গোলটেবিল আলোচনা সভায় বক্তারা
স্যানিটেশন ও হাইজিন অব্যবস্থাপনায় ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বাড়ছে
মেডিভয়েস রিপোর্ট: বর্তমানে দেশে স্যানিটেশন ও হাইজিন ব্যবস্থা সুষ্ঠুভাবে পালিত না হওয়াতে ডেঙ্গু’র প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। এটি রোধ করতে প্রয়োজন জনগণের সচেতনতা এবং সেই লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের উপর গুরুত্বারোপ করেন তারা।
আজ সোমবার (২৪ জুলাই) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে ‘পানি, স্যানিটেশন ও জলবায়ু পরিবর্তনে ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাব এবং করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনা সভায় তারা এসব কথা বলেন।
বৈঠকটি যৌথভাবে আয়োজন করে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন অব দি রুরাল পুয়র (ডরপ) এবং ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (ডিআইইউ)।
আলোচনায় সভায় সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও ডরপ-এর নির্বাহী উপদেষ্টা মো. আজহার আলী তালুকদার সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী এমপি। এতে আরও উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (হাসপাতাল এবং ক্লিনিক শাখা) ডা. শেখ দাউদ আদনান, বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি রাশেদ রাব্বি। সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিআইআইএসএস’র গবেষণা পরিচালক ড. মাহফুজ কবীর। সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ওপর আলোচনা করেন সিপিআরডি’র প্রধান নির্বাহী মো. শামসুদ্দোহা, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক প্রধান কীটতত্ত্ববিদ মো. খলিলুর রহমান।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন ডরপ-এর উপ-নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ যোবায়ের হাসান। তিনি বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা জরুরি অবস্থায় পৌঁছে গেছে। তাই এ সংকট নিরসনে করণীয় নির্ধারণের জন্য সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে আজকের গোলটেবিল আলোচনা আয়োজন করা হয়েছে। বিশ্বের প্রায় ৫০ শতাংশ লোক ডেঙ্গু ঝুঁকিতে আছে। আমরা কম কার্বণ নিসরন করেও জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য অধিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছি।’
মূল প্রবন্ধে মাহফুজ কবীর বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন, নিরাপদ পানির সংকট এবং অকার্যকর ভেক্টর কন্ট্রোল স্ট্র্যাটেজির কারণে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং তার প্রভাবে ডেঙ্গুজ্বরের প্রকোপ বাড়ে। ভাইরাসটির সুপ্ত থাকার প্রবণতাও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পালটে যাচ্ছে। এর পরিণামে আমরা বাংলাদেশেও ডেঙ্গু পরিস্থিতির ক্রমশ অবনতি দেখতে পাচ্ছি। যতই ঢাকার তাপমাত্রা বাড়বে ততই ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে যাওয়ার মত আদর্শ পরিস্থিতি উদ্ভূত হবে।’
সভায় জানানো হয়, জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশে ডেঙ্গু’র প্রকোপ বাড়াচ্ছে বলে বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণায় জানা গেছে। এক ঋতুর সঙ্গে আরেক ঋতুর যে পার্থক্য, বাংলাদেশে তা বদলে যাচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে। সেই সঙ্গে তৈরি হচ্ছে নতুন সমস্যা। মৌসুম হোক বা না হোক, ডেঙ্গু’র মতো বাহকনির্ভর রোগের প্রকোপ বাড়ছে শহর এলাকায়। এই গবেষণা বলছে, আর্দ্রতা কমে আসার পাশাপাশি তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের মাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভবিষ্যতে দেশের রাজধানীসহ অন্যান্য শহরে ডেঙ্গু’র প্রকোপ আরও বাড়তে পারে। জলবায়ু যেভাবে বদলে যাচ্ছে, তাতে জনস্বাস্থ্যের ওপর এরই মধ্যে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৭৬ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে বাংলাদেশে গড় তাপমাত্রা বেড়ে গেছে শূন্য দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর তার ফলে ধীরে ধীরে লোপ পাচ্ছে ঋতুভেদে আবহাওয়ার বৈচিত্র্য। টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট বা এসডিজি অর্জনে বাংলাদেশ প্রভূত অগ্রগতি করেছে। যার সুফল আমরা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রায় লক্ষ্য করছি কিন্তু কিছু বাঁধাও রয়েছে। বিশেষ করে পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন (এসডিজি-৬) উন্নতকরণে আমরা পিছিয়ে আছি।
যৌথ পরিবীক্ষন জরিপ ২০২৩ এর তথ্যমতে নিরাপদ খাবার পানি সুবিধাভোগী জনসংখ্যা ৫৯% যা ২০২১ সালের প্রতিবেদন থেকে মাত্র ০.৪% বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি, নিরাপদ স্যানিটেশন সুবিধাভোগী জনসংখ্যা ২৯% থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৩১% এবং মৌলিক হাইজিন সেবা নিশ্চিত জনসংখ্যা ৩.৩% বৃদ্ধি পেয়ে ৬২% উন্নীত হয়েছে। এই পরিবর্তনের দিকে লক্ষ্য করলে আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয়না যে আমাদের এখনো অনেক দূর যেতে হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি-৬ অর্জন করতে হলে একদিকে যেমন বাজেট বৃদ্ধি করতে হবে তেমনি সুষ্ঠু পরিকল্পনা গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন করতে হবে। সর্বোপরি দরকার সবার মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা।
চলতি বছরের ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুর তথ্য বিশ্লেষণ থেকে ধারনা করা গেছে, জলবায়ু কারণ, বিশেষ করে গত কয়েক বছরে তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত এবং আর্দ্রতা হঠাৎ করে পরিবর্তিত হয়েছে। জলবায়ুর অসঙ্গতির সাথে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব এবং পজিটিভ কেসও বেড়েছে। আবহাওয়ার অবস্থা ডেঙ্গু রোগের সাথে যুক্ত কারণ ‘এডিস ইজিপ্টি’র বৃদ্ধি এবং জীবনচক্র বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা, আর্দ্রতা এবং বায়ু দ্বারা প্রভাবিত হয়, সরাসরি বা পরোক্ষভাবে। ডেঙ্গু’র প্রকোপ বৃদ্ধির জন্য ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা এবং বৃষ্টিপাত সাহায্য করেছে বলে জানা গেছে।