০৪ জুলাই, ২০২৪ ০৮:৩৪ এএম

কোর্সে যুক্ত হতে জটিলতা: হতাশ কয়েকশ’ এফসিপিএস প্রশিক্ষণার্থী

কোর্সে যুক্ত হতে জটিলতা: হতাশ কয়েকশ’ এফসিপিএস প্রশিক্ষণার্থী
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পছন্দের ইনস্টিটিউটে যুক্ত হতে না পারা প্রশিক্ষণার্থীরা স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানগুলোতে এখনও যুক্ত হতে পারেন। এতে কোনো বাধা নেই। ছবি: মেডিভয়েস

মেডিভয়েস রিপোর্ট: স্লটে নির্দিষ্ট সংখ্যার অতিরিক্ত প্রশিক্ষণার্থী গ্রহণ না করার নিয়ম বাস্তবায়নের কারণে পছন্দের ইনস্টিটিউটে কোর্সে যুক্ত হতে জটিলতায় পড়েছেন বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ান্স এন্ড সার্জন্সের (বিসিপিএস) এফসিপিএস প্রশিক্ষণার্থীরা। এতে হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তারা। প্রশিক্ষণার্থীরা বলেন, তাৎক্ষণিক নোটিসে একটি নিয়ম কার্যকর করায় শিক্ষার্থীরা পছন্দের প্রতিষ্ঠানে কোর্সে যুক্ত হতে পারছেন না। তা ছাড়া সময় অতিবাহিত হওয়ায় বিকল্প প্রতিষ্ঠানও তাদের গ্রহণ করছে না। এমতাবস্থায় তারা কোর্সে পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

তবে বিসিপিএস বলছে, কোনো কোনো ইনস্টিটিউটে চাহিদার বহুগুণ বেশি চিকিৎসক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছেন। এতে তাদের প্রশিক্ষণের গুণগত মান ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে অনেক স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানে চলছে প্রশিক্ষণার্থীর সংকট। এ কারণে এসব প্রতিষ্ঠানে গুণগত সেবা দেওয়া দুরুহ হচ্ছে। পছন্দের প্রতিষ্ঠানে যুক্ত হতে না পারা চিকিৎসকরা স্বীকৃত এসব প্রতিষ্ঠানে যুক্ত হতে পারেন। কয়েক দিন পার হয়ে গেলেও তাদের কোর্সে যুক্ত হতে কোনো বাধা নেই।

যে বিজ্ঞপ্তিতে বাধে বিপত্তি

গত ২৭ জুন বাংলাদেশ কলেজ বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ান্স এন্ড সার্জন্সের এ সংক্রান্ত এক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, ‘এতদ্বারা বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ানস্ এন্ড সার্জনস্ (বিসিপিএস)-এর বেসরকারি/অবৈতনিক প্রশিক্ষণার্থীদের কলেজ কর্তৃক স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানসমূহে প্রতিটি ইউনিট/বিভাগে সবোর্চ্চ সংখ্যক প্রশিক্ষণার্থী প্রশিক্ষণ গ্রহণের সংখ্যা নির্ধারণ করা রয়েছে (বিসিপিএস-এর নীতিমালা অনুযায়ী প্রতি প্রশিক্ষকের জন্য নির্ধারিত সংখ্যক প্রশিক্ষণার্থী দেওয়া হবে। (দশ বেড এর একটি ইউনিটে প্রশিক্ষণার্থীর সংখ্যা হবে সর্বাধিক পাঁচ জন এবং একসঙ্গে এক বৎসরে এ সংখ্যা হবে সর্বাধিক ১৬ জন। দশ বেড এর অধিক একটি ইউনিটে প্রশিক্ষণার্থীর সংখ্যা সর্বাধিক আট জন এবং একসঙ্গে বৎসরে এ সংখ্যা হবে সর্বাধিক ২০ জন)। কিন্তু সম্প্রতি পরিলক্ষিত হচ্ছে যে, কলেজ কর্তৃক স্বীকৃত অনেক প্রতিষ্ঠান/বিভাগে এ নির্ধারিত প্রশিক্ষণার্থীর সংখ্যা অনুসরণ করা হচ্ছে না।’

‘অতএব, যে সকল প্রতিষ্ঠান/বিভাগসমূহে অতিরিক্ত প্রশিক্ষণার্থী রয়েছে, সে সকল প্রতিষ্ঠানে জুলাই ২০২৪ থেকে ডিসেম্বর ২০২৪ এর স্লটে নতুন কোনো প্রশিক্ষণার্থী প্রবেশের সময় কলেজের নীতিমালা অনুসরণ করে প্রশিক্ষণার্থীর সংখ্যা সমন্বয় করার জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো’—যোগ করা হয় বিজ্ঞপ্তিতে। 

এতে আরও বলা হয়েছে, ‘ইতোপূর্বে যোগদানকৃত প্রশিক্ষণার্থীগণ যাঁরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান/বিভাগে প্রশিক্ষণরত আছেন এবং প্রশিক্ষণ বর্ধিতকরণের জন্য আবেদন করে যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্বাচিত হয়েছেন, তাঁরা এ নির্দেশনার আওতাধীন হবেন। এ আদেশ অনতিবিলম্বে কার্যকর হবে।’

বিসিপিএস সচিব অধ্যাপক আবুল বাশার মো. জামাল স্বাক্ষরিত ওই বিজ্ঞপ্তি বিসিপিএস সভাপতি, জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি এবং পরীক্ষা কমিটির চেয়ারম্যান, কোষাধ্যক্ষ, অনারারি পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, আরটিএম বিভাগের অনারারি পরিচালক, স্কিল ডেভেলপমেন্ট বিভাগের অনারারি পরিচালক, কোর্স স্বীকৃত সকল মেডিকেলের কলেজ হাসপাতালের অধ্যক্ষ ও পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।

বিপাকে প্রশিক্ষণার্থীরা

সহসা জারি করা এই বিজ্ঞপ্তির কারণে কোর্সে যুক্ত হতে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন প্রশিক্ষণার্থী চিকিৎসা। তারা বলেন, যৌক্তিক সময় আগে বিজ্ঞপ্তিটি দেওয়া হলে তারা বিকল্প পছন্দের ইনস্টিটিউটে অনায়াসে যুক্ত হতে পারতেন। কিন্তু সময় শেষ হয়ে যাওয়ায় এখন এসব প্রতিষ্ঠানও তাদের গ্রহণ করছে না। 

এ প্রসঙ্গে ঢাকা মেডিকেল কলেজের গ্যাস্ট্রো এন্টারলজি বিভাগের পার্ট-২ এর এক প্রশিক্ষণার্থী মেডিভয়েসকে বলেন, ‘জুলাই ২০২৩ সালে এফসিপিএস পার্ট-১ সম্পন্ন করি। দেড় বছরের কষ্টসাধ্য পরিশ্রমের মাধ্যমে এটা সম্ভব হয়। আমি রেসিডেন্সি, নন-রেসিডেন্সিসহ অন্যান্য কোর্সগুলোর চেয়ে এফসিপিএস পার্ট-১ কে অধিক গুরুত্ব দিয়েছিলাম। এর মূল কারণ, পছন্দ অনুযায়ী যে কোনো ইনস্টিটিউশনে পড়াশোনার সুযোগ পাবো। শিক্ষার্থীর পছন্দ অনুযায়ী যেকোনো ইনস্টিটিউশন বেছে নেওয়ার ব্যাপারে বিসিপিএসের বাধা নেই। কোর্সে প্রবেশের পর ছয় মাস চালিয়েছিলাম। কিন্তু টাকা পয়সার সংকটের কারণে পরের ছয় মাস চালাতে পারিনি।’

জুলাই সেশনে কোর্সে জয়েন করার জন্য আবেদন করার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এ সময় বিসিপিএস স্বীকৃত প্রত্যেক প্রতিষ্ঠান থেকে কোর্সে জয়েন করার বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। সেই অনুযায়ী আমরা আবেদন করি। আমাদের ভাইভা পরীক্ষা হয়। এর আলোকে একটি চূড়ান্ত তালিকাও দেওয়া হয়। এতে ঢাকা মেডিকেল কলেজে আমার নাম আসে। অন্য মেডিকেল কলেজেও দিয়েছিলাম, সেখানেও এসেছিল। জুলাইয়ের এক তারিখ থেকে জয়েন করার কথা। আমার ইউনিটে ১৫ নম্বরে আমার নাম আসে। যথারীতি ইউনিট থেকে ফোনে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। সেই সঙ্গে মেসেজও পাঠানো হয় যে, ১ জুলাই এই ইউনিটে জয়েন করুন। যেহেতু ঢাকা মেডিকেল কলেজে আমার নাম এসেছে, সেহেতু সলিমুল্লাহ এবং সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজকে আমি না করে দেই। আমার মতো অনেকেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নাম এলেও অনেকেই না করে দেয়। যেহেতু তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজে প্রশিক্ষণের সুযোগ হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘১ জুলাই তারা ঢাকা মেডিকেল কলেজে জয়েন করতে যান এবং বিভাগীয় প্রধানের সঙ্গে কথা বলেন, রাউন্ডেও যান। কিন্তু ওই দিন সকাল এগারোটার দিকে হঠাৎ বিসিপিএস থেকে একটি নোটিস আসে, যেখানে বলা হয়—যারা নতুন জয়েন করেছে, তারা কোর্সে যুক্ত হতে পারবে না। নোটিসটি তাদের জন্য প্রযোজ্য। এতে তারা সমস্যায় পড়েছেন। তবে যারা পারবর্তী সেশনে বর্ধিতকরণের জন্য আবেদন করেছে তাদের কোনো সমসা হয়নি।’

ওই শিক্ষার্থী জানান, তার মতো অনেকে আর্থিকভাবে সংকটাপন্ন হওয়ার কারণ ছয় মাস কোর্স চালাতে পারেননি। তারা আর্থিক সংকট কাটিয়ে ওঠার পর প্রশিক্ষণের জন্য এসেছেন, কিন্তু এসে কোর্সে যুক্ত হতে বাধার মুখে পড়েছেন।

‘ঢামেকে বাধার মুখে পড়ে, ছুটে গেলাম সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজে, তখন তারা জানালো ওখানেও সিট ফাঁকা নেই’—যোগ করেন তিনি।

জটিলতায় পড়ছেন পার্ট-১ পাস করা প্রশিক্ষণার্থীরা

এ রকম অনিশ্চয়তায় পড়ে গভীর হতাশ করেছেন একাধিক প্রশিক্ষণার্থী। তারা জানান, বিষয়টি নিয়ে তারা ইউনিট-টু এর প্রধান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. আসাদুল কবিরের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি তাদের জানালেন, নতুন কোনো প্রশিক্ষণার্থী নেওয়ার সুযোগ নেই। নতুন করে যারা পার্ট-১ পাস করবে, তারাও একই জটিলতায় পড়বেন।

শিক্ষার্থীরা বলেন, তারা পরিবারসহ সকল কিছু ব্যবস্থা করে প্রশিক্ষণ চালাতে এসেছেন। কিন্তু অকস্মাৎ এই নোটিসে তাদের সকল পরিকল্পনা গভীর সংকটে পড়ে গেল। পোস্ট গ্রেজুয়েশন করার সিদ্ধান্তটি মারাত্মক ভুল ছিল বলেও মন্তব্য তাদের।

অনিশ্চয়তায় প্রায় পাঁচশ’ প্রশিক্ষণার্থী

জানা গেছে, বিসিপিএসের নোটিসের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ২০৫ জন এফসিপিএস পার্ট-২ প্রশিক্ষণার্থীকে কোর্সে যুক্ত না করে অপেক্ষমাণ তালিকায় রেখে দেওয়া হয়। এ রকম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন বিভিন্ন মেডিকেল কলেজের আরও প্রায় তিন’ প্রশিক্ষণার্থী। 

বিসিপিএসের বক্তব্য

জানতে চাইলে বিজ্ঞপ্তির বিষয়টি নতুন নয় উল্লেখ করেন বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ান্স অ্যান্ড সার্জন্সের (বিসিপিএস) সচিব অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মো. জামাল। বুধবার (৩ জুলাই) দুপুরে তিনি মেডিভয়েসকে বলেন, ‘বহুদিন ধরে বিসিবিএসের ওয়েবসাইটে এ ধরনের নির্দেশনা আছে। ২০১৪ সালে আমরা এ নিয়ম করেছি যে, একটা ইউনিটে সর্বোচ্চ আটজন প্রশিক্ষণ প্রার্থী থাকবে। আর দুইটার মিলে ১৬ জন। খুব বড় প্রতিষ্ঠান হলে যেমন—ঢাকা মেডিকেল কলেজ, এখানে সর্বোচ্চ ২০ জনকে অনুমোদন অনুমোদন করি। কিন্তু আমরা লক্ষ্য করেছি, অনেক ইউনিটে পঞ্চাশের অধিক প্রশিক্ষণার্থী থাকে। এতে প্রশিক্ষণ মান হারাচ্ছে। এ নিয়ে আমরা আগেও নোটিস করেছি, সতর্ক করেছি। কিন্তু কোনো ফল আসেনি। এবার আমরা বাধ্য করলাম।’

ঢাকায় যেসব ইনস্টিটিউটে কোর্স স্বীকৃত

ঢাকার ভেতরে একাধিক ইনস্টিটিউটের প্রশিক্ষণ স্বীকৃত উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সলিমুল্লাহ, সোহরাওয়ার্দী ও মুগদা মেডিকেল কলেজ, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, সরকারি কর্মচারী হাসপাতাল, পুলিশ হাসপাতাল—এসব প্রতিষ্ঠানে মেডিসিন, গাইনিসহ সব সাবজেক্টে প্রশিক্ষণ নেওয়া সম্ভব। আমরা বলেছি, যেসব জায়গায় খালি আছে—সেখানে সংযুক্ত হতে।’

এ ব্যাপারে সরকারও গুরুত্ব দিচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, যেখানে দরকার নেই, সেখানে অনেক প্রশিক্ষণার্থী। আবার যেখানে প্রয়োজন সেখানে শূন্য। এতে রোগীরা পরিপূর্ণ সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। 

এখনো বিভিন্ন ইনস্টিটিউটে কোর্সে যুক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে জানি তিনি বলেন, ‘তারা চাইলে ছয় মাস পরে যুক্ত হতে পারে। আমরা প্রশিক্ষণার্থীদের তিনবার কোর্স স্থগিত রাখা অনুমোদন করি। কিন্তু আমরা চাই, যেসব প্রতিষ্ঠানে ফাঁকা রয়েছে সেখানে তারা আজই যুক্ত হোক। এ ক্ষেত্রে আমরা এক সপ্তাহ, দুই সপ্তাহ, দশ দিন—এ রকম বিলম্বে আসা প্রশিক্ষণার্থীদের অনুমোদন করি।’

এখন যদি তারা ফাঁকা প্রতিষ্ঠানে কোর্সে যুক্ত না হয়, তাহলে ভুল হবে উল্লেখ করে বিসিপিএস সচিব বলেন, আগামী বছর ঢাকা মেডিকেল কলেজে সুযোগ পাবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। 

এমইউ/

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত