উদ্বেগজনক মাত্রার দ্বিগুণের বেশি সীসা ৯৮% শিশুর রক্তে, বুদ্ধিবিকাশে স্থায়ী ক্ষতিতে পড়ার শঙ্কা
মেডিভয়েস রিপোর্ট: সীসা-নির্ভর শিল্প প্রতিষ্ঠান ও এ জাতীয় উৎস থেকে ছড়িয়ে পড়া দূষণে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে রয়েছে শিশু স্বাস্থ্য। উদ্বেগজনক মাত্রা ৩৫ মাইক্রোগ্রাম/লিটারের দ্বিগুণেরও বেশি সীসার দূষণ শিশুদের রক্তে ছড়িয়ে পড়ছে। আর এসব উৎসের এক কিলোমিটারের মধ্যে বসবাসরত শিশুদের রক্তে এর মাত্রা পাওয়া গেছে অন্যদের তুলনায় ৪৩ শতাংশের বেশি।
আজ বুধবার (৬ আগস্ট) আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর, বি) বিশেষ আলোচনায় উপস্থাপিত বেশ কিছু গবেষণা ফলাফলে এমন তথ্য তুলে ধরা হয়।
এতে সীসার দূষণ শিশুদের রক্তে ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। এ অবস্থায় এ দূষণের বিরুদ্ধে এখনই কঠোর পদক্ষেপ না নিলে দেশের লাখ লাখ শিশু বুদ্ধিবিকাশে স্থায়ী ক্ষতির মুখে পড়বে বলে সতর্ক করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, রাজধানীর আশপাশে সীসা-নির্ভর কারখানার এক কিলোমিটারের মধ্যে বসবাসকারী শিশুদের রক্তে সীসার মাত্রা অন্যদের তুলনায় ৪৩ শতাংশ বেশি।
অনুষ্ঠানে ২০২২-২৪ সালের এক গবেষণার প্রাথমিক ফলাফল তুলে ধরেন আইসিডিডিআর, বি-র সহকারী বিজ্ঞানী জেসমিন সুলতানা।
গবেষণায় ৫০০ শিশুর নমুনার ৯৮ শতাংশতে সীসা পাওয়া গেছে, যার মধ্যম মাত্রা ৬৭ মাইক্রোগ্রাম/লিটার। অথচ সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (সিডিসি) মানদণ্ড অনুসারে, উদ্বেগজনক মাত্রা হলো ৩৫ মাইক্রোগ্রাম/লিটার।
গবেষণায় উঠে এসেছে, সীসা-নির্ভর শিল্প প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে লেড-এসিড ব্যাটারি উৎপাদন ও রিসাইক্লিং কারখানা, সীসা গলানোর কেন্দ্র—এই দূষণের প্রধান উৎস। এ ছাড়া বাড়ির ভেতরে ধূমপান, ধূলিকণা, সীসাযুক্ত প্রসাধনী ও রান্নার পাত্র থেকেও শিশুদের শরীরে সীসা ঢুকছে।
২০০৯-২০১২ সালের মধ্যে ঢাকার বস্তি এলাকায় পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, ৮৭ শতাংশ শিশু (দুই বছরের নিচে) রক্তে ৫০ মাইক্রোগ্রাম/লিটার বা তার বেশি সীসা নিয়ে বেড়ে উঠছে। এ ধরনের মাত্রা শিশুর স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক বিকাশে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
এর বিপরীতে আইসিডিডিআর, বি-র গবেষণায় আশাব্যঞ্জক দিকও রয়েছে। তাদের আরেক গবেষণা ফলাফলে বলা হয়, ২০১৯ সালে ৪৭ শতাংশ হলুদে সীসা পাওয়া গেছে। তবে ২০২১ সালে তা প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে।
আইসিডিডিআর, বি-র হেলথ সিস্টেমস অ্যান্ড পপুলেশন স্টাডিজ ডিভিশনের জ্যেষ্ঠ পরিচালক সারাহ স্যালওয়ে বলেন, ‘সীসা দূষণ বাংলাদেশের একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা, যা প্রায়ই আমাদের নজর এড়িয়ে যায়। বিশেষ করে দূষণ সৃষ্টিকারী কারখানার আশপাশের শিশুরা এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী।’
যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও আইসিডিডিআর, বির সাবেক পরিচালক স্টিভ লুবি বলেন, ‘সীসা শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। এটি শুধু বর্তমান প্রজন্ম নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্ভাবনাও ধ্বংস করে দিতে পারে।’
সীসা বাতাস, খাবার, ধূলিকণা এমনকি গর্ভাবস্থায় প্লাসেন্টা থেকে শরীরে ঢুকে পড়ে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে উৎসগুলো বন্ধ করতেই হবে।
প্রকল্প সমন্বয়ক মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, সীসা দূষণের প্রধান উৎস হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ব্যাটারি কারখানা, সীসাযুক্ত রঙ, প্রসাধনী ও রান্নার পাত্র।
এ ব্যাপারে অনতিবিলম্বে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দেন ইসিডিডিআর, বির নির্বাহী পরিচালক তাহমিদ আহমেদ। বলেন, ‘সীসার বিষক্রিয়া নীরবে আমাদের শিশুদের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা কেড়ে নিচ্ছে। এটি তাদের মস্তিষ্কের পরিপূর্ণ বিকাশ বাধাগ্রস্ত করে এবং পুষ্টির ঘাটতি সৃষ্টি করে, যা বাংলাদেশের ভবিষ্যতকেই পিছিয়ে দেবে।’
‘আমাদের দৃঢ় সংকল্প নিয়ে সীসা নিঃসরণকারী উৎসগুলো বন্ধ করতে হবে, যাতে প্রতিটি শিশু সুস্থ ও বুদ্ধিদীপ্ত হয়ে বেড়ে উঠতে পারে’—যোগ করেন তিনি।
এমইউ/