ডা. সুলতানা পারভীনকে হত্যা করা হয়েছে, দাবি পরিবারের
মেডিভয়েস রিপোর্ট: জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. সুলতানা পারভীন আত্মহত্যা করেনি, বরং সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে তাঁর পরিবার। তাদের দাবি, মৃত্যুর সময় ডা. সুলতানার ঠোঁট কাটা, মুখে নাকে চোখে রক্তাক্ত জখমসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন ছিলো। জিবে দাঁত দিয়ে কামড় দেয়া ছিলো। শ্বাসরোধ করে হত্যা করার মতো গলায় কালশিটে দাগ ছিলো।
শুক্রবার (২১ আগস্ট) সন্ধ্যায় জামালপুর প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান সুলতানা পারভীনের ছোট বোন মেরিনা পারভীন। তিনি বলেন, আমার বোনের মৃত্যু নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। আমরা সত্যিটা জানতে চাই।
স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগের প্রতি ক্ষোভ জানিয়ে তিনি জানান, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কোনো কর্মকর্তা আমাদের সাথে যোগাযোগ করেনি। এমনকি তারা আমাদেরকে মৃতদেহ দেখতে পর্যন্ত দেয়নি। খোলা আকাশের নিচে একজন নারীর পোস্টমর্টেম করা হয়েছে যা খুবই অবমাননাকর। তার কাফনের কাপড়ও দেয়নি কেউ।
মেরিনা পারভীন বলেন, এটা হতে পারে আত্মহত্যা বা হত্যা, সেটা আপনারা প্রমাণ করুন। তার গায়ে কাপড় ছিলো না। কাপড় কোথায়? গায়ে তো কাপড় ছিলো। তার দাঁতে জিব আটকা কেন? শ্বাসরোধ না করলে জিব দাঁতের মধ্যে আটকে থাকে না। এটা আত্মহত্যা হলে গলায় দাগ থাকবে কেন? তাহলে কি ডা. সুলতানা পারভীন নিজেই নিজের গলা টিপে দাগ করেছেন? চোখের কোণে ফিনকি দিয়ে রক্ত পড়ার ছাপ ছিল। ঘুষি মারলে যেরকম কালো থ্যাঁতলানো দাগ হয় আমার বোনের মুখণ্ডলে, শরীরের বিভিন্ন স্থানে দাগ ছিলো। নাক থেকেও রক্ত ঝরছিলো।
এ সময় ডা. সুলতানা পারভীনের পিতা মুক্তিযোদ্ধা আলাউদ্দিন আজাদ বলেন, আমার মেয়েকে হত্যা করা হয়েছে। আমার মেয়েকে হত্যা করার দুটি পক্ষ রয়েছে। একটা পক্ষ হলো তার প্রাক্তন স্বামীর পরিবার, আরেকটা পক্ষ হলো পেশাগত দ্বন্দ। আমার মেয়ের পেছনে তার শ্বাশুড়ি ছায়ার মতো লোক লাগিয়ে রেখেছিলেন। তার ঘনিষ্ঠ মকবুল হোসেন মোর্শেদ পরিবার পরিকল্পনা আঞ্চলিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (নিপোর্ট) মেলান্দহে বদলি হয়ে এসেছিলেন। তিনি আমার মেয়েকে সবসময় ফলো করতেন।
তিনি আরও বলেন, আমার মেয়ে ছিল গরিবের ডাক্তার। তার দক্ষতা ও সেবায় মেলান্দহে সুনাম অর্জন করায় স্থানীয় ডাক্তাররাও হুমকি দিত সে যেন প্রাইভেট প্র্যাকটিস না করে। কলিগরাও তার প্রতি ঈর্ষাপরায়ণ ছিলো। এদেরকেও সন্দেহের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া যায় না। আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযোদ্ধার সন্তান অভিজ্ঞ গাইনি ডাক্তারকে এভাবে কেন প্রাণ দিতে হলো? এজন্যই কি মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম বলে অঝোরে কেঁদে ফেললেন সুলতানা পারভীনের পিতা মুক্তিযোদ্ধা আলাউদ্দিন আজাদ। তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের কাছে এ হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত চিত্র উদঘাটন করে সুবিচার দাবি করেছেন।
এর আগে, গত রোববার (১৬ আগস্ট) বিকাল সাড়ে চারটার দিকে সরকারি বাসা থেকে তাঁর লাশ উদ্ধার করা হয়। ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. নাজমুল হাসান সন্ধ্যায় মেডিভয়েসকে জানান, মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো জানা যায়নি। ময়নাতদন্তের জন্য লাশ জামালপুর সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন আসলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে।
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা খবর পেলাম, ডা. সুলতানা পারভীন কারও ডাকে সাড়া দিচ্ছেন না, অনেকেই তাঁকে ফোনে পাচ্ছেন না। পরে আমরা প্রশাসনকে বিষয়টি জানাই। প্রশাসনের উপস্থিতিতে বিকাল সাড়ে চারটার দিকে সরকারি বাসার দরজা ভেঙে ভেতরে গিয়ে বিছানায় তাঁর লাশ দেখতে পাই।’
তিনি কোনো রকম সংকটে ছিলেন কিনা, জানতে চাইলে ডা. নাজমুল হাসান বলেন, ‘হাসপাতালের সহকর্মীদের সঙ্গে তাঁর কোনো দ্বন্দ্ব, পারিবারিক কোনো ঝামেলা কিংবা সামাজিক কোনো বিরোধের ব্যাপারে আমরা অবগত নই।’
৩২তম বিসিএসে স্বাস্থ্য ক্যাডারে যোগ দেওয়া ডা. সুলতানা পারভীন রংপুর মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করেন। তিনি ছিলেন সেখানকার ৩০তম ব্যাচের শিক্ষার্থী। এ চিকিৎসকের বাড়ি রাজশাহী বিভাগে।