ডা. সুমাইয়া আক্তার

ডা. সুমাইয়া আক্তার

এমবিবিএস, এফসিপিএস (গাইনি ও অবস)
এফসিপিএস (রিপ্রেজেন্টেটিভ এন্ডোক্রাইনোলোজি ও ইনফার্টিলিটি)
প্রজনন হরমোন, বন্ধ্যত্ব, স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিশেষজ্ঞ এবং ল্যাপারোস্কোপিক সার্জন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।


২২ নভেম্বর, ২০২৫ ০১:২০ পিএম

বারবার গর্ভপাতের কারণ ও চিকিৎসা

বারবার গর্ভপাতের কারণ ও চিকিৎসা
ছবি: সংগৃহীত

বারবার গর্ভপাত শুধু শারীরিক নয়, বরং মানসিকভাবেও একজন নারী ও তার পরিবারের জন্য গভীর আঘাতের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কেন এমনটি ঘটে এবং কীভাবে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব—ভবিষ্যতের নিরাপদ ও সফল গর্ভধারণের জন্য তা জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই লেখায় বারবার গর্ভপাতের সম্ভাব্য কারণ, রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসা সম্পর্কে স্পষ্ট ও নির্ভরযোগ্য তথ্য তুলে ধরা হলো।

বারবার গর্ভপাতের কারণ

যখন একজন মহিলার ২৪ সপ্তাহের পূর্বে পরপর দুই বা তার বেশি বাচ্চা নষ্ট হয়, এই অবস্থাকে বারবার গর্ভপাত (recurrent pregnancy loss) বলে। এটি যেকোনো দম্পতির জন্য কত যে কষ্টের অভিজ্ঞতা তা ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ বুঝবেন না। নিচে এর কারণগুলো তুলে ধরা হলো। 

জেনেটিক কারণ

বারবার গর্ভপাতের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী হল জেনেটিক অস্বাভাবিকতা। মা অথবা বাবা থেকে বাহিত ক্রোমোজমে অস্বাভাবিকতা (এবনরমালিটি) থাকার কারণে সন্তানের ক্রোমোজোমাল অস্বাভাবিকতা হয় অর্থাৎ একটি অস্বাভাবিক বাচ্চা তৈরি হয়। প্রকৃতিগতভাবেই অস্বাভাবিক বাচ্চাগুলো নষ্ট হয়ে যায়।

প্রথম তিন মাসের গর্ভপাতের অর্ধেকের জন্য দায়ী এই জেনেটিক এবনরমালিটি। বেশিরভাগ মহিলা পরপর দুইবার গর্ভপাতের পর, প্রায়ই চিকিত্সা ছাড়াই তৃতীয়বার সফল গর্ভধারণ করেন।

রক্ত জমাট বাঁধা

অ্যান্টিফসফোলিপিড সিন্ড্রোম (এপিএস) এমন একটি অবস্থা, যা রক্ত জমাট বাঁধা এবং স্ট্রোক হতে পারে। এটি একটি অটোইমিউন ডিসঅর্ডার, যা শরীরে অস্বাভাবিক অ্যান্টিবডি তৈরি করে যা রক্তের কোষ এবং তাদের আবরণকে আক্রমণ করে, যাকে ফসফোলিপিড বলা হয়।

রক্তকণিকা সঠিকভাবে কাজ করার জন্য ফসফোলিপিড প্রয়োজন। যখন অ্যান্টিবডিগুলো ফসফোলিপিড আক্রমণ করে, তখন কোষগুলো আটকে যায় এবং রক্তনালীগুলোর মাধ্যমে তাদের গন্তব্যে যেতে পারে না। ফলে রক্ত জমাট বাঁধে।

এই বিরল অটোইমিউন ডিসঅর্ডারটি বারবার গর্ভপাত ঘটাতে পারে কারণ, জমাট রক্ত প্ল্যাসেন্টায় রক্ত প্রবাহকে ব্যাহত করতে পারে। ফলস্বরূপ, ভ্রূণ প্রয়োজনীয় পুষ্টি এবং অক্সিজেন থেকে বঞ্চিত হয়, ফলে গর্ভাবস্থা নষ্ট হয়।

জরায়ুর সমস্যা

সেপ্টাম বা পর্দা:  এটি জরায়ুর বিকৃতির একটি বিরল রোগ যেখানে সেপ্টাম নামক একটি টিস্যু জরায়ুকে দুটি গহ্বরে বিভক্ত করে।

অ্যাশারম্যান সিন্ড্রোম: এটি একটি আঘাত বা পূর্ববর্তী অস্ত্রোপচারের যেমন এমআর, ডিএনসি, ইনফেকশন ইত্যাদি কারণে হতে পারে। এতে জরায়ুর গহ্বরে বাচ্চা বসার জায়গাটি নষ্ট হয়ে যায়।
 
ফাইব্রয়েড: এগুলো জরায়ুর টিউমার। ফাইব্রয়েডগুলো ভারী রক্তপাত, ব্যথা এবং অন্যান্য উপসর্গের কারণ হতে পারে।

হরমোনজনিত ব্যাধি

যেমন—

হাইপোথাইরয়েডিজম (থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতি)
অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস
পলিসিস্টিক ডিম্বাশয় সিন্ড্রোম বা PCOS (ইস্ট্রোজেন ভারসাম্যহীনতা) ও
অতিরিক্ত প্রোল্যাক্টিন স্তর (পিটুইটারি গ্রন্থি দ্বারা নিঃসৃত একটি হরমোন) ইত্যাদি। 

অন্যান্য কারণ

এক্ষেত্রে বয়স আরেকটি কারণ, যা বারবার গর্ভপাতের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। ৩৫ বছরের বেশি বয়সী মহিলাদের এবং ৪০ বছরের বেশি বয়সী পুরুষদের মধ্যে ঝুঁকি বেশি।

ধূমপান (ফার্স্ট-হ্যান্ড বা প্যাসিভ), ক্যাফিন বা অ্যালকোহলের অতিরিক্ত সেবন এবং স্থূলত্বের মতো কিছু জীবনধারার কারণও গর্ভাবস্থার ক্ষতির ঝুঁকির কারণ। 

রোগ নির্ণয়

বারবার গর্ভপাতের কারণ শনাক্ত করার জন্য যেসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা যায়—

ক্যারিওটাইপিং

পিতামাতার মধ্যে ক্রোমোজোম অস্বাভাবিকতা শনাক্ত করার জন্য, তাদের ক্রোমোজোমের কনফিগারেশন নির্ধারণের জন্য পিতামাতা উভয়ের জেনেটিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা (স্ক্রীনিং) করা যেতে পারে। এটি ক্যারিওটাইপিং নামে পরিচিত।

রক্ত পরীক্ষা

অ্যান্টিফসফোলিপিড অ্যান্টিবডিগুলির উপস্থিতি শনাক্ত করা থাইরয়েড হরমোন এবং রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা পরীক্ষা করা। 

ইমেজিং 

জরায়ুর সমস্যা দেখার জন্য আল্ট্রাসাউন্ড, ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স ইমেজিং (MRI), এক্স-রে ইত্যাদির মতো ইমেজিং করা যেতে পারে।

হিস্টেরোস্কোপি 

এটি জরায়ুর ভিতরের অংশ পরীক্ষা করার জন্য ব্যবহৃত একটি পদ্ধতি। Hysteroscopy জরায়ু ফাইব্রয়েড পলিপ, গঠনগত সমস্যা নির্ণয় ও সমাধান একই সাথে করা যায়।

বারবার গর্ভপাতের চিকিৎসা

বারবার গর্ভপাতের চিকিৎসা নির্ভর করে কারণের উপর। অর্থাৎ কি কারণে বারবার গর্ভপাত হচ্ছে সেটি সঠিকভাবে খুঁজে বের করতে পারলেই চিকিৎসা করা সম্ভব। 

রক্ত পাতলা

এপিএস ধরা পড়লে সফল গর্ভধারণের জন্য রক্ত পাতলা করার ওষুধ দেয়া হয়। এটি অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ মত এবং তত্ত্বাবধানে থেকে নিতে হবে। 

প্রোজেস্টেরন

প্রোজেস্টেরন সাপোর্ট—ইনজেকশন, মুখে খাওয়ার মেডিসিন ও ব্যবহারের জন্য দেয়া হয়। এই চিকিৎসা পদ্ধতি এখনো গবেষণাধীন।

আইভিএফ ও প্রিইমপ্লান্টেশন জেনেটিক টেস্টিং ( PGT)

এই চিকিত্সা পদ্ধতিটি  পিতামাতার মধ্যে জেনেটিক এবনরমালিটি থাকলে সুপারিশ করা হয়। 

সার্জারি

জরায়ুর সমস্যার জন্য আমরা বিভিন্ন সার্জারি, যেমন—অ্যাডেসিওলাইসিস এবং ফাইব্রয়েড অপসারণ, বাইকর্নুয়াট জরায়ুর জন্য মেট্রোপ্লাস্টি, সেপটাম রিসেকশন ইত্যাদি করে থাকি।

ওষুধ

অন্যান্য কারণ, যেমন—থাইরয়েড রোগ এবং ডায়াবেটিস, সাধারণত ওষুধ দিয়ে চিকিত্সা করা হয়।

মনে রাখবেন রক্তে সুগার বেশি থাকার কারণে শুধু গর্ভপাতই নয়, গর্ভাবস্থার জটিলতা হতে পারে, যেমন—জন্মগত ত্রুটি এবং মৃতপ্রসব ইত্যাদিও হতে পারে। 

বারবার গর্ভপাতের মধ্য দিয়ে যাওয়া একটি হৃদয় বিদারক অভিজ্ঞতা। 

ক্রোমোসোমাল অস্বাভাবিকতা, অ্যান্টিফসফোলিপিড সিনড্রোম, জরায়ু সমস্যা, হরমোনজনিত ব্যাধি, বয়স এবং জীবনযাত্রার কারণগুলো, যেমন—ধূমপান এবং অত্যধিক অ্যালকোহল পানসহ বারবার গর্ভপাতের অনেক কারণ রয়েছে।

আপনার ক্ষেত্রে কী কারণে সমস্যা হচ্ছে তার উপর নির্ভর করে আপনার চিকিৎসা।

এমইউ/

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত