ডা. মো. জয়নাল আবেদীন টিটো
২১তম বিসিএসের একজন সদস্য
সাবেক লাইন ডিরেক্টর, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর
১৬ অক্টোবর, ২০২৬ ০৩:২১ পিএম
আদর্শ উপজেলা হাসপাতালের কাঠামো ও জনবল (প্রথম কিস্তি)
মেডিভয়েস রিপোর্ট: সরকারি হাসপাতালে ভর্তিকৃত প্রত্যেক রোগীর জন্য অবশ্যই একটি শয্যা থাকা আবশ্যক। অথচ বাংলাদেশে প্রতিদিন ৩০ হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালে শয্যা না পেয়ে মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হন। মেঝেতে শুয়ে থাকা রোগীর দেহে সংক্রমণ (ইনফেকশন) হওয়ার প্রবণতা বেশি থাকে। রোগী যদি মেঝে থেকে অন্তত দুই ফুট উঁচু শয্যায় শায়িত না থাকেন, তাহলে চিকিৎসক কর্তৃক তাদের শারীরিক পরীক্ষা (ক্লিনিক্যাল এক্সামিনেশন), তার পরবর্তী প্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ (ইন্টারভেনশন) করা এবং রক্তনালীতে ঔষধ প্রয়োগ করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
বৈশ্বিক মানদণ্ড ও বাস্তবতা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মানদণ্ড অনুযায়ী, প্রতি এক হাজার মানুষের জন্য অন্তত ৩ দশমিক ৫টি শয্যা থাকা প্রয়োজন। তবে দেশের জনসংখ্যা ও রোগীর চাপ বিবেচনায় অন্তত প্রতি এক হাজার মানুষের জন্য একটি করে হাসপাতাল-শয্যা থাকা দরকার।
এই বিবেচনায় উপজেলা হাসপাতালগুলো ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হওয়া যুক্তিসঙ্গত। একই সাথে প্রতিটি জেলায় একটি এক হাজার শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল ও ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট বিশেষায়িত হাসপাতাল করা অত্যন্ত প্রয়োজন—যেখানে ক্যান্সার, কিডনি এবং কার্ডিয়াক রোগের চিকিৎসা প্রদান করা হবে। বাস্তবতা হচ্ছে, বাংলাদেশে মাত্র ৮টি উপজেলা হাসপাতাল হচ্ছে ১০০ শয্যাবিশিষ্ট, কম বেশি ৪০০টি হাসপাতাল ৫০ শয্যাবিশিষ্ট এবং ৩০টির কাছাকাছি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ৩১ শয্যাবিশিষ্ট।
সরকারি উদ্যোগ ও ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণের সুযোগ
অতিসম্প্রতি সরকার দেশের প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার ঘোষণা দিয়েছে। এটি একটি চমৎকার পদক্ষেপ। যদি শক্ত ভিত্তি স্থাপন করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে হাসপাতাল ভবনকে ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ (ভার্টিক্যাল এক্সটেনশন) করে এর শয্যা সংখ্যা বাড়ানো যাবে।
আধুনিক মডেল হাসপাতালের বিভাগসমূহ
বর্তমান এবং ভবিষ্যতের আলোকে যদি আমরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে সাজাতে চাই, তাহলে উপজেলা হাসপাতালকে বেশ কয়েকটি বিভাগে ভাগ করতে হবে। ২০২৬ সালের উপযোগী আধুনিক ও মানসম্পন্ন উপজেলা হাসপাতাল গড়তে যেসব বিভাগ থাকা অপরিহার্য, সেগুলো হলো—প্রশাসন বিভাগ, অর্থ ও ক্রয় বিভাগ, পাবলিক হেলথ ও প্রিভেন্টিভ মেডিসিন বিভাগ, জরুরি বিভাগ, বহির্বিভাগ, অন্তঃবিভাগ, অপারেশন থিয়েটার কমপ্লেক্স, ল্যাবরেটরি মেডিসিন বিভাগ, রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং বিভাগ, ফরেনসিক মেডিসিন ও টক্সিকোলজি ও মেডিকোলিগ্যাল বিভাগ, রক্ত পরিসঞ্চালন বিভাগ, স্টোর এবং ইনফেকশন প্রিভেনশন ও ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট বিভাগ (যার অধীনে থাকবে স্টেরিলাইজেশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা)।
পুরনো অবকাঠামো ও সীমাবদ্ধতা
এবার আসুন আলোচনা করি অবকাঠামো নিয়ে। আমাদের দেশের পুরানো ৮টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও জেলা হাসপাতালের অবকাঠামো নির্মাণ করা হয় পাকিস্তান আমলে। তখন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ছিল ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট এবং মহকুমা হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা ছিল ৩০ থেকে ৫০। তারপর ধীরে ধীরে জেলা হাসপাতালগুলোর শয্যাসংখ্যা বাড়িয়ে ১০০ এবং পরবর্তীতে ২৫০ করা হয়েছে। একই ভবনের মধ্যে নতুন করে অনেকগুলো কক্ষ তৈরি করায় পুরানো ভবনগুলো এখন আর পরিবেশবান্ধব ও চিকিৎসাবান্ধব নেই।
টেকসই ও রোগীবান্ধব নির্মাণ নকশা
আজ থেকে ৫০ বছর পরে আমাদের দেশের ভূমির পরিমাণ বাড়বে না। এমনকি এক হাজার বছর পরও ভূমির পরিমাণ এখন যা আছে, তা-ই থাকবে; এক ইঞ্চিও বাড়বে না। কিন্তু ৫০ বছর পর আমাদের দেশের রোগীদের সঠিক চিকিৎসা দেওয়ার মতো দূরদর্শী পরিকল্পনা এবং অবকাঠামো আমাদের আছে কি? হাসপাতালগুলোর অবকাঠামো হওয়া উচিত পরিবেশবান্ধব, নারী, শিশু, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধীবান্ধব। সিঁড়িগুলো হতে হবে প্রশস্ত। এক সিঁড়ি থেকে পরবর্তী ধাপের সিঁড়ির উচ্চতা সাড়ে চার ইঞ্চির বেশি হওয়া উচিত নয়।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
এবার আসি পরিকল্পনা প্রসঙ্গে। একজন দক্ষ স্বাস্থ্য প্রশাসকের অন্যতম প্রধান গুণ হলো, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়নের সক্ষমতা। যেমন ধরুন, আমরা যদি ভাবি, ১০ বছর পরে প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালে কমপক্ষে ২০০ শয্যা থাকা উচিত, তাহলে এর অবকাঠামো, স্থাপত্য নকশা কী হবে, কোন কোন ডিপার্টমেন্ট থাকবে, বিভিন্ন বিভাগে কয়জন রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হবে—সেই পরিকল্পনা এখনই করতে হবে।
দক্ষ স্বাস্থ্য প্রশাসকের ভূমিকা
যেহেতু দেশের প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালকে ১০১ শয্যাবিশিষ্ট করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, তাই এই হাসপাতালগুলো নিয়ে স্বপ্ন দেখার এবং সঠিক পরিকল্পনা করার জন্য একজন দক্ষ স্বাস্থ্য প্রশাসকই সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি।
হাসপাতাল ভবনের বিভাগীয় নকশা প্রস্তাবনা
হাসপাতালের ইনফ্রাস্ট্রাকচার এমনভাবে তৈরি করতে হবে, যেন রোগীরা সহজেই যাতায়াত করতে পারে। প্রথম তলায় জরুরি বিভাগ, ফরেনসিক মেডিসিন ও টক্সিকোলজি বিভাগ, রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং বিভাগ, ল্যাবরেটরি মেডিসিন বিভাগ এবং বহির্বিভাগ থাকবে।
দ্বিতীয়তলায় থাকবে অন্তঃবিভাগ, অপারেশন থিয়েটার কমপ্লেক্স এবং রক্ত পরিসঞ্চালন বিভাগ। তৃতীয়তলায় প্রশাসন বিভাগ, পাবলিক হেলথ ও প্রিভেন্টিভ মেডিসিন বিভাগ, ইনফেকশন প্রিভেনশন এন্ড কন্ট্রোল বিভাগ, স্টোর, কনফারেন্স রুম, ট্রেনিং রুম, গেস্ট রুম ইত্যাদি থাকবে।
জেএইচ/এমইউ