ডা. তাহমিদা ইসলাম

ডা. তাহমিদা ইসলাম


২৬ জুলাই, ২০২০ ০৪:১২ পিএম

চিকিৎসকরাও মানুষ, তাঁদেরও দুঃখ, কষ্ট, হতাশা আছে

চিকিৎসকরাও মানুষ, তাঁদেরও দুঃখ, কষ্ট, হতাশা আছে

দয়া করে একটু পড়ুন, একটু ভাবুন। আপনিও এ রকম করছেন না তো?

ঘটনা ১: সপ্তাহ দুয়েক আগে ভোর চারটায় আমার বাসার দরজায় হঠাৎ ঘন ঘন কলিং বেলের আওয়াজ। কে জিজ্ঞাসা করাতে একজন পুরুষ লোক অধিকারের সুরে বললেন ‘দরজাটা খুলতে হবে’। তার সাথে বাসার দারোয়ান ছিলো। আমার বাসায় শুধু আমার অসুস্থ বাবা-মা আর বাচ্চা। ইচ্ছা না থাকলেও দরজা খুলতে হলো। ভদ্রলোকের মেয়ে অসুস্থ। আমাকে এখনই দেখে দিতে হবে, নিয়ে আসতে বললাম। দেখে চিকিৎসা দিলাম। তারা চলে গেলেন। 

একদিন পর দারোয়ানকে কৌতূহল থেকেই জিজ্ঞাসা করলাম বাচ্চাটা কেমন আছে? সে জানাল ওষুধগুলো খেয়ে ১ থেকে ২ ঘন্টার মধ্যেই সে সুস্থ হয়ে গেছে। আমার ভালো লাগল, সেই সাথে একটু মন খারাপও হলো। বিপদে পড়ে ভোর চারটায় আমাকে নক করা যায়, আর সুস্থ হয়ে গেলে একটা সাধারণ ধন্যবাদ তো দূরে থাক সুস্থতার খবরটা পর্যন্ত জানানো যায় না। ও হ্যা, ভদ্রলোক আমার অপরিচিত হয়ে ভোর চারটায় আমার আধা ঘন্টা সময় নেওয়ার পরেও আমাকে কিন্তু কোনো ভিজিট অফার করেননি। আমি নিতাম না, কিন্তু উনি তো বলতে পারতেন। উনারা থাকতেই আমার বাচ্চাটা বিছানায় আমাকে খুঁজে না পেয়ে কাঁদতে শুরু করে। সাথে ভদ্রলোকের স্ত্রীও ছিলেন। স্বামী বা স্ত্রী কেউই কিন্তু বললেন না যে আপা আপনার বাচ্চাটার কাছে যান। আমার বাচ্চার কান্না শুনছেন, সেই সাথে নিজের মোটামোটি স্থিতিশীল বাচ্চার সমস্যা বলে যাচ্ছিলেন।

ঘটনা ২: কোন দিন চোখেও দেখিনি এমন অনেকে মেসেঞ্জারে নক করে চিকিৎসা চায়। আগে কিছু কিছু দিতাম, এখন এমন অনলাইন চিকিৎসা দেওয়া সম্পুর্ণ বন্ধ করে দিয়েছি। আমার অবজারভেশন হচ্ছে তাদের শতকরা নব্বই ভাগই এটা নিজেদের অধিকার মনে করে এবং কোন কৃতজ্ঞতা বোধ করেন না।

ঘটনা ৩: আমার কিছু রোগী আছেন যারা কোন না কোন ভাবে কখনও আমার ফোন নাম্বার পেয়েছিলেন। এদের অনেককেই আমি বছরের পর বছর ওভার ফোন ট্রিটমেন্ট দিয়ে গিয়েছি। অদ্ভুত বিষয় হলো বেশিরভাগ রোগী আল্লাহর রহমতে সুস্থ হয়ে গেলেও কখনো ধন্যবাদ জানাননি বা সুস্থতার খবরটুকুও জানাননি। এক জনকে পুরো প্রেগন্যান্সির সময়ে সকল সাপোর্ট দেওয়ার পরেও বাচ্চা হওয়ার খবরটা পর্যন্ত আমকে জানাননি। বাচ্চা হওয়ার ২ মাস পর ফোন করেছিলেন ইউরিনের সমস্যার জন্য। খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। সেদিন তার সমস্যার সমাধান আমি আর দেইনি।

তাদের অনেকেই হয়তো বিশ্বাস করেন ডাক্তারের কাজ তো সেবা দেওয়া, সেটাই করেছে। এতে ধন্যবাদ বলার কি আছে? কিন্তু এই পাঁচ মিনিটে তার সমস্যা সমাধানের পেছনে আমাদের কত দিন রাতের রক্ত জল করা পরিশ্রম, কত চোখের পানি, কত ত্যাগ আছে তার খোঁজ কয় জন রাখেন? আমাকে যখন কেউ কেমন আছ জিজ্ঞাসা করে তখন আমি সুন্দর করে হেসে বলি আলহামদুলিল্লাহ। কিন্তু ভাই আমরাও তো মানুষ, আমাদের ও দুঃখ আছে, কষ্ট আছে, হতাশা আছে। আমাদেরও রাগ হয়, অভিমান হয়, চোখে জল আসে। তার খোঁজ কয়জন রাখেন আপনারা? প্রতিটা মানুষের মধ্যের গুণটি বাঁচিয়ে রাখতে হলে একটা স্বীকৃতি লাগে, একটা ইনসেন্টিভ লাগে। 

আমি তো খুব তুচ্ছ কয়েকটা ঘটনা শেয়ার করলাম। আমাদের দেশের বাস্তব পরিস্থিতি আরো নাজুক। চিকিৎসকদের শারীরিক আঘাত, আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার, বাসা থেকে উচ্ছেদ, এমন কী প্রাণে মেরে ফেলা কী নেই এদেশে? আমার পরিচিত অনেক চিকিৎসক অন্য পেশা বেছে নিয়েছেন। অনেকেই পাড়ি জমিয়েছেন দেশের বাইরে। আবার অনেকেই জীবন জীবিকার তাগিদে বাধ্য হয়ে পেশা চালিয়ে গেলেও একদম দৃঢ়প্রতিজ্ঞ সন্তান কে কিছুতেই এই পেশায় আনবেন না। আমি শুধু আমার পেশার উদাহরণ দিলাম কারণ আমার এটাই কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা হয়েছে। সত্যিকার অর্থে এ দেশে কয়জন মেধাবী, যোগ্য, সৎ মানুষ সম্মান ও স্বীকৃতিসহ ভালো থাকে? যে দেশে যোগ্য লোকের স্বীকৃতি নেই সেই দেশের বাচ্চারা নিজেদের যোগ্য করে গড়ে তোলার উৎসাহ পায়না। আপনারা আপনাদের জাতির সূর্য সন্তানদের হারাচ্ছেন না তো? আজ থেকে বিশ বছর পর আপনার বা আপনার সন্তানের চিকিৎসার জন্য যোগ্য চিকিৎসক খুঁজে পাবেন তো?

মেডিভয়েস এর জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্ট গুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
এ সপ্তাহে ৪২তম বিশেষ বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি 

আরও ২০০০ চিকিৎসক নিয়োগের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত