ঢামেকে বৈজ্ঞানিক সেমিনারের তথ্য
জন্মগত ত্রুটিযুক্ত ৮০ ভাগ শিশুকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরানো সম্ভব
মেডিভয়েস রিপোর্ট: আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের কল্যাণে জন্মগত ত্রুটি এখন আর অভিশাপ নয়। সঠিক সময়ে এবং যথাযথ পদ্ধতি অনুসরণে চিকিৎসা প্রদান করা গেলে জন্মগত ত্রুটি নিয়ে জন্মানো প্রায় ৮০ শতাংশ শিশুকেই সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
চিকিৎসকদের মতে, কেবল সচেতনতা এবং সময়োপযোগী পদক্ষেপই একটি শিশুকে সমাজের বোঝা হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করে কর্মক্ষম মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারে।
আজ রোববার (১৯ এপ্রিল) সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শহীদ ডা. মিলন হলে বিশ্ব জন্মগত ত্রুটি দিবসের বৈজ্ঞানিক সেমিনারে এসব কথা বলেন তারা। সচেতনতামূলক এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ঢামেক হাসপাতালের ফিটো-ম্যাটারনাল মেডিসিন ইউনিট।
জন্মগত ত্রুটির কারণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, মানবদেহে নানা ধরনের পুষ্টির ঘাটতি, জেনেটিক, কেমিক্যাল, টিন ফুড, পরিবেশ দূষণ, বেশি বয়সে গর্ভধারণ—এ রকম অনেক কারণে বিভিন্ন ধরনের জন্মগত ত্রুটি হতে পারে। বিশেষ করে গর্ভকালীন সময়ে মায়ের শরীরে প্রয়োজনীয় উপাদানের অভাব এবং নিঃশ্বাসের সাথে বা খাবারের মাধ্যমে ইনসেক্টিসাইড, পেস্টিসাইড ও নানা ক্ষতিকারক কেমিক্যাল প্রবেশের ফলে গর্ভস্থ শিশু বিভিন্ন শারীরিক জটিলতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করছে।
তারা বলেন, সচেতনতার মাধ্যমে এ সমস্ত জন্মগত ত্রুটি প্রতিরোধের লক্ষ্যে প্রশাসনিক ও নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের দায়িত্বশীলদের সম্যক ধারণা প্রদান ও মনোযোগ আকর্ষণ—সর্বোপরি সাধারণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য এই সেমিনারের আয়োজন।
সমন্বিত চিকিৎসার গুরুত্ব
ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিশু সার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. ছামিদুর রহমান বলেন, জন্মগত ত্রুটি মোকাবিলায় গাইনি বিশেষজ্ঞদের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি শিশু গর্ভে আসার পর থেকে জন্ম পর্যন্ত দীর্ঘ সময় মা ও শিশু গাইনি বা ফিটোম্যাটারনাল বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে থাকে। সঠিক রেফারেল সিস্টেমের মাধ্যমে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করলে ওই শিশুটি পঙ্গুত্ব বা অস্বাভাবিকতা কাটিয়ে সমাজের একজন দক্ষ ও স্বাভাবিক নাগরিক হিসেবে বড় হওয়ার সুযোগ পায়।
তিনি আরও বলেন, সঠিক সময়ে সঠিক রেফারেল এবং সমন্বিত চিকিৎসা ব্যবস্থার মাধ্যমে জন্মগত ত্রুটিযুক্ত শিশুদের আশি ভাগই স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে। এতে যেমন একটি শিশুর ভবিষ্যৎ রক্ষা পায়, তেমনি সমাজ ও রাষ্ট্রও মুক্তি পায় এক বিশাল বোঝা থেকে।
চিকিৎসকদের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি
একজন শিশু জন্মগত ত্রুটি নিয়ে বড় হওয়া মানে পরিবার ও রাষ্ট্রের ওপর একটি দীর্ঘমেয়াদি চাপ। এ বিষয়ে শিশু সার্জনরা অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছেন।
ডা. ছামিদুর রহমান বলেন, ‘প্রতিটি অসুস্থ শিশুকে যদি আমরা নিজের ভাই, বোন বা সন্তান হিসেবে বিবেচনা করি, তবে তাদের চিকিৎসায় অধিক দরদ ও মনোযোগ দেওয়া সম্ভব।’
জন্মগত ত্রুটিগুলোকে সারিয়ে শিশুকে স্বাভাবিক বা স্বাভাবিকের কাছাকাছি অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া শিশু সার্জনদের মৌলিক দায়িত্ব বলেও জানান তিনি।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অবসটেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশের (ওজিএসবি) সভাপতি অধ্যাপক ডা. ফিরোজা বেগম বলেন, গাইনোকোলজিস্টরা যদি গর্ভাবস্থায় কোনো ত্রুটি শনাক্ত করতে পারেন, তাহলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়ার পর শিশুর বাবা-মাকে কাউন্সিলিং করে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের কাছে পাঠাতে হবে। কারণ এই সময়ের মধ্যে তাদের অর্থনৈতিক প্রস্তুতির বিষয় থাকে। এই বিষয়গুলো আমাদের বোঝানো দরকার। যথাযথ রেফারাল সিস্টেম অনুসরণের মাধ্যমে এ রকম শিশুদের চিকিৎসার সাফল্য বহুগুণ বেড়ে যায়।
আত্মীয়দের বিয়েতে ত্রুটিযুক্ত সন্তানের চিকিৎসা নেই
তিনি আরও বলেন, ‘কিছু কিছু জন্মগত ত্রুটি প্রতিরোধ করা সম্ভব। তবে সকল জন্মগত ত্রুটি প্রতিরোধযোগ্য নয়। বিশেষ করে আত্মীয়দের মধ্যে বিয়ের ফলে বিরল ত্রুটিযুক্ত সন্তান প্রসব হয়, এসব ত্রুটিযুক্ত শিশুর আসলে চিকিৎসা মেলে না।’
যেসব জন্মগত ত্রুটিযুক্ত শিশুর চিকিৎসা করা সম্ভব হয় না তারা পরিবারের জন্য বড় ধরনের বোঝা হয়ে দাঁড়ায় বলেও জানান ওজিএসবি সভাপতি।
তিনি জন্মগত ত্রুটি প্রতিরোধে বিভিন্ন পদক্ষেপ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় এবং আক্রান্তদের প্রতি সংবেদনশীল হওয়া আহ্বান জানান। একই সঙ্গে দেশে জেনেটিক ল্যাব করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন অধ্যাপক ফিরোজা বেগম।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) ফিটোম্যাটারনাল মেডিসিন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. তাবাসসুম পারভীন এ ত্রুটি প্রতিরোধে করণীয় নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি বলেন, রোগী ও রোগীর পরিবারের ইতিহাস জানতে হবে, ফলিক এসিড ওষুধ সেবন এবং গর্ভকালীন পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট শিশু ইউরোলজি ও সার্জন অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শাদরুল আলম বলেন, জন্মগত ত্রুটি রোধে সূচনাতেই রোগ শনাক্ত হওয়া জরুরি। এ ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা দরকার, যা গাইনি চিকিৎসকরা সর্বাগ্রে এবং এর পর সার্জন, নিওনেটলজিস্ট ও রেডিওলজিস্টরা আছেন।
‘জন্মগত ত্রুটিমুক্ত করে আমরা যদি শিশুগুলোকে ঠিক রাখতে পারি, তাহলেই একটি ভালো জাতি তৈরি করতে পারবো’—মত ডা. শাদরুল আলমের।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন ঢামেকের ফিটো-ম্যাটারনাল মেডিসিন ইউনিটের সহকারী অধ্যাপক ডা. উম্মে সালমা। আলোচনায় জন্মগত ত্রুটি নির্ণয়ে ঢাকা মেডিকেলে কি ধরনের ইনাভেসিভ প্রোসিডিউর হয়, কি কি জেনেটিক পরীক্ষা হয়, তা উল্লেখ করেন তিনি।
ঢামেক উপাধ্যক্ষ ও প্রসূতি বিদ্যা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মুসাররাত সুলতানার সভাতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে ছিলেন ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মো. আসাদুজ্জামান।
সম্মানিত অতিথি ছিলেন স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালের গাইনি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. আফরোজা কুতুবী, মুগদা মেডিকেল কলেজের গাইনি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. শিরিন আক্তার খানম ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের গাইনি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সুলতানা আফরোজ।
ঢামেকের ফিটো-ম্যাটারনাল মেডিসিন সহকারী অধ্যাপক ডা. আরিফা শারমিন মায়া ও ডা. দীনা লায়লা হোসেনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে ডা. রাশিদা খানম, অধ্যাপক ডা. বেগম মাকসুদা ফারিদা আখতার, অধ্যাপক এসএম শাহিদা, অধ্যাপক ইরিন পারভীন আলম, অধ্যাপক ডা. তাহমিনা হোসেন, অধ্যাপক ডা. আকলিমা আক্তার, অধ্যাপক ডা. ফাওজিয়া আক্তার, অধ্যাপক ডা. প্রফেসর তাজমিরা সুলতানা ও অধ্যাপক ডা. মাসুদা সুলতানা বক্তব্য রাখেন।
অনুষ্ঠানে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন ফিটো-ম্যাটারনাল মেডিসিন সহকারী অধ্যাপক ডা. হাফিজা ফারজানা।
সচেতনতা সৃষ্টিতে প্রদর্শিত নাটক ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায়
অনুষ্ঠানে জন্মগত ত্রুটি বিষয়ে ডা. আরিফা শারমিন মায়ার রচনা ও পরিচালনায় নির্মিত একটি নাটক প্রদর্শিত হয়। সচেতনতামূলক এই নাটক দর্শকসহ উপস্থিতি বিশিষ্টজনদের ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায়, যার কলাকুশলীদের সবাই দেশের বড় বড় স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে কর্মরত চিকিৎসক।
এমইউ/