চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীদের সংগঠনগুলোর সম্মিলিত প্রয়াস ইউমব
মেডিভয়েস রিপোর্ট: স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতিকরণে চিকিৎসক ও মেডিকেল শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত সংগঠন ইউনাইটেড মেডিকেল অরগাইজেশন অব বাংলাদেশের (ইউমোব) আত্মপ্রকাশ করেছে। শনিবার (৫ অক্টোবর) বিকাল ৩টায় রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) শহীদ ড. শামসুল আলম খান মিলন সভাকক্ষে আয়োজিত সভায় সম্মিলিত এ সংগঠনের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।
ইউমোব’র আনুষ্ঠানিক যাত্রা এবং স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষায় গৃহীত কর্মসূচি ঘোষণা শীর্ষক এই আলোচনা সভায় উপস্থিতি ছিলেন চিকিৎসক ও মেডিকেল শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
সংগঠনটির ২০ সদস্যবিশিষ্ট সেন্ট্রাল কোলাবোরেশন টিম ঘোষণা করেন ভাস্কুলার সার্জন ও বাংলাদেশ ভাসকুলার সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক ডা. সাকলায়েন রাসেল।
এ সময় তিনি বলেন, ‘আমরা এখনও ইউনাইটেড হইনি। ইউনাইটেড হওয়ার জন্য আজ এখানে বসেছি। বিএমএকে কার্যকর না করা পর্যন্ত এই সংগঠনকে চিকিৎসকদের অধিকার সংক্রান্ত সকল বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে।
বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশনকে সক্রিয় রাখতে ইউমোবকে আরও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, একই সঙ্গে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলকেও (বিএমডিসি) ঢেলে সাজাতে তাদের উদ্যোগী হতে হবে।
প্রতিনিধিদের উদ্দেশ্যে এই চিকিৎসক বলেন, বড়দের দিকে তাকিয়ে থাকবেন না। এ দেশ স্বাধীন করেছে জুনিয়ররাই। চেষ্টা করলে এই জায়গায় অনেক ভালো করার সম্ভাবনা রয়েছে।
স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইনের খসড়ায় চিকিৎসকদের যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তার সমালোচনা করেন ডা. সাকলায়েন। বলেন, চিকিৎসকের ওপর হামলার বিচারের ক্ষেত্রে এই আইনের পরিপূর্ণ নির্দেশনা নেই।
এ সময় মেডিকেল জার্নালিজমের প্রয়োজনীয়তা ব্যক্ত করেন ডা. সাকলায়েন। বলেন, চিকিৎসকদের ইতিবাচক সংবাদগুলো আরো গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ করতে সকলের আন্তরিকতার বিকল্প নেই।

সভায় অন্যতম অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক (হাসপাতাল) ডা. জয়নাল আবেদীন টিটো। তিনি তার বক্তব্যে চিকিৎসকদের উদ্দেশ্য করে বলেন, চিকিৎসা দেওয়ার সময় রোগীর জায়গায় নিজেকে দাঁড় করিয়ে চিকিৎসা দিন। মানুষ মেধার ওপর ভিত্তি করে কাউকে মূল্যায়ন করে না, বরং মূল্যায়ন করে ব্যবহার আর অবদানের ওপর। এ জন্য চিকিৎসকদের সর্বাপেক্ষা মানবিক হতে হবে।
নিজেদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি না করার পরামর্শ দিয়ে নতুন সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও মেডিকেল শিক্ষার্থীদের তিনি বলেন, সকলের সাথে যোগাযোগের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। নেগোসিয়েশন বাড়ানোর চেষ্টা করতে হবে।
চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য ওষুধ কোম্পানি ও স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোর প্রলোভন বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এই স্বাস্থ্য প্রশাসক। বলেন, ‘যেসব ওষুধ কোম্পানি এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টার চিকিৎসক, নার্স ও পল্লী চিকিৎসকদের কমিশন অফার করে, তাদের শাস্তির আওতায় আনা উচিত। প্রয়োজনে লাইসেন্স স্থগিত করা যেতে পারে।’
হাসপাতালগুলোর সেবার মান বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে ক্লিনিকগুলোতে ১০ শয্যার বিপরীতে অন্তত তিনজন চিকিৎসক নিশ্চিতে ইউএমওবি নেতৃবৃন্দকে সরকারের সাথে সমন্বয় করে কাজ করারও আহ্বান জানান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এই উপপরিচালক।
ইউনাইটেড মেডিকেল অরগাইজেশন অব বাংলাদেশ (ইউএমওবি) নামে নতুন এই সংগঠনটির সেন্ট্রাল কোলাবোরেশন কমিটির মুখপাত্র হিসেবে রয়েছেন ডা. মোবারক হোসাইন। বাকি ১৯ সদস্যরা হলেন—ডা. এস এম মামুন, ডা. মিনহাজুল আবেদিন, ডা. জাবির হোসেন, ডা. হাসান মামুন, ডা. দীপ্ত মজুমদার, ডা. তারেক জামিল বাসেদ, ডা. মাহমুদুর রহমান চৌধুরি, ডা. ইমরান ইবনে নাসির, ডা. মাহিদুর রহমান সাদ, ডা. তারেক কাওসার, ডা. সাইফুল এইচ সাকিব, ডা. শরীফ মোহাম্মদ ফয়সাল, ডা. সাজ্জাদ হোসেন, ডা. তানভীর মেহেদী, ডা. রিফাত মাহবুব, মবিন ইবনে মোকবুল, ফারহা ব্রুতি, মোহসিনা তানজিম ও মেহেদী হাসান।
নতুন এই সংগঠনের সদস্য ও রিদম ব্যাংলাদেশের সভাপতি এসএম মামুনের উপস্থাপনায় অনুষ্ঠানে সংগঠনটি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ও গঠনপ্রণালী তুলে ধরেন এর মুখপাত্র ও ডক্টরস ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ডা. মোবারক হোসাইন।

ডা. মোবারক বলেন, ‘আগের সরকারের পরিবর্তনের পর সবাই যখন কথা বলছে, তখন চিকিৎসকরা নিশ্চুপ। এই খাতে কাজ করতে চিকিৎসক বা শিক্ষার্থীদের সাপোর্ট দেওয়া মানুষের অভাব না থাকলেও, একডেমিক চাপের কারণে বিভিন্ন কাজে সক্রিয় থাকা সম্ভব হয় না। স্বাস্থ্য খাতে সংস্কার করার মন থাকলে আমাদের এক হওয়াটা বেশি জরুরি।’
এ সময় স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আইন সংস্কারে তরুণ প্রতিনিধি না থাকার সমালোচনা করেন তিনি। ছাত্র সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রত্যেক মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের স্ব স্ব প্রশাসনকে দাবি পেশ করারও ব্যাপারেও তাগিদ দেন।
অনুষ্ঠানে সংগঠনটির কার্যক্রমের বিষয়ে কথা বলেন অন্যতম সদস্য ও ঢামেক ইন্টার্ন ডক্টরস সোসাইটির নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক ডা. রিফাত মাহবুব। সম্প্রতি ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসকদের ওপর হামলার বিষয়টি তুলে ধরে চিকিৎসকদের সুরক্ষা নিশ্চিতে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন তিনি।
রিফাত মাহবুব বলেন, চিকিৎসক ও মেডিকেল শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সমস্যা, দাবি ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে কাজ করতেই এই সংগঠনের আত্মপ্রকাশ।
একাধিক গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, ৬৭ শতাংশ খারাপ কথা বা গালির মাধ্যমে হয়রানির শিকার হন এ দেশের চিকিৎসকরা এবং ১৩ শতাংশ সরাসরি শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। এ ছাড়া সারাবিশ্বে ৬২ শতাংশ চিকিৎসক বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
এ সময় মেডিকেল শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থেকে কলেজের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের ডিগ্রির গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করা, শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য বিবেচনায় প্রতিষ্ঠান ও সরকারকে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের পরামর্শ প্রদান, কারিকুলাম আধুনিকায়ন ও স্বাস্থ্যখাত সংস্কারে ভূমিকা রাখা এবং হাসপাতালের সিন্ডিকেট ও দালালচক্র রোধে এই সংগঠনকে কাজ করার পরামর্শ ব্যক্ত করেন।
এনএএন/এমইউ