২৭ অক্টোবর, ২০২৫ ০৬:০২ পিএম

‘মরা রোগী সিসিইউতে নিচ্ছে কেন, অনেক টাকা বিল আসবে’

‘মরা রোগী সিসিইউতে নিচ্ছে কেন, অনেক টাকা বিল আসবে’
ছবি: মেডিভয়েস

তারিকুল ইসলাম: ‘মরা রোগীকে হৃদ্‌যন্ত্রের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (সিসিইউ) নিচ্ছে কেন, এখন অনেক টাকা বিল আসবে, মরা মানুষ নিয়েন না। এটা তো দেখেই বোঝা যায়, রোগী (বেঁচে) নাই।’

হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়া (কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট) কলারোয়া উপজেলার খোরশেদ আলীকে বুকে চাপ দিয়ে হার্ট ও ফুসফুস চালু রাখার চেষ্টা (সিপিআর) চালিয়ে যাওয়া ডা. হাবিবুর রহমানকে লক্ষ্য করে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন স্বজনরা।

জানা গেছে, ডা. হাবিব টানা ৩৯ মিনিট দক্ষতার সঙ্গে সিপিআর দেওয়ার পর খোরশেদ আলীর হৃদস্পন্দন (হার্টবিট) ফিরে আসে।

এ বিরল ঘটনা ও রোগীর স্বজনদের এমন অভিব্যক্তি বর্ণনা করতে গিয়ে রোববার (২৬ অক্টোবর) মেডিভয়েসের সঙ্গে এসব কথা জানান সাতক্ষীরা স্পেশালাইজড হাসপাতালের কনসালট্যান্ট হাবিবুর রহমান।

সিসিইউ সুবিধা না থাকায় স্পেশালাইজড হাসপাতাল থেকে অ্যাম্বুলেন্সে স্ট্রেচারের উপর উঠে সিপিআর দিতে দিতে রোগীকে নিয়ে যান সাতক্ষীরা ব্লিজ হাসপাতালে। ততক্ষণে এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে খোরশেদ আলীর মৃত্যুর খবর।

স্বজনদের বরাত দিয়ে ডা. হাবিব জানান, দুপুরে জমিতে কাজ করছিলেন খোরশেদ (৭০)। এ অবস্থায় হঠাৎ বুকে তীব্র ব্যথা অনুভব করে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তাঁর আশপাশের লোকজন তৎক্ষণাৎ একটি অ্যাম্বুলেন্স ডেকে সাতক্ষীরা স্পেশালাইজড হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।

ডা. হাবিব বলেন, ‘চেম্বারে আসার পর দেখি রোগী খুব ঘামছিলেন এবং বুকের ব্যথায় ছটফট করছিলেন। পরে আমরা একটি ইসিজি করি। সেখানে দেখা যায়, সবচেয়ে বড় ধরনের হার্ট অ্যাটাক এস-টি এলিভেশন মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন (এসটিইএমআই) হয়েছে। ইসিজির রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পরই আমি ইকো প্রোবটা রোগীর বুকে বসাই, হার্টের ওয়ালগুলো ঠিকভাবে নড়াচড়া করছে কিনা এবং ব্লক কতগুলো হতে পারে তা দেখার জন্য। আমি যখন ইকো প্রোবটা ধরলাম, তখনই রোগীর হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে গেছে। এতক্ষণ পর্যন্ত হার্ট অ্যাটাক ছিল, এখন হার্ট সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। এটা দেখে সঙ্গে থাকা রোগীর মেয়ে ভেবে নেয়, তাঁর বাবা মারা গেছেন এবং হাউমাউ করে কান্নাকাটি শুরু করেন।

এই কনসালট্যান্ট আরও বলেন, ‘আমি যখন ইকোতে দেখলাম হার্টবিট বন্ধ হয়ে গেছে, এটা দেখে আমার ভীষণ খারাপ লাগছিল। চেম্বারের আশপাশে উন্নত চিকিৎসা দেওয়ার মতো কিছুই ছিল না। এখান থেকে যদি পাঠিয়ে দিই, শহরে পৌঁছাতে এবং সিসিইউতে নিতে অনেক সময় লাগবে। আমার মনে হলো, এখনই সিপিআর দিতে হবে।’

সিপিআরের ঝুঁকি গ্রহণ

বিষয়টি আঁচ করতে পেরে রোগীকে তাৎক্ষণিকভাবে সিপিআর দেওয়া শুরু করেন জানিয়ে ডা. হাবিব বলেন, ‘এ ব্যাপারে রোগীর মেয়ের কাছে অনুমতি নিইনি। কারণ এর আগে এক রোগীর স্বজনের কাছে অনুমতি নিতে গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় নষ্ট হয়ে যায়। পরে সিপিআর দিয়ে আর লাভ হয়নি। তাই এবার আমি ঝুঁকি নিলাম। আগেও এমন ঝুঁকি নিয়েছি, আর আলহামদুলিল্লাহ প্রতিবারই রোগী ফিরে এসেছে। তাই এবারও শুরু করলাম। প্রায় পাঁচ মিনিট সিপিআর দেয়ার পরও হৃদস্পন্দন ফিরে এলো না। এ সময় রোগীর মেয়ে আমার পা জড়িয়ে ধরে কান্নাকাটি করে বলছিল, স্যার, বাবাকে বাঁচান। এই অবস্থায় আমি যদি তাঁর জায়গায় থাকতাম, আমিও তাই করতাম।’

তিনি বলেন, ‘পরে চিন্তা করলাম, উনাকে সিসিইউতে পাঠাতে হবে। কিন্তু অ্যাম্বুলেন্সে সেখানে পৌঁছাতে অন্তত ২৫–৩০ মিনিট সময় লাগবে। সিপিআর ছাড়া তো তিন মিনিটও রাখা যায় না। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম, আমি নিজেই অ্যাম্বুলেন্সে উঠবো।’

চেম্বার থেকে বের হয়ে রোগীকে স্ট্রেচারে তুলে অ্যাম্বুলেন্সে উঠেন ডা. হাবিব। অ্যাম্বুলেন্সে স্ট্রেচারের উপর উঠে সিপিআর দিতে দিতে নিয়ে যান তিনি। কিন্তু তখনও কোনো সাড়া-শব্দ নেই। তবে সিপিআর চলমান ছিল। এতক্ষণে অ্যাম্বুলেন্স সাতক্ষীরা ব্লিজ হাসপাতালে পৌঁছায় এবং ইমারজেন্সি বিভাগে নেয়া হয় রোগীকে। সেখানে শুধু একটি ক্যানোলা করে সরাসরি ফাংশনাল সিসিইউতে নেওয়া হয় খোরশেদকে।

সিসিইউ ছিল আটতলায়। লিফটে ওঠার পুরো সময়ও সিপিআর চলতে থাকে। অবশেষে সিসিইউতে নেওয়ার পর রোগীর হার্টবিট ফিরে আসে। সিপিআর দেওয়ার সময় ৩৯ মিনিট কেটে যায়। 

হার্টবিট ফিরে আসার পর ডা. হাবিবসহ অনান্য চিকিৎসকরা দ্রুত প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শুরু করে। যেহেতু রোগী কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে ছিলেন, তাই লাইফ সাপোর্টও দেওয়া হয়। পরে রোগীর স্বজনদের জানানো হয়, রোগীর হার্টবিট ফিরে এসেছে।

সিপিআর ও সিসিইউ নিয়ে কটুকথা

ডা. হাবিব এ চিকিৎসার সময়ের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলন, ‘রোগীকে সিসিইউতে নিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন আশপাশের লোকজন ভিডিও করছিল এবং বলাবলি করছিল, ‘মরা রোগী উঠাচ্ছে।’ আসলে এটা স্বাভাবিক, আমি ডাক্তার না হলে হয়তো আমিও এমনটাই ভাবতাম। আমরা অনেক সময় অন্য পেশার মানুষদের কাজ না বুঝে তাড়াহুড়ো করে মতামত দিই। এই মতামতগুলো আমি ব্যক্তিগতভাবে নিই না।’

তিনি আরও বলেন, ‘সিপিআর দেওয়ার সময় আমি অন্যদিকে তাকানোর সুযোগই পাইনি। কিন্তু কানে আসছিল, মরা রোগীকে সিসিইউতে নিচ্ছে কেন, এখন অনেক টাকা বিল আসবে, মরা মানুষ নিয়ে না, এটা তো দেখেই বোঝা যায় রোগী (বেঁচে) নাই। কেউ কেউ এসে বলছিল, রোগী তো মারা গেছেন। এমনকি রোগীর স্বজন ও বাসার লোকেরাও ধরে নিয়েছিল উনি আর বেঁচে নেই।’

‘আমি যখন লাইফ সাপোর্টের কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলাম, তখন রোগীর স্বজনরা আমাকে বললো, ডাক্তার, আমরা তো শুনেছি উনি আর বেঁচে নেই, তাহলে সিসিইউতে কেন নেওয়া হলো? তখন আমি তাঁদের শান্ত করে বুঝিয়ে বললাম, উনার হার্টবিট ফিরে এসেছে’—যোগ করেন ডা. হাবিব।

ব্লিজ হাসপাতালে সিপিআর চলাকালে ডা. হাবিবের পাশে ছিলেন রাউন্ডে থাকা সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. আরিফ। তিনি তখন বলছিলেন, ‘চালিয়ে যাও।’ ডা. হাবিব জানান, ‘এমন বিপদের সময় তাঁর পাশে থাকা আমার জন্য বড় আশীর্বাদ ছিল।’

লাইফ সাপোর্টের পর থ্রম্বোলাইসিস

লাইফ সাপোর্ট দেওয়ার পর রোগীর থ্রম্বোলাইসিস করার প্রয়োজন হয়। এ প্রসঙ্গে ডা. হাবিব বলেন, ‘বড় হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল। কিন্তু সমস্যা ছিল, এতক্ষণ সিপিআর দেওয়ায় বুকের হাড় সরে যেতে পারে, অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ হতে পারে। তবু আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, ঝুঁকি নেবো। কারণ হারানোর কিছু নেই রোগী ফিরে এসেছে, এখন ওষুধ না দিলে বিপদ আরও বাড়বে। দুই মিনিটের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়ে ওষুধ শুরু করি। পরে সন্ধ্যায় শুনলাম, রোগীর ইতিবাচক সাড়া মিলেছে, তিনি ভালো আছেন।’

পুরো চিকিৎসা প্রকিয়ার মধ্যে রোগীর ব্লাড প্রেসার নিয়ে কিছুটা জটিলতা হয়েছিল বলেও জানান ডা. হাবিব। বলেন, ‘হার্টবিট ফিরে এলেও রক্তচাপ ছিল না। ওষুধ দিয়ে ধীরে ধীরে প্রেসার বাড়ানো হয়। তবে হার্ট ফেইলিউর থাকায় রক্তচাপ বাড়ানোর চেষ্টা করতে গিয়ে সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়। না হলে ফুসফুসে পানি চলে আসতে পারে। ওষুধের মাত্রা নির্ধারণ করে সাবধানে চালিয়ে গেলাম।’

‘রাতভর নিবিড় পর্যবেক্ষণ করা হয়। পরদিন রোগীর রক্তচাপ স্থিতিশীল হয় এবং আমরা লাইফ সাপোর্ট তুলে নেওয়া হয়। তখন সিদ্ধান্ত হয়, রোগী ভালো আছেন এবং দ্রুত রিং পরানো দরকার। পরে তাঁকে খুলনায় পাঠানো হয়। সেখানে দুটি রিং বসানো হয়’—জানান ডা. হাবিব।

রোগীর স্বজনদের কৃতজ্ঞতা

রোগীর স্বজনরা জানান, ‘রোগীকে বাঁচাতে স্যার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে গেছেন, উনার টিম অনেক কষ্ট করেছেন। চিকিৎসকসহ সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তারা।

মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসা খোরশেদ আলী জানান, তিনি এখন সুস্থ আছেন, চলাফেরা করতে পারেন। তবে সামান্য বুকে ব্যথা আছে।

এমইউ/

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
সাত কর্মদিবসের মধ্যে দাবি বাস্তবায়নের আশ্বাসে কর্মবিরতি প্রত্যাহার

ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ভাতা নবম গ্রেডের বেসিক

মাসুদ কামালের প্রতি ড্যাবের হুঁশিয়ারি

ক্ষমা না চাইলে আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে প্রস্তুতি নিন

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক
করোনা ও বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা

এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক