চিকিৎসকদের ক্যাডার পরিবর্তন, স্বাস্থ্যে অশনি দেখছেন বিশিষ্টজনরা
মো. মনির উদ্দিন: অতীতে বিসিএসে স্বাস্থ্যের বাইরে গিয়ে চিকিৎসকদের কালেভদ্রে অন্য ক্যাডারের ফরম তোলার খবর পাওয়া যেতো। সহপাঠীর মাধ্যমে তুলতে গিয়ে কেউ ভুলক্রমে কিংবা কেউ কেউ শখের বসে তুলতেন অন্য ক্যাডারের ফরম। এভাবে নগণ্য সংখ্যক চিকিৎসক অন্য ক্যাডারে চলে যেতেন। কিন্তু আন্তঃক্যাডার বৈষম্যসহ নানা বঞ্চনার কারণে সাম্প্রতিক সময়ে চিকিৎসকরা দল বেঁধে পাড়ি জমাচ্ছেন অন্য ক্যাডারে। শুধুমাত্র ৪০তম বিসিএসে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক চিকিৎসক ত্যাগ করেছেন নিজেদের আশৈশব লালিত স্বপ্নের স্বাস্থ্য সেবার পেশা।
ব্যাপক সংখ্যক চিকিৎসকের ক্যাডার পরিবর্তনের বিষয়টিকে স্বাস্থ্য খাতের জন্য অশনি সংকেত হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এর কারণ চিহ্নিত করে কার্যকর ও ফলপ্রসূ পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা। বলেন, অধিকতর মেধাবীদের পেশা পরিবর্তনের ধারা অব্যাহত থাকলে দেশের স্বাস্থ্য খাত গভীর অন্ধকারে নিপতিত হবে।
সংকট নিরসনে বিষয়টি নিয়ে আলোচনায় বসা জরুরি উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চিকিৎসকদেরকে নিজ পেশায় আগ্রহী করে তুলতে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে চিকিৎসাকে অসাধারণ ও মানবিক পেশা উল্লেখ করে দেশের স্বার্থে চিকিৎসকদের নিজ পেশায় অবদান রাখার অনুরোধ জানান তারা।
স্বাস্থ্য খাতের জন্য অশনি সংকেত
জানতে চাইলে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত অধ্যাপক ডা. শুভাগত চৌধুরী বলেন, মানুষের যে কোনো বিষয়ের পরিবর্তন ঘটে প্রয়োজনে অথবা সময়ের কারণে অর্থাৎ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায়। সুতরাং চিকিৎসকরা অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে, এর অর্থ হলো, নিজেদের পেশায় তারা সন্তুষ্ট না। তারা দেখছেন, অন্য পেশায় প্রভাব-প্রতিপত্তি-সুবিধা-সুযোগ-লাভ সব কিছুই বেশি। তারা তেমন ভালো নেই, বিশেষ করে তরুণরা। সমাজে তাদের মান-সম্মান তেমন নেই। তারা নিগ্রহের শিকার হচ্ছেন। দিন-রাত সেবা দেওয়ার পরও তারা দেখেন, এর কোনো মূল্যায়ন নেই। ফলে তারা যে আদর্শ ও লক্ষ্য নিয়ে চিকিৎসক হয়েছিলেন, মানবসেবার ওই ব্রত রক্ষা করা তাদের পক্ষে সম্ভ হচ্ছে না। নানা পরিস্থিতিতে তারা এই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হচ্ছেন।
তিনি আরও বলেন, ‘একজন চিকিৎসক অন্য পেশায় চলে যাওয়া অন্যভাবে একটি অশনি যে, পেশার প্রতি চিকিৎসকদের আগ্রহ নেই, ভক্তি নেই, অনুরাগ নেই ও সন্তুষ্টি নেই। এ পেশার অবস্থানে খুশি নয়, সুখী নয় বলেই পরিবর্তন করছে। তারা দেখছেন, আর অন্য পেশায় বেশি লাভ, বেশি সুবিধা—এসব দেখে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে। তারা কেন যাবে? নিঃসন্দেহে এটি অশনি সংকেত।’
এ প্রসঙ্গে ভিন্ন সুর প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহর কণ্ঠে। তিনি বলেন, এটা একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার। কেউ হয় তো ডাক্তারি পড়ার পর আর পছন্দ হয়নি। এমনটি হতেই পারে। অন্য ক্যাডারে সুযোগ-সুবিধা বেশি, সেজন্য তারা কেউ কেউ হয় তো মনে করেন সেখানে গেলে ভালো হবে। তারা হয় তো মনে করেন, অন্য পেশায় গেলে ফল ভালো করা যায়, ভালো চাকরি জুটে, পদোন্নতি তাড়াতাড়ি হয়। পরিবর্তনের নেপথ্যে এসবের সম্ভাবনাই বেশি।
মুষ্টিমেয় চিকিৎসক ক্যাডার পরির্বতন করছে জানিয়ে তিনি বলেন, তাদেরকে থামিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। কেউ পারলে যাক না। এমন তো না যে ঢালাওভাবে চলে যাচ্ছে। হাতে গোণা দুই-চারজন। কারও যদি অন্য পেশা পছন্দ হয়, সে যাক। এতে পেশার কী ক্ষতি হবে? দেশে অনেক চিকিৎসক রয়েছে। কয়েক হাজার আবেদন করেন, নিয়োগপ্রাপ্ত হন কয়েকজন।
বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) মহাসচিব ডা. এহতেশামুল হক চৌধুরী বলেন, ‘কয়েক বছর আগে যখন ক্যাডার পরিবর্তনের বিষয়টি দেখি, তখন মনে হতো, এটা হয় তো বিচ্ছিন্ন ঘটনা। তারা হয় তো শখের বশে ক্যাডার পরিবর্তন করছেন। কিন্তু গত ২/৩ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে যেভাবে ক্যাডার পরিবর্তন হচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে, নবীন যারা চিকিৎসক হচ্ছেন, তারা তাদের ক্যাডারের সম্মান, মান-মর্যাদা বা সুযোগ-সুবিধা নিয়ে খুশি নন। মানুষ স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে থাকে। জীবন গড়ার জন্য প্রতিটি মানুষ একটি স্বপ্ন বা লক্ষ্য নিয়ে থাকে। তারা মনে করছেন, যে লক্ষ্যে তারা চিকিৎসক হয়েছেন, সেখানে তারা পৌঁছাতে পারবেন না। এর চেয়ে অন্যান্য পেশায় তাদের ভবিষ্যত আরও উজ্জ্বল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
স্বাস্থ্যে নিয়োগ বাড়ানোর পরামর্শ
প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক আব্দুল্লাহ বলেন, ‘স্বাস্থ্য ক্যাডারে নিয়োগ বাড়ানো যেতে পারে। এর পরও যদি কেউ যেতে চায়, তাহলে তো তাকে আর ধরে রাখা যাবে না। এর আগেও কেউ কেউ অন্য পেশায় চলে যেতো। সুতরাং বর্তমানের ক্যাডার পরিবর্তন, অতীরেরই ধারাবাহিকতা।’
তিনি বলেন, এ ব্যাপারে সরকারের নজর দেওয়া দরকার। চিকিৎসকদের পদোন্নতি যেন সময় মতো হয়, এ ব্যাপারে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে বিসিএসে যোগ দেওয়া অন্য ক্যাডারদের যে হারে পদোন্নতি দেওয়া হয়, চিকিৎসকদের সেভাবে হয় না। এদিকে মনোযোগ দেওয়া দরকার। চিকিৎসকের যদি সময় মতো পদোন্নতি না হয়, অন্তত স্কেল পরিবর্তন—তাহলে সে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় ভুগবে। এ কারণেই বোধ হয় কেউ কেউ অন্য ক্যাডারে চলে যাচ্ছে।
কেন পেশার পরিবর্তন
আন্তঃক্যাডার বৈষম্যের কারণে পেশার পরিবর্তন কিনা, জানতে চাইলে অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ বলেন, ‘বৈষম্য তো দেখছিই। যথাসময়ে-যথাযথভাবে চিকিৎসকদের পদোন্নতি তো হয়ই না। হলেও খুবই ধীর গতিতে হয়। একই বিসিএসে যোগ দিয়েও চিকিৎসকের পদোন্নতি হয় না, একই পোস্টে পড়েই আছে, পদোন্নতির কোনো খবর নেই, অন্যদের ধারাবাহিকভাবে পদোন্নতি হতে থাকে। পেশা পরিবর্তনের জন্য এটা উল্লেখযোগ্য কারণ। একজন চিকিৎসক বিসিএস করলো, কিন্তু পোস্ট গ্রাজুয়েশন ছাড়া তো তার পদোন্নতি হবে না। পোস্ট গ্রাজুয়েশনে এমডি-এমএস করতে ৮/১০ বছর লেগে যায়। সেখানেও পাসের হার খুবই নগণ্য। পাস করলে সঙ্গে সঙ্গে পদোন্নতি হয়ে যাবে, এমনও না। অনেকে ডিগ্রি নিয়েও পদোন্নতির জন্য মুখিয়ে আছে, বছরের পর বছর পদোন্নতি নেই। সুতরাং ঝামেলা আছেই, তাদের চতুর্দিকে বৈষম্য, এটা দূর করা দরকার।। তা না হলে তাদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা কমবে না, ফলে স্বাস্থ্য সেবাও ব্যাহত হবে। ক্যাডার ত্যাগে এটাও একটা কারণ হতে পারে।’
এ অবস্থা সৃষ্টির পেছনে কি কারণ থাকতে পারে, জানতে চাইলে বিএমএ মহাসচিব ডা. এহতেশামুল হক চৌধুরী বলেন, ‘আসলে এর সূত্রপাত হয়েছে, আন্তঃক্যাডার বৈষম্যের কারণে। স্বাস্থ্যসহ তিনটি ক্যাডারের চেয়ে অন্যান্য ক্যাডারের সুযোগ-সুবিধা সুবিধা বেশি। যেখানে সরকারপ্রধান নির্দেশনা দিয়েছেন যে, ক্যাডারদের মধ্যে কোনো বৈষম্য চলবে না। সংবিধানে স্পষ্ট লেখা আছে, কোনোভাবেই এমন কিছু করা যাবে না, যার মাধ্যমে আন্তঃক্যাডার বৈষম্য সৃষ্টি হয়। এমনটি মহামান্য আদালতেরও এ বিষয়ে অনেক নির্দেশনা আছে। বৈষম্য নিরসনে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যাদেরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তারা বানরের পিঠা ভাগের মতো নিজেরাই এখানে আগ্রাসী ভূমিকা পালন করছেন। স্বপ্নের মধ্যে তারতম্য দেখা দিয়েছে বলেই নবীন চিকিৎসক ও প্রকৌশলীরা ওই স্বপ্নের পেছনে ছুটে চলছেন। এটা নিঃসন্দেহে একটি অশনি সংকেত। চিকিৎসা, প্রকৌশল ও কৃষির লোকজন ক্যাডার পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে এই তিন খাতে মেধাবী লোকদের আনাগোনা কমে যাবে। এর ফলে স্বাস্থ্য, কৃষি ও ভৌত অবকাঠামো উন্নয়নে মারাত্মক একটি প্রভাব পড়বে। সুতরাং দ্রুততম সময়ের মধ্যে যদি এ বিষয়ে সন্তোষকজনক কোনো ফয়সালা না হয়, তাহলে বিষয়টি আরও খারাপের দিতে যাবে। আমি এমন আশঙ্কা করছি, এক সময় এই ক্যাডারে লোকজন আরও নাও আসতে পারে।’
এ ব্যাপারে বিএমএ’র ভূমিকা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমরা বিষয়গুলো নিয়ে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মহোদয়ের সঙ্গে কথা বলেছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে লিখিত আকারে বিষয়গুলো উপস্থাপন করেছি। বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলার জন্য আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সময়ও চেয়েছি। আমরা সাক্ষাতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিষয়গুলো উপস্থাপন করবো। তিনিই তো সরকারপ্রধান। করোনার আগে তিনিই জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রীকে এ সংকট নিয়ে প্রত্যেক ক্যাডারের সঙ্গে বসতে নির্দেশনা দিয়েছেন। এসব নিরসনে রূপরেখা প্রণয়নের নির্দেশ দিয়েছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিমন্ত্রী মহোদয়ের সভাপতিত্বে আমরা বসেও ছিলাম। কিন্তু করোনার কারণে এগুলো আলোর মুখ দেখেনি। বরং করোনার সময় প্রশাসন ক্যাডারের আগ্রাসী ভূমিকায় হতাশ হয়েছি। যেহেতু করোনা শেষ হয়েছে, তাই বিষয়গুলো প্রধানমন্ত্রীর কাছে লিখিতভাবে উপস্থাপনের পাশাপাশি তার সাক্ষাতের আবেদন করেছি। শুধু তাই নয়, আমরা জাতীয় সংসদের ৩৩০ জন মাননীয় সদস্যের কাছে বিষয়গুলো লিখিত আকারে উপস্থাপন করেছি। মাত্র করোনা গেলো, স্বল্পতম সময়ের মধ্যে আমরা তাদের সান্নিধ্য পাবো বলে আমরা নিশ্চিত। সাক্ষাতের বিষয়গুলো বোঝানোর চেষ্টা করবো। আর রোজার পরে তিন পেশার লোকজন বসে বিষয়গুলোর ফয়সালার জন্য রূপরেখা প্রণয়ন করবো। প্রয়োজনে আমরা আদালতের শরণাপন্ন হবো। প্রয়োজনে কর্মসূচি প্রণয়ন করবো, যাতে সরকারকে বোঝানো যায়।’
পেশা পরিবর্তনের কারণ উল্লেখ করে চিকিৎসকদের সংগঠন ফাউন্ডেশন ফর ডক্টরস সেফটি রাইটস অ্যান্ড রেসপন্সিবিটিলিস’র (এফডিএসআর) মহাসচিব ডা. শেখ আব্দুল্লাহ আল মামুন মেডিভয়েসকে বলেন, ‘এটা ঘটার পেছনে সব চেয়ে বড় কারণ ক্যাডার বৈষম্য। আমাদের প্রশাসনিক ও পুলিশ ক্যাডারের জন্য যে রকম সুযোগ সুবিধা রয়েছে। চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও কৃষিবিদরা এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এজন্যই তারা পেশা পরিবর্তন করছেন। এটা সুখকর কিছুই না। বঞ্চনার কারণেই তারা যেতে বাধ্য হচ্ছেন।’
এফডিএসআর মহাসচিব বলেন, ‘বিষয়টি আসলেই দুঃখজনক। যেই পেশায় তারা এতো দিন কাজ করে আসছে, হঠাৎ যদি তারা পেশা পরিবর্তন করে তাহলে তাদের এতো দিনের যে পরিশ্রম, এটা নিষ্ফল হয়ে যায়। এর মধ্যে অনেক মেধাবী চিকিৎসক রয়েছেন, যারা এরই মধ্যে পোস্ট গ্রাজুয়েশনে এফসিপিএস বা এমআরসিপি পার্ট-১ করে ফেলেছেন। বিভিন্ন পোস্ট গ্রাজুয়েশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে অনেক দূর এগিয়ে গেছেন। এই অবস্থায় পেশা পরিবর্তন নিঃসন্দেহে পেশার জন্য অনেক বড় একটি ক্ষতি।
নিরাপত্তাহীনতায় চিকিৎসকরা
বাংলাদেশ ডক্টরস' ফাউন্ডেশনের (বিডিএফ) প্রধান সমন্বয়ক ডা. নিরুপম দাশ মেডিভয়েসকে বলেন, পেশা পরিবর্তনে চিকিৎসকদের নিরাপত্তাহীনতাও অন্যতম মূল বিষয়। কর্মস্থলে চিকিৎসকদের চেয়ে অন্য সকল পেশার লোকদের নিরাপত্তা অনেক বেশি। অথচ নানা অযৌক্তিক কারণে রোগীর স্বজনদের হাতে প্রতিনিয়ত নিগ্রহের শিকার হওয়া চিকিৎসকদের নিরাপত্তা বাড়ানো খুব জরুরি। কিন্তু তা হচ্ছে না। যে কোনো পেশার মানুষের চেয়ে চিকিৎসকরা বেশি সেবা দিয়ে যাচ্ছে। তারা যদি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেন, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই ক্যাডার পরিবর্তন করতে চাইবেনই।
স্বাস্থ্যখাত ভেঙে পড়ার শঙ্কা
এ প্রসঙ্গে ডা. এহতেশামুল হক চৌধুরী বলেন, স্বাস্থ্য ক্যাডারে শুধু এমবিবিএস ডিগ্রি নয়, বরং আরও দশ বছর পড়াশোনা করতে হয়। ৬-৭ বছর লাগে তাদের পোস্ট গ্রাজুয়েশন ডিগ্রি নিতে। এটা একমাত্র পেশা যেখানে পোস্ট গ্রাজুয়েশন ছাড়া পদোন্নতির কোনো রাস্তা নেই। সুতরাং ১৬/১৭ বছর লেখা-পড়া করে যদি একজন মানুষ স্বপ্ন ছুঁতে না পারে, উল্টো দিকে অন্য ক্যাডারে এতো লেখা-পড়া ছাড়াও যদি স্বপ্নের কাছাকাছি পৌঁছা যায়, তাহলে কেউ ওই দিকেই এগিয়ে যাবে। চূড়ান্ত বিবেচনায় এগুলো ভালো লক্ষণ নয়। এ বছর এমবিবিএস ভর্তি পরীক্ষায় যে মেয়েটা প্রথম স্থান অধিকার করেছে, তাকে প্রশ্ন করা হয়েছে, তুমি ভবিষ্যতে ক্যাডার পরিবর্তন করবে না তো? এই যে আশঙ্কা তৈরি হলো, এটা যদি চিহ্নিত করা না যায়, তাহলে রাষ্ট্রের বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিরা এগুলো নিয়ে না ভাবলে আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গভীর সংকটে পড়ে যাবে। সেই সঙ্গে ব্যাহত হবে কৃষি, যোগাযোগ কিংবা ভৌত অবকাঠামোগত উন্নয়নও।
একই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিডিএফ’র প্রধান সমন্বয়ক ডা. নিরুপম দাশ। তিনি বলেন, ছয় বছর পড়াশোনা শেষ করে একজন চিকিৎসক হন। তারা যখন ক্যাডার পরিবর্তন করবেন, তখন নিজেদের জায়গায় একটি শূন্যতা তৈরি হবে। মানহীন চিকিৎসার আশঙ্কা বেড়ে যাবে। দারুণভাবে ব্যাহত হবে গবেষণাসহ সামগ্রিক স্বাস্থ্যসেবা। দ্রুততম সময়ের মধ্যে সমস্যার সবাধান না করলে আগামী ৫-১০ বছরের মধ্যে অনেক চিকিৎসক অন্যান্য ক্যাডারে চলে যাবেন।
তিনি বলেন, ক্যাডার পরিবর্তনের কারণে মেধাবী চিকিৎসকরা পেশা ছাড়তে থাকলে দেশের স্বাস্থ্যখাত কখনো দাঁড়াবে না, রোগীদের বিদেশমুখিতাও কমবে না। ভেঙে পড়বে দেশের স্বাস্থ্য খাত।
এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক ডা. শেখ আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, যেসব মেধাবী চিকিৎসক আগামী দিনে স্বাস্থ্য খাতের মুখ উজ্জ্বল করতে পারতো, বেশি সেবা দিতে পারতো, তারা এখন অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে। এটা তো স্বাস্থ্য খাতের জন্য হুমকি। তারা সানন্দে যাচ্ছে, তা কিন্তু নয়। বঞ্চনার অনুভূতিতে স্বাস্থ্য সেবার বিষয়ে তাদের দীর্ঘ দিনের অঙ্গীকার ভুলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। এখানে আসলে বাঁধা দেবারও কিছু নেই, যার যার ব্যক্তি স্বাধীনতা। কেউ যদি মনে করেন, ওখানে গেলে সে ভালো করবে, তার জন্য ভালো হবে, এসব ক্ষেত্রে কারও বাধা দেওয়ার নৈতিক অধিকার নেই।
সমাধান কোন পথে?
অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ বলেন, ‘এ ব্যাপারে প্রশাসনকে এগিয়ে আসতে হবে। আমি এ ব্যাপারে আলাপ-আলোচনা করতে পারি। বিভিন্ন ফোরামে এই কথাগুলো এরই মধ্যে বলেছি। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তাদেরই উদ্যোগী হয়ে এগিয়ে আসতে হবে।’
জানতে চাইলে অধ্যাপক ডা. শুভাগত চৌধুরী বলেন, ‘পেশাজীবী সংগঠনগুলোকে এসব নিয়ে বসা উচিত। পৃথিবীর অনেক দেশের স্বাস্থ্য খাত আমার দেখার সুযোগ হয়েছে, ব্রিটেনে বেশি কাজ করেছি। আমরা তাদেরকে অনুসরণ করি, আগেও করতাম। ব্রিটেনে ব্রিটিশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের প্রভাব অভাবনীয়। সরকারকে তারা নির্দেশনা প্রদান করে এবং সরকারও তাদের স্বাস্থ্য বিষয়ক কথাগুলো শুনে। সেখানে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা সব কিছু অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে আলাপ করে জেনারেল মেডিকেল কাউন্সিল সিদ্ধান্ত নেয়, চিকিৎসকদের জন্য কি করা উচিত কি উচিত না। যে কোনো দেশে চিকিৎসকদের স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অ্যাসোসিয়েশনের বিরাট ভূমিকা রয়েছে। সুতরাং পেশাজীবী সংগঠনগুলোর উচিত এসব জিনিস দেখা, পর্যবেক্ষণ করা। এজন্য তাদের একটি গবেষণা সেল থাকা দরকার, যারা এসব দেখার পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক উপায়ে এর কারণগুলো খুঁজে বের করবে। এ নিয়ে পরবর্তীতে গবেষণাপত্র বের করা উচিত এবং এটা সরকারের কাছে দেওয়া উচিত। এই গবেষণাপত্র অ্যাসোসিয়েশনগুলোর জেনারেল মিটিংয়ে উপস্থাপন করা দরকার, যেখানে তাদের সকল সদস্য উপস্থিত থাকবেন। এসব ইস্যুতে তাদের মতামত নেওয়াও জরুরি।’
এ প্রসঙ্গে বিডিএফ প্রধান সমন্বয়ক ডা. নিরুপম দাশ বলেন, যত দিন পর্যন্ত আন্তঃক্যাডার বৈষম্য বিদ্যমান থাকবে, তত দিন ক্যাডার পরিবর্তনের এই ধারা চলতে থাকবে। কোনো চিকিৎসকই নিজের ক্যাডারের বাইরে যেতে চান না। কিন্তু পরিস্থিতির কারণে তারা যেতে বাধ্য হচ্ছে। ক্যাডার বৈষম্য দূর ও সকল ক্যাডারের মধ্যে যদি সমান সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে এ ধারা বন্ধ হবে না। এখন হয় তো ১৫/২০ জন বা ৩০ জন করছেন, কিন্তু কিছু দিন পরে দেখবেন, তাদের অর্ধেকই ক্যাডার পরিবর্তন করছেন। ৪০তম বিসিএসে বিভিন্ন ক্যাডারে প্রথম হয়েছেন ইঞ্জিনিয়ার ও চিকিৎসকরা। এবার ফরেন, কর, অডিট, কাস্টমস ক্যাডারেও চিকিৎসকদের হয়েছে।
এফডিএসআর মহাসচিব অধ্যাপক ডা. শেখ আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, আন্তঃক্যাডার বৈষম্য দূর করতে হবে। সবার সমান সুযোগ-সুবিধা ও মর্যাদা থাকতে হবে। কাগজে-কলমের পাশাপাশি বাস্তবেও এর প্রতিফলন ঘটাতে হবে। এটা যত তাড়াতাড়ি করা যাবে, ততই দেশের জন্য, সকল পেশার জন্য মঙ্গলজনক হবে। তাহলে কেউই পেশা পরিবর্তনে আগ্রহী হবেন না। এতো কাঙিক্ষত পেশা চিকিৎসকরা কেন পরিবর্তন করছেন, সেটা নিয়ে আমাদের গভীরভাবে চিন্তা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কৃত্যপেশাভিত্তিক মন্ত্রণালয় করে দেওয়া গেলে অনেকাংশে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে।
স্বাস্থ্য প্রশাসকের বক্তব্য
জানতে চাইলে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের সচিব মো. সাইফুল হাসান বাদল মেডিভয়েসকে বলেন, চিকিৎসা একটা অসাধারণ পেশা ও মানবিক পেশা। এর চেয়ে সম্মানিত পেশা হতে পারে না। একজন ডাক্তারি পাস করার পর, এখানে থাকাটাই তো স্বাভাবিক। এতে দেশের জন্য তারা বেশি অবদান রাখতে পারবেন।
‘নবীন চিকিৎসকরা হয় তো সামগ্রিক দিক বিবেচনা করে অন্য ক্যাডার বেছে নেন। এখানে পিএসসির একটি রোল আছে। একজন চিকিৎসক তৈরির পেছনে সরকারের অনেক বিনিয়োগ রয়েছে, জনগণের স্বার্থেই সরকার এটা করে। সেটা মাথায় রেখেই পিএসসি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে’, যোগ করেন স্বাস্থ্য শিক্ষা বিভাগের সচিব।
তিনি আরও বলেন, ‘এখানে তাঁদেরকে কীভাবে আরও সম্মানিত করা যায়, আগ্রহী করা যায়, উদ্বুদ্ধ করা যায়—এ ব্যাপারে বোধ হয় আমাদেরও দায়িত্ব আছে। আমরাও ভূমিকা রাখতে পারি।’
চিকিৎসকদের পদোন্নতিতে বিদ্যমান সমস্যার বিষয়ে সহমত পোষণ করে তিনি বলেন, করোনা পরিস্থিতিতে সরকার দশ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ দিয়েছেন। তাদের সবারই তো পদোন্নতির সুযোগ নেই। ডিজি তো হবেন একজন। সুতরাং এখানে তো কিছুটা সমস্যা আছেই। এটা সত্যি কথা। জটিলতা নিরসনে বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বসে আলোচনা করা দরকার।
বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রণালয়ের ভাবনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘চিকিৎসকদেরকে আরও কিভাবে উৎসাহিত করা যায় এ নিয়ে মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ, স্বাস্থ্য শিক্ষা বিভাগ, মাননীয় মন্ত্রী এবং সরকার ভাবছে। তাদের চাকরির ক্ষেত্রকে আরও কিভাবে আকর্ষণীয় করা যায়, এ ব্যাপারে সরকার কাজ করছে। সব পেশাতেই কিছু কিছু সমস্যা আছে। তাই বলে পেশা থেকে বেরিয়ে যাওয়া যাবে না। দায়িত্ব পালন থেকে দূরে থাকা যাবে না। আমি যদি ভাবি যে, এটা আমার ওপর দায়িত্ব, আমি যদি এটা মানব কল্যাণে সুন্দরভাবে পালন করি, এতেই প্রশান্তি। বদলি, পদায়ন—এসব দিয়ে মানুষকে খুশি করা যায় না। এটা ভেতর থেকেই আসতে হবে। এটা আমার ওপর আল্লাহর রহমত যে, আমি জনগণকে সেবা দেওয়ার সুযোগ পেয়েছি। এটা না ভেবে যদি শুধু নিজেকে নিয়ে ভাবি, নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি, এটা উচিত হবে না। রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ থেকে একজন ঝাড়ুদার পর্যন্ত সবারই নিজ নিজ অবস্থান থেকে অবদান রাখার সুযোগ রয়েছে। আমার দায়িত্ব কিভাবে পালন করছি, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং আমি আমার সহকর্মী, বন্ধু—সকলের কাছে আবেদন করবো, আসুন অবদান রাখি।’
বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে একাধিকবার চেষ্টা করেও জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনকে ফোনে পাওয়া যায়নি।