালট্যান্টকে ফিডব্যাক দিতে পারেন।

রেসিডেন্টদের প্রচুর কাজ করতে হয়

রেসিডেন্টদের সপ্তাহে সাধারণত ৬০ থেকে ৭০ ঘণ্টা কাজ করতে হয়। তবে সপ্তাহে অন্তত একদিন, অনেক সময় দুই দিনও ছুটি থাকে। নাইট শিফট করলে সকাল ৭টার মধ্যেই বাসায় চলে যাওয়া যায়। বছরে ৩০ দিনের বেতনসহ ছুটি পাওয়া যায়। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, অতিরিক্ত আয়ের চিন্তা করতে হয় না। আমেরিকার যেকোনো অঙ্গরাজ্যে পরিবার নিয়ে চলার মতো বেতন রেসিডেন্টদের দেওয়া হয়। তুলনা হিসেবে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা শেষে কর্মজীবনে প্রবেশ করা অনেক প্রকৌশলীর বেতনের কাছাকাছি বা সমপরিমাণ বেতনই রেসিডেন্টরা পান। রেসিডেন্সি শেষ হওয়ার পর সেই আয় সাধারণত চার থেকে ছয় গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।

সবচেয়ে বড় উপলব্ধি

এক বছরের অভিজ্ঞতায় আমার সবচেয়ে বড় উপলব্ধি হলো, এখানে মেডিকেল ট্রেনিংয়ের মূল শক্তি বই মুখস্থ করা নয়; বরং একটি সিস্টেম, যেখানে দায়িত্ব, জবাবদিহি, টিমওয়ার্ক এবং রোগীকেন্দ্রিক সেবার মাধ্যমে প্রতিদিন শেখা হয়।

এমআর/

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত