স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে অভিযানে মেডিকেল ইন্সপেক্টর থাকতে হবে: অধ্যাপক সায়েদুর রহমান
মেডিভয়েস রিপোর্ট: ডায়াগনস্টিক ও চিকিৎসাসেবার জন্য প্রশাসনের সঙ্গে মেডিকেল ইনস্পেক্টর থাকা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমান। একই সঙ্গে রেফারেল ব্যবস্থা সংস্কার করা উচিত বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (১৭ এপ্রিল) রাজধানীর চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে তিন দিনব্যাপি ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ডায়াগনস্টিক মেডিকেল ইক্যুইপমেন্ট এক্সপোর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অধ্যাপক সায়েদুর রহমান বলেন, চিকিৎসা ক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেসি সেক্টরটি খুবই জটিল। ডায়াগনস্টিক ও চিকিৎসাসেবার জন্য প্রশাসনের সঙ্গে মেডিকেল ইন্সপেক্টর থাকতে হবে।
এ সময় ডায়াগনস্টিকের ক্ষেত্রে একই মেশিন বেসরকারি ও সরকারি ক্ষেত্রে একরকম হয় না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। স্বাস্থ্যসেবার যন্ত্রপাতির দাম নিয়েও প্রশ্ন উত্থাপন করেন বিশেষ সহকারী। বলেন, বাংলাদেশের সবকিছুর দাম যদি জানা যায়, তাহলে স্বাস্থ্যের যন্ত্রপাতির দাম জানা যাবে না কেন?
সরকারি হাসপাতালে ফার্মেসি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ উল্লেখ করে তিনি বলেন, বেসরকারি হাসপাতালগুলোতেও যেন ফার্মেসি থাকে। তবে সেটা যেন ওষুধের দোকান হয়ে না ওঠে। একই সাথে লিকুইড ডিসপোজাল (তরল বর্জ্য অপসারণ) গাফিলতি কেন হচ্ছে সেটা দেখা উচিত।
সায়েদুর রহমান বলেন, সব ধরনের রেইডে স্বাস্থ্য ইন্সপেক্টর থাকা উচিত। সঙ্গে রেফারেল সিস্টেম ঠিক করা উচিত। একজন ডাক্তার দিনে একশ রোগী দেখবেন, এটা যেমন ঠিক নয়, আবার রোগীরাও এতে বিরক্ত হয়। এখানে আন্তঃযোগাযোগ ঠিক করে নিয়মের মধ্যে আনতে হবে।
অ্যাম্বুলেন্স সেবা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে উল্লেখ করে বলেন, এখানে (স্বাস্থ্যসেবায়) যারা গাড়ি চালান তারা কতটুকু প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত? তারা ঠিকঠাক সেবা দেওয়ার সামর্থ্য রাখেন কি না সেটা জানতে হবে। চিকিৎসার শুরুটাই হয় অ্যাম্বুলেন্স সেবার মাধ্যমে। নয়তো এটা কেবল একটা মাইক্রোবাস হয়ে উঠবে।
বাংলাদেশের চিকিৎসাসেবাকে বিকেন্দ্রীকরণ করার বিষয় তিনি বলেন, চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলো কেন্দ্রীকৃত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা হয়ে গেছে। ঢাকায় বিভিন্ন হাসপাতাল রয়েছে, ভালো সেবা দিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু নীলফামারী বা ঠাকুরগাঁওয়ের কোনো রোগী হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক করলো, তাকে সিপিআর দিয়ে বাঁচানো হলেও ঢাকা পর্যন্ত আসতে অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। তাই ভালো চিকিৎসার জন্য অবশ্যই জেলা শহরগুলোতেও চিকিৎসাসেবার মান ভালো করতে হবে। তাই সারাদেশেই বিকেন্দ্রীকৃত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা করতে হবে।
অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধান অতিথি বলেন, বিশেষায়িত হাসপাতাল যেমন— ক্যানসার হাসপাতালের সঙ্গে অন্যান্য সাধারণ হাসপাতালের পার্থক্য থাকবে। এগুলোতে আইনি প্রতিফলন থাকা দরকার। যখন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ পরিদর্শন করবে, তখনও যেন এই প্রতিফলন দেখা যায়। উন্নত দেশসহ আশেপাশের দেশগুলোতে এমন নিয়ম আছে। এই বিশদ কাজগুলো যেন হয়, এজন্য অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল থাকা জরুরি। মেডিকেল কলেজ নিয়ে অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল ইতোমধ্যে কাজ করছে। তারা সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নির্বিশেষে মেডিকেল কলেজ করার পক্ষে কাজ করে যাচ্ছে। আমিও ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এখানে প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি-বেসরকারি হওয়া উচিত না। এটি আইনি প্রক্রিয়ায় আনা দরকার।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিশেষ অতিথি এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. হাফিজুর রহমান, বৈষম্যবিরোধী সংস্কার পরিষদের আহ্বায়ক জাকির হোসেন নয়ন, বিপিএইচসিডিওএর মহাসচিব ডা. মইনুল আহসানসহ আরও অনেকে।
মেলায় চীন, জাপান, পাকিস্তান, ভারত, কোরিয়া ও বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশ থেকে প্রায় দুই শতাধিক মেডিকেল ইক্যুইপমেন্ট প্রস্তুতকারক কোম্পানি তাদের পণ্য প্রদর্শন করেন।
জানা যায়, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতে ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে মাথাপিছু খরচ দাঁড়াবে আনুমানিক ৬০ ডলার। যা ২০২০ সালের তুলনায় ১৭.৬৫% বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
গত দুই দশকে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামোর উল্লেখযোগ্য সম্প্রসারণ ঘটেছে। নিবন্ধিত বেসরকারি হাসপাতালের সংখ্যা চারগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। যা এক হাজার ১২৫ থেকে চার হাজার ৪৫২ এ পৌঁছেছে। ক্লিনিকগুলোর সংখ্যা তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়ে ৪১১ থেকে বেড়ে এক হাজার ৩৯৭, ডেন্টাল ক্লিনিকগুলোতে প্রায় সাতগুণ বৃদ্ধি পেয়ে ১২২ থেকে ৮৩৯ টি হয়েছে। অন্যদিকে, ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো ছয়গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, ১৭৭৮ থেকে বেড়ে ১০,২৯১টি হয়েছে।
এছাড়াও প্রতিবছর চিকিৎসা ব্যায় আনুপাতিক হারে বাড়ছে। ২০২০ সালে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় ছিল ৫১ ডলার, যা ২০১৯ সালের তুলনায় ৬.২৯% বেশি। ২০১৯ সালে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় ছিল ৪৮ ডলার, যা ২০১৮ সালের তুলনায় ছয় দশমিক ৫৩ শতাংশ বেশি। ২০১৮ সালে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় ছিল ৪৫ ডলার, যা ২০১৭ সালের তুলনায় পাঁচ দশমিক ৮৪% বেশি। ২০১৭ সালে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় ছিল ৪২ ডলার, যা ২০১৬ সালের তুলনায় ছয় দশমিক ৮৭% বেশি। প্রতিবছর এভাবেই স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় বাড়ছে।
এই মেলায় সেমিনার এবং নির্মাতাদের সঙ্গে সরাসরি ব্যবসায়ী থেকে ব্যবসায়ী এবং ব্যবসায়ী থেকে কাস্টমার যোগাযোগের ব্যবস্থা রয়েছে। যেখানে অংশগ্রহণকারীরা ডায়াগনস্টিক চিকিৎসা সরঞ্জাম খাতে আধুনিক প্রযুক্তি ও এর ব্যবহার এবং নবনির্মিত প্রযুক্তি সম্পর্কে জানতে পারবেন, সঙ্গে বাজার সম্ভাবনাও প্রসারিত হবে।
আয়োজকদের তথ্যমতে, ঢাকা আন্তর্জাতিক ডায়াগনস্টিক মেডিকেল ইক্যুইপমেন্ট এক্সপো- ২০২৫ হলো সর্বশেষ আধুনিক প্রযুক্তি, সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং ডায়াগনস্টিক মেডিকেল ইক্যুইপমেন্ট সেক্টরের প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। এটি স্বাস্থ্যসেবার জন্য একটি স্বাস্থ্যকর এবং প্রযুক্তিতে উন্নত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নেওয়ার যাত্রায় বিশেষ ভূমিকা রাখবে। তিন দিনব্যাপী এই মেলা আগামী ১৯ এপ্রিল সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত চলবে।
এমআই/এনএআর/