১৬ অগাস্ট, ২০২৫ ০৮:৪৯ পিএম

‘দেশের চিকিৎসকদের স্বাস্থ্যসেবায় আমি পরিতৃপ্ত, সাধারণের অভিযোগ আছে’

‘দেশের চিকিৎসকদের স্বাস্থ্যসেবায় আমি পরিতৃপ্ত, সাধারণের অভিযোগ আছে’
রাজধানীর শহীদ আবু সাঈদ আন্তর্জাতিক কনভেনশন সেন্টারে বিপিএইচসিডিওএ’র অনুষ্ঠানে আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল। ছবি: মেডিভয়েস

মেডিভয়েস রিপোর্ট: দেশের চিকিৎসকদের ভালোবাসাপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল। তিনি সকল নাগরিকের বেলায় এই মানের সেবা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।

আজ শনিবার (১৬ আগস্ট) রাজধানীর শহীদ আবু সাঈদ আন্তর্জাতিক কনভেনশন সেন্টারে বাংলাদেশ প্রাইভেট হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএইচসিডিওএ) নবনির্বাচিত কার্যনির্বাহী কমিটির অভিষেক ও বার্ষিক সাধারণ সভায় এসব কথা বলেন তিনি।

আসিফ নজরুল বলেন, ‘জীবনে কখনো বিদেশে চিকিৎসা নেইনি। কোনো দিন, কখনো নেইনি। মূলত আমার নেওয়ার সামর্থ্যই নেই। যাই হোক। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হচ্ছে, দেশের বেসরকারি হাসপাতালে যখন যাই, দেশে যেখানে চিকিৎসা নিয়েছি, যেই হাসপাতালেই গিয়েছি—খুই ভালো সেবা পেয়েছি। আলহামদুলিল্লাহ, আমি অত্যন্ত পরিতৃপ্ত। আমার কোনো অভিযোগ নেই। তবে আমার কাছে মনে হয়েছে—আমাকে মানুষজন চিনতো। সরকারে আসার আগে আরও বেশি ভালোবাসতো। আমি হাসপাতালে গেলে কোনো ডাক্তার ফিও নিতে চাইতেন না। আমাকে ভালোবেসে তাঁরা অনেক ভালো সেবা দিতেন। কিন্তু সবাই কি এই ভালোবাসাসহ সেবাটা পাচ্ছেন? এটা আমার প্রশ্ন।’

‘আপনারা কিছু মনে করবেন না। আমি যেহেতু টকশোতে নিয়মিত যেতাম, আমার সাথে দেখা হলেই সাধারণ মানুষ কথা বলতো, রাস্তা-ঘাটে, বাজারে সব সময়ই কথা বলতো। আমি মূলত যে কথাগুলো সব সময় শুনতাম, আপনারা হাসপাতালের মানুষজন এখানে আছেন, মালিক আছেন। হয় তো এটি সাধারণ চিত্র না। অনেক হাসপাতালে ভালো সেবা দেওয়া হয়। কিন্তু সাধারণ যে অভিযোগগুলো করা হয়, আমার মনে হয় তা আপনাদেরকে বলা দরকার। তাদের একটি অভিযোগ, ডাক্তার কথা শুনেন না। রোগীর চেহারার দিকে তাকান, তাকিয়ে, ‘হ্যাঁ বলেন’—এটা বলতে বলতে উনি প্রেসক্রিপশন লেখা শুরু করেন। পুরোটা ঠিক মতো শুনেনই না। এই অভিযোগ যে কত জায়গায় শুনেছি!’ 

তিনি আরও বলেন, বাইরে (বিদেশে) যান কেন? প্রশ্ন করলেই সব সময় শুনি, ভাই, বাইরে শান্তি লাগে। (চিকিৎসক) অনেক মন দিয়ে কথা শুনেন। এতো মন দিয়ে শুনেন, এতেই অর্ধেক ভালো হয়ে যাই। আত্মবিশ্বাস চলে আসে। আর আমাদের এখানে যাওয়ার সাথে সাথে ডাক্তার মেজাজ খারাপ করে প্রেসক্রিপশন লিখতে থাকেন। এটা হয়, আপনারা এটি গুরুত্ব সহকারে দেখবেন।’

অনেক চিকিৎসক অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা দেন বলেও মন্তব্য করেন আসিফ নজরুল। নিজের ব্যক্তিগত সহকারীর সঙ্গে এমন আচরণ হওয়ার দৃষ্টান্ত তুলে ধরে বলেন, ‘আমার বাসার গরিব ছেলে যে আমার সাহায্যকারী হিসেবে কাজ করে। সে গিয়েছিল ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে। তাকে ১৪টি টেস্ট দেওয়া হয়েছিল। পরে সে রাগ করে ময়মনসিংহ চলে যায়। টেস্ট ছাড়া সুস্থ হয়ে ফেরত এসেছে। ওখানে পরিচিত ডাক্তার ছিল।’

আইন উপদেষ্টা বলেন, ‘এই অত্যাচার বন্ধ করুন। মানুষ অনেক গরিব। বড়লোকদের গলা কাটেন, সমস্যা নেই। কিন্তু গরিব রোগীদের ১৪-১৫টা টেস্ট দেওয়ার প্রক্রিয়া বন্ধ করান।’

নির্দিষ্ট কোম্পানির ওষুধ কিনতে রোগীদের বাধ্য করা হয় অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘পৃথিবীর কোনো দেশে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধির জন্য ডাক্তারের আলাদা সময় বরাদ্দ থাকে? বলেন তো, আপনারা কি ওষুধ কোম্পানির দালাল? নিজেকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আপনারা?’

বক্তব্যে হাসপাতালের সেবার মান পড়ে যাওয়ার কারণ নিয়ে নিজের অভিমত তুলে ধরেন আইন উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ‘একজন নার্স যদি ১২ হাজার টাকা বেতন পায়, তবে সে কীভাবে মেজাজ ঠিক রেখে ভালো সেবা দেবে?’ এই সমস্যা সমাধানে হাসপাতাল মালিকদের কম মুনাফা করার আহ্বান জানান তিনি।

বিপিএইচসিডিওএর সভাপতি ডা. মোসাদ্দেক হোসেন বিশ্বাস ডাম্বেলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান।

সভায় প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী সায়েদুর রহমান বলেন, ‘বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে অন্যায় মুনাফা করা বন্ধ করতে হবে। আপনারা অনেক টাকা বিনিয়োগ করেন, সেজন্য যুক্তিসঙ্গত মুনাফা অবশ্যই প্রয়োজন। তবে সেটা অন্যায়ভাবে হওয়া উচিত নয়।’

তিনি বলেন, ‘সরকারের পাশে বেসরকারি খাত না দাঁড়ালে স্বাস্থ্যসেবা পুনর্গঠন সম্ভব নয়। আমাদের অঙ্গীকার, দেশের ১৮ কোটি মানুষকে মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরেও মানুষ মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে, এটা আমাদের জন্য লজ্জাজনক।’

প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী বলেন, ‘আমরা অতীতের দুঃখগাথা গাইতে চাই না। এজন্যই একটি পরিকল্পনা জাতির সামনে উপস্থাপন করেছি। দেশের বিভিন্ন স্তরের বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের রূপান্তর ও কাঠামোগত পরিবর্তন দরকার।’

তিনি বলেন, ‘বর্তমানে প্রতিবছর লাইসেন্স নবায়ন করতে হয়, যা ১৫ থেকে ২০ হাজার প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি কঠিন কাজ। এটি যৌক্তিক নয়। লাইসেন্স নবায়নের জন্য একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ নির্ধারণ করা উচিত এবং যথাযথ পরিদর্শনের ব্যবস্থা রাখতে হবে। আমরা ক্রসচেক করে দেখেছি, বর্তমানে পরিদর্শনগুলো যথাযথ হয় না।’

বিপিএইচসিডিওএর সাধারণ সম্পাদক এবং ল্যাবএইড গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. এ এম শামীম বলেন, ‘ভুল চিকিৎসা বা অবহেলায় চিকিৎসক বা হাসপাতাল মালিকদের বিরুদ্ধে গণহারে মামলা ও গ্রেপ্তার না করার অনুরোধ জানাই। তদন্ত করে ব্যবস্থা নিলে আমাদের আপত্তি নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা একটি ডিজিটাল ডেটাবেজ তৈরি করবো, যেখানে সব হাসপাতাল মালিকের তথ্য থাকবে। আমাদের বর্তমানে ২৬০০ সদস্য আছে, শিগগিরই আমরা ৩-৪ হাজার সদস্য করবো। নিবন্ধিত হাসপাতাল ছাড়া কেউ আমাদের সদস্য হতে পারবে না। নিম্নমানের ও নিয়ম না মানা প্রতিষ্ঠানকে আমরা সদস্য করবো না ‘

চিকিৎসা বাবদ বছরে ৪-৫ বিলিয়ন ডলার দেশের বাইরে চলে যায় উল্লেখ করে বক্তারা বলেন, এই ব্যয় নিয়ন্ত্রণে এবং দেশের স্বাস্থ্যসেবার গুণগত মান বৃদ্ধিতে সরকার ও বেসরকারি উদ্যোগ জোরদার করতে হবে।  

দেশে তিন ভাগের দুই ভাগ স্বাস্থ্যসেবা বেসরকারি পর্যায়ে হচ্ছে উল্লেখ করে বক্তারা বলেন, বেসরকারি পর্যায়ে ১২ কোটি মানুষের স্বাস্থ্যসেবা সেবা নিশ্চিত হচ্ছে। দেশে ৯৯ শতাংশ বিশেষায়িত সেবা দেশেই সম্ভব হবে। করোনার সময় এই সক্ষমতা প্রমাণিত হয়েছে।

তারা আরও বলেন, ভয়াবহ এই স্বাস্থ্য দুর্যোগে সর্বপ্রথম দেশের বেসরকারি স্বাস্থ্য খাত এগিয়ে আসে। এই অবদানের কথা দেশ ও দেশের বাইরে বড় পরিসরে আলোচনায় নিয়ে আসতে গণমাধ্যমের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়।

অভিষেক অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ডা. এ এম শামীম।

এমইউ/

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত