পদ্মা সেতু: রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্সের ফেরি বিড়ম্বনার ঘটবে অবসান
আলী হোসাইন: মাওয়া ও জাজিরা ঘাটে সময়মতো ফেরি না পাওয়ায় দুর্ভোগে পড়েন হাজারো মানুষ। নারী-শিশু ও রোগীদের নিয়ে পড়তে হয় চরম বিপাকে। বেশি বিপাকে পড়ে রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পালা শেষে যখন ফেরিতে ওঠে অ্যাম্বুলেন্স, তখন প্রায়ই মাঝনদীতে রোগীর মৃত্যু ঘটে।
রাতে পদ্মার চারিদিকে অন্ধকার আর থৈ থৈ স্রোতের শব্দ। এর সঙ্গে মৃত ব্যক্তির স্বজনদের কান্নার আওয়াজ প্রমত্তা পদ্মার হৃদয়কেও যেন নাড়িয়ে দেয়।
বাবার লাশ নিয়ে ঘাটে অপেক্ষা, নির্দিষ্ট সময় ফেরি না আসায় মায়ের জানাজায় উপস্থিত হতে না পারা—এ ধরনের সংবাদ প্রায়ই গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়।
একটি হৃদয় বিদারক ঘটনা
কিছুদিন আগের কথা। সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত স্কুলছাত্র বহনকারী একটি অ্যাম্বুলেন্স তিন ঘণ্টা অপেক্ষার পর ফেরিতে ওঠে। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ। মস্তিষ্কে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়ে অ্যাম্বুলেন্সেই মারা যায় ওই স্কুলছাত্র। অভিযোগ ছিল, ভিআইপি আসার অপেক্ষায় প্রায় তিন ঘণ্টা ঘাটেই বসে ছিল ফেরিটি।
সারারাত বাবার লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে মাওয়াঘাটে পুত্রের আটকে থাকা। ঘাটে যানজটের কারণে মায়ের জানাজায় অংশগ্রহণ করতে পারেননি কেউ। অসুস্থ শিশুকে নিয়ে মা অপেক্ষার প্রহর গুণেছেন কখন ফেরিঘাট পার হবেন। কখন ঢাকা পৌঁছাবেন। কখন তার বুকের মানিককে হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা করাবেন। এ বুঝি চিকিৎসার অভাবে মায়ের নাড়িছেড়া ধনের মৃত্যু ঘটবে। কত আতঙ্ক ভর করতো। এ সময়গুলো খুব কষ্টের ও স্মৃতিকাতর।
বহুল প্রত্যাশিত এ সেতুর কল্যাণে কারও আর সেসব অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে না, এ রকমটা মনে করছেন ভুক্তভোগীরা।
ফেরিঘাটে স্বজন হারানোর দুঃসহ স্মৃতি
মো. সজিব হোসেন নামে এক ব্যক্তি বলেন, ২০২১ সালে তার ভাই সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়। প্রথমে তাকে ফরিদপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাতেই তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে হাসপাতালে পাঠানোর কথা বলেন চিকিৎসক। তাই দ্রুত ঢাকায় পৌঁছাতে ভাড়া করা হয় অ্যাম্বুলেন্স। অ্যাম্বুলেন্সটি ঘাটে এসে থামে রাত ৮টার দিকে। তিন ঘণ্টা অপেক্ষার পর রাত পৌনে ১১টার দিকে ছাড়া হয় ফেরি। বিলম্বে আসার কারণে রোগীর অবস্থার অবনতি হওয়ায় চিকিৎসায় তাকে সুস্থ করে তোলা সম্ভব হয়নি। ঢাকায় হাসপাতালে চিকিৎসা শুরুর কিছুক্ষণ পর মারা যায় তার ভাই। তার দাবি, নির্ধারিত সময় ফেরি ছাড়লে যথাসময় চিকিৎসা করানো যেতো, তাতে হয়তো ঠেকানো যেতো তার ভাইয়ের করুণ পরিণতি।
ফেরিঘাটে স্বজনের মৃত্যুর দুঃসহ স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছে অনেকে। পদ্মা সেতু চালু হলে এ রকম স্মৃতি হয়তো আর কাউকে তাড়া করবে না। তাই পদ্মাসেতু নিয়ে আনন্দ-উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেন দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ।
পদ্মা সেতুর কল্যাণে আহাজারির অবসান
ফরিদপুর থেকে প্রায় রোগী নিয়ে ঢাকা আসেন অ্যাম্বুলেন্সের চালক কাউসার মিয়া। তিনি বলেন, ফেরির জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হতো। এতে নিজের এবং রোগীর অনেক ভোগান্তি হতো। রোগীর অবস্থা অনেক সময় আরো অবনতির দিকে যেতো। অনেক সময় অ্যাম্বুলেন্সেই মারা যেত। তবে এবার পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় এসব সমস্যার অবসান ঘটবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
ফেরিতে কাজ করছেন—এমন একজন জানান, ‘এখন এ পথে সব সেতু হয়ে গেছে। চোখের সামনে ফেরিতে অ্যাম্বুলেন্সে অনেক মানুষের আহাজারি দেখেছি। কিন্তু স্রোতের টানে ফেরি দ্রুত চালানো যায়নি। সেজন্য অনেক বকাও খেয়েছি। আজ পদ্মা নদীতে সেতু হয়েছে। ভালো লাগছে।
পদ্মা সেতু চালু হওয়ার মধ্য দিয়ে দক্ষিণাঞ্চল থেকে রাজধানীতে আসা-যাওয়ায় ফেরি পারাপারে সীমাহীন ভোগান্তির অবসান হতে যাচ্ছে। অনেক কষ্ট হতো ফেরি পারাপারে। অন্যান্য ঘাটে আগেই সেতু হয়ে গেছে। তবে বড় চ্যালেঞ্জটা ছিল পদ্মা নদী পাড়ি দেওয়া। গত ৩০ বছর দক্ষিণাঞ্চলবাসী সীমাহীন দুর্ভোগের শিকার হয়ে ফেরি পারাপার করে রাজধানীতে আসা-যাওয়া করতো। পদ্মা সেতু চালুর মধ্য দিয়ে এই পথে সেই ফেরি যুগের অবসান ঘটতে চলেছে।
প্রসঙ্গত, ২১ জেলার ভাগ্যবদলে পদ্মা সেতু উদ্বোধনের অপেক্ষা এবার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ২৫ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করবেন বাঙালি জাতীর স্বপ্নের পদ্মা সেতু। মুন্সীগঞ্জের মাওয়াকে জাজিরার সঙ্গে যুক্ত করা ওই সেতুর উদ্বোধনের তারিখ ঘোষণার পর আনন্দে ভাসছে পদ্মাপারের মানুষ।
এমইউ