২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:৫৭ পিএম

বিএমইউর সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে ৬টি সফল লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট, প্রস্তুত আরও ৪টি

বিএমইউর সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে ৬টি সফল লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট, প্রস্তুত আরও ৪টি
ছবি: মেডিভয়েস

মেডিভয়েস রিপোর্ট: বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে সফলভাবে ছয়টি লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট সার্জারি সম্পন্ন হয়েছে। একই সঙ্গে আরও চারটি লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টের জন্য রোগী নির্বাচন ও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি চলছে।

সরকারি বরাদ্দের আওতায় সম্পূর্ণ বিনামূল্যে রোগীদের এই জটিল ও ব্যয়বহুল অস্ত্রোপচার করা হয়েছে।

আজ মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর ) দুপুর ১২টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট সার্জারি কার্যক্রমের সাফল্য, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং এর পেছনের চ্যালেঞ্জের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন বিএমইউ ভাইস চ্যন্সেলর (ভিসি) অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী।

লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টেশনের সূচনা

অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী জানান, বিএমইউতে ২০১৯ সালে একটি এবং ২০২৩ সালে আরেকটি লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন বিচ্ছিন্নভাবে হলেও তাতে কোনো ধারাবাহিকতা ছিল না। এ বছরের এপ্রিল মাসে বর্তমান প্রশাসন দায়িত্ব গ্রহণের পর সংশ্লিষ্ট টিমের সঙ্গে বসে একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপদ্ধতি, দৃষ্টিভঙ্গি ও লক্ষ্য নির্ধারণ করে কার্যক্রম শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের জুলাই মাসের ৩ ও ৪ তারিখে পরপর দুই দিনে দুটি সফল ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন সম্পন্ন করা হয়। পরবর্তীতে সেপ্টেম্বর মাসের ১১ ও ১২ তারিখে আরও দু’জনের দেহে লিভার প্রতিস্থাপন করা হয়। এর আগে গত বছরে সেপ্টেম্বরে আরও ২টি সফল ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন সম্পন্ন হয়।

তিনি জানান, এই সফল কর্মযজ্ঞে দাতা (ডোনার) এবং গ্রহীতা (রেসিপিয়েন্ট) উভয়েই সুস্থ আছেন। ডোনাররা সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত আছেন এবং রেসিপিয়েন্টরা বর্তমানে দ্রুত সেরে উঠছেন।

বিনামূল্যে চিকিৎসা

বিএমইউ ভিসি বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রাপ্ত বিশেষ বাজেট বরাদ্দের মাধ্যমে রোগীদের সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এই জটিল অপারেশনগুলো সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে।

বিএমইউ ও এআইজির সমন্বিত কর্মযজ্ঞ

বিএমইউর প্রায় ১৮টি বিভাগ এবং ভারতের হায়দরাবাদের এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজির (এআইজি) একটি বিশেষজ্ঞ দলের যৌথ সমন্বয়ে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়িত হয়। এই প্রক্রিয়ায় মূল সার্জারি টিমের পাশাপাশি ওটি, পোস্ট-অপারেটিভ ও আইসিইউর নার্স এবং অন্যান্য কো-অর্ডিনেটরদের ত্যাগ ও কঠোর পরিশ্রমের বিশেষ প্রশংসা করেন তিনি।

বছরে ২৪টি ট্রান্সপ্ল্যান্টের লক্ষ

লিবার ট্রান্সপ্ল্যান্টেশনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে ভিসি জানান, ইতোমধ্যে পরবর্তী অস্ত্রোপচারের জন্য চারজন রোগী প্রস্তুত রয়েছেন এবং আগামী মাসের (অক্টোবর) ১০ থেকে ১২ তারিখের মধ্যে আরও দুটি সফল ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে।

তিনি ঘোষণা দেন, বিএমইউ এখন থেকে গড়ে প্রতি মাসে দুটি করে বছরে প্রায় ২৪টি লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট সম্পন্ন করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও পলিসি গ্রহণ করেছে।

প্রস্তুতি ও অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জ

কার্যক্রমের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি উল্লেখ করেন, লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন সার্জন বা হেপাটোবিলিয়ারি বিশেষজ্ঞ তৈরির প্রক্রিয়া অত্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি। আজকের এই সফল সার্জনরা অন্তত ১০ থেকে ১৫ বছর আগে থেকেই বিদেশে গিয়ে আন্তর্জাতিক টিমের সঙ্গে কাজ করে কঠোর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নিজেদের তৈরি করেছেন।

তিনি আরও জানান, একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ লিভার বিভাগ প্রতিষ্ঠা, নিয়মিত ফান্ডিং নিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক মানের অপারেশন থিয়েটার (ওটি) প্রস্তুত রাখা এবং দক্ষ জনবল তৈরি করা ছিল বিরাট চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে একেকটি অপারেশনের জন্য প্রায় ১৫০ ব্যাগ রক্ত ও রক্তের বিভিন্ন উপাদান প্রস্তুত রাখার জটিল প্রক্রিয়ার কথা তিনি তুলে ধরেন।

সংবাদ সম্মেলনে ট্রান্সপ্ল্যান্ট কার্যক্রম অব্যাহত রাখার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে অধ্যাপক সিদ্দিকী বলেন, ‘প্রতিটি পদক্ষেপেই চ্যালেঞ্জ ছিল এবং থাকবে, তবে আমরা সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে সফল হওয়ার জন্যই এত দূর এসেছি। আমরা উদ্যোগ না নিলে বিশ্ব বসে থাকবে না। আমি এবং আমার পুরো টিম যেকোনো দিক থেকে আসা সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে প্রস্তুত এবং আমরা আমাদের নির্ধারিত লক্ষ্য থেকে একচুলও নড়ব না।’ 

তিনি আরও জানান, প্রতিটি অস্ত্রোপচারের আগে দাতা ও গ্রহীতার প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা, শারীরিক সক্ষমতা যাচাই এবং যাবতীয় আইনগত ও নৈতিক প্রক্রিয়া যথাযথভাবে নিশ্চিত করা হয়। বর্তমানে সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট ক্লিনিকের মাধ্যমে রোগীদের ফলোআপ ও নিয়মিত সেবা চলছে।

তিনি আরও বলেন, রোগীদের আস্থা তৈরি করা চ্যালেঞ্জিং হলেও দৃঢ় মনোবল নিয়ে চিকিৎসাসেবার মান বাড়াতে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।

এ ধারাবাহিক কার্যক্রম দেশে উন্নত লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট সেবা সম্প্রসারণের পাশাপাশি দেশীয় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের দক্ষতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে জানিয়েছে কর্তপক্ষ।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বিএমইউ’র প্রো-ভিসি (প্রশাসন) ও ভারপ্রাপ্ত কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কালাম আজাদ, প্রো-ভিসি (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মো. মুজিবুর রহমান হাওলাদার, রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডা. মো. মোস্তফা কামাল এবং ভিসি’র একান্ত সচিব-১ অধ্যাপক ডা. মো. জাহাঙ্গীর হোসেন।

এ সময় অনুষদ ডিন ও পরিচালকদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন ও সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী, ডেন্টাল অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. সাখাওয়াত হোসেন সায়ন্থ, শিশু অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. মো. আতিয়ার রহমান, পরিচালক (হাসপাতাল) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. ইরতেকা রহমান এবং উপ-পরিচালক (জনসংযোগ-অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক ডা. মো. সাইফুল আজম রঞ্জু।

চিকিৎসক ও বিভাগীয় প্রধানদের মধ্যে অংশ নেন হেপাটোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. সাইফুল ইসলাম এলিন; হেপাটোবিলিয়ারি প্যানক্রিয়াটিক ও লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট সার্জারি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. বিধান চন্দ্র দাস, অধ্যাপক ডা. মো. মোহছেন চৌধুরী ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সাইফ উদ্দিন, নেফ্রোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এএইচ হামিদ আহম্মদ ও অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম, অ্যানেসথেসিয়া বিভাগের অধ্যাপক ডা. দিলীপ কুমার ভৌমিক, মনোরোগ বিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ডা. সালাহউদ্দিন কাউসার বিপ্লব, ভাইরোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. এসএম রাশেদ-উল ইসলাম, কার্ডিওলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. দীনে মুজাহিদ মো. ফারুক ওসমানী; রেডিওলজি এন্ড ইমেজিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মাহমুদ হাসান মোস্তফা কামাল এবং ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. খান আনিসুল ইসলাম ও ডা. নাহিদ সুলতানা।

এ ছাড়া অন্যান্যদের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন ডেপুটি নার্সিং সুপারিনটেনডেন্ট শারমিন আক্তার, কামরুন নাহার, নাজনীন নাহার মাহফুজা এবং সেন্টার ম্যানেজার মানিক মন্ডল প্রমুখ।

জেএইচ/এমইউ

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক
করোনা ও বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা

এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক