সাপাহার হাসপাতালে আধুনিকতার ছোঁয়া ও ডা. রুহুল আমিনের গল্প
মুন্নাফ রশিদ: সাপাহার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। নওগাঁর সীমান্তবর্তী মফস্বলের আধুনিক বাতিঘর। আধুনিক না হলেও আধুনিকতার কিছুই বাকি নেই এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। সাপাহার উপজেলার এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি এক সময় বর্ণহীন থাকলেও এখন সেজেছে নতুন রূপে। ছোঁয়া লেগেছে আধুনিকতার, ফুল আর সবুজ পল্লবে বইছে স্নিগ্ধ বাতাস।
মূলত ২০১৮ সালের মাঝামাঝি সময়ের পর থেকে পরিবর্তন হতে শুরু করে সাপাহার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি। যার মূল কারিগর সাপাহার উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) ডা. মো. রুহুল আমিন। ইতিমধ্যে তার এমন কাজের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকেও তাকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করা হয়েছে।
এছাড়াও এসব কাজের মূল্যায়ন হিসেবে ডা. রুহুল আমিনকে ২০১৯ সালে নওগাঁ জেলা প্রশাসন অ্যা্ওয়ার্ড ‘বেস্ট অফিসার’ পদক দেয়া হয়েছে। এছাড়া কমিউনিটি বেইজড হেলথ কেয়ারের (সিবিএইচসি) নিউ ক্রিয়েটর প্রজেক্টে তিনটি অবদানের মধ্যে ডা. মো. রুহুল আমিনের অবদানও স্থান পেয়েছে।
সাপাহার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সার্বিক বিষয়ে নওগাঁর সিভিল সার্জন ডা. এ বি এম আবু হানিফ মেডিভয়েসকে বলেন, ‘ডা. মো. রুহুল আমিন একজন পজিটিভ এবং ইনোভেটিভ ম্যানেজার। তার সকল কাজকর্ম অনেক গোছালো। অন্যান্য উপজেলার হাসপাতালগুলোর সাথে তার হাসপাতালের তুলনা করলে সেটি স্পষ্ট হয়ে যাবে।
তিনি হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন তিনি করে দেখিয়েছেন বলে মনে করেন নওগাঁর সিভিল সার্জন। তিনি বলেন, হাসপাতালের সৌন্দর্য্য বর্ধনের জন্য ডা. রুহুল আমিন উদাহরণ তৈরি করেছেন। তার এ ধরণের কাজকে আমরা সাধুবাদ জানাই।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালের আগস্টে ইউএইচএফপিও হিসাবে দ্বায়িত্ব নেন ডা. মো. রুহুল আমি। এরপর থেকেই মূলত বদলাতে শুরু করে সাপাহার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স।
হাসপাতালের উন্নয়নের গল্প
সাপাহার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নানা পরিবর্তনের বিষয়ে ডা. মো. রুহুল আমিন মেডিভয়েসকে বলেন, সাপাহার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মেডিকল অফিসার হিসেবে কর্মরত থাকা অবস্থায় সরকারি হাসপাতাল নিয়ে মানুষের মাঝে নেতিবাচক ধারণা কিভাবে দূর করা যায় সে বিষয়ে ভাবতে ভাবতে এক পর্যায়ে কাজে নেমে পড়ি।
হাসপাতালের দুটি বিষয় ঠিক থাকলে কোনও অভিযোগ থাকবে না বলে মনে করেন তিনি। তা হলো- সঠিক নিয়মে ওষুধ দেয়া এবং হাসপাতালের পরিবেশ সুন্দর রাখা।
শুধু এই দুটি ক্ষেত্রেই নয়, একটি সুন্দর ও পরিপাটি সেবা দান কেন্দ্র তৈরির জন্য কাজ শুরু করেন ডা. মো. রুহুল আমিন।
হাসপাতালের পরিবর্তন যেভাবে শুরু
হাসপাতালের নানা পরিবর্তনের বিষয়ে তিনি মেডিভয়েসকে বলেন, হাসপাতালে রাউন্ডে যাওয়ার আগে আমি ঘোষণা দিলাম, যদি কেউ ময়লা-অবর্জনা নির্দ্দিষ্ট বিনের বাইরে ফেলে তাহলে সে রোগীকে আমি দেখবো না। এটি সবাই মানতে শুরু করলো। আর তখন থেকে পরিবর্তনটাও শুরু হয়ে গেল।
এছাড়া ইউএইচএফপিও হিসেবে দ্বায়িত্ব গ্রহণের আগে ডা. মো. রুহুল আমিন একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছিলেন যে হাসপাতালে কি কি পরিবর্তন দরকার। পাশাপাশি হাসপাতালের পরিবেশ এবং সেবার মানের কথা বিবেচনা করে একটি স্লোগান নির্ধারণ করেন তিনি। স্লোগানটি হলো- ‘সুন্দর কর্ম পরিবেশ, সর্বোত্তম সেবা’।
তার কর্মপরিকল্পনাগুলোকে এগিয়ে নিতে তিনি কমপক্ষে ২০টি হাসপাতালকে অনুসরণ করা শুরু করলেন। ওই হাসপাতালগুলোর কর্মপরিকল্পনা যাচাই করে সাপাহার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিকল্পনা নির্ধারণ করেন ডা. রুহুল আমিন। এরপর হাঠতে থাকেন বাস্তবায়ন ও প্রয়োগের দিকে।
পরিবর্তনমুখী উদ্যোগ
প্রথমেই তিনি হাসপাতালের শিশুদের জন্য এবং সার্বিক পরিবেশ নিয়ে পরিকল্পনা নির্ধারণ করেন। মেডিভয়েসকে ডা. মো. রুহুল আমিন বলেন, হাসপাতালটিকে সম্পূর্ণ শিশু বান্ধব হাসপাতালে রুপন্তর করতে সক্ষম হয়েছি। দেয়ালে বিভিন্ন শিশুতোষ কার্টুনের পেইন্টিংসহ সংস্কারের মাধ্যমে হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডটিকে সম্পূর্ণ নতুন রূপ দেয়া হয়। এর ফলে শিশু ওয়ার্ডে যেসব বাচ্চারা ভর্তি থাকবে তারা কিছুটা হলেও বিনোদন পাবে।

এছাড়া হাসপাতালে ভর্তি রোগীর বাচ্চার কথা চিন্তা করে হাসপাতালে খেলার সামগ্রীসহ একটি কিডস জোন করা হয়েছে বলে জানান তিনি। ডা. রুহুল আমিন বলেন, হাসপাতালের স্টাফদের ডিউটির কথা বিবেচনা করে তাদের বাচ্চাদের জন্য আলাদা একটি শিশু পার্ক তৈরী করা হয়েছে।
ডা. মো. রুহুল আমিন বলেন, এরপর আমি হাসপাতালের সৌন্দর্য বর্ধনের কাজ শুরু করি। সাধারণত সরকারি হাসপাতালে একটি বাগান থাকলেও আমার হাসপাতালে আরও চারটি বাগান করেছি। ফলে হাসপাতালের সৌন্দর্য অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে।
তিনি বলেন, হাসপাতালের নির্ধারিত ওই বাগানে পর্যাপ্ত গাছ না থাকায় সেটি পূরণ করার পর হাসপাতালের ফাঁকা পড়ে থাকা জায়গাটিকে পার্কে রুপান্তর করার পরিকল্পনা করলাম। ফুল গাছের পাশাপাশি পরিত্যাক্ত বোতল ও টায়ার দিয়ে পার্কটিকে সাজানো হলো। যেখানে একটি পুকুর এবং তার পাড়ে বসার স্থান করা হয়েছে। যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘থিম পার্ক’।
শুধু তাই না, হাসপাতালের প্রতিটি ফ্লোরে রয়েছে পরিবশে বান্ধব গাছ। এমনকি রোগীদের ওয়ার্ডগুলোসহ প্রতিটি কক্ষেই গাছ রয়েছে। এছাড়া রোগীদের খাবার জন্য টেবিলসহ নির্ধারিত একটি জায়গা করে দেয়া হয়েছে।

ডেলিভারি কমপ্লেক্স স্থাপন
ডা. রুহুল আমিন বলেন, হাসপাতালে প্রসূতী মায়েদের জন্য নয় ফুট এবং পাঁচ ফুট আকারের একটি ডেলিভারি কক্ষ ছিল। যেটি ডেলিভারির জন্য একেবারেই যথেষ্ট জায়গা নয়। ফলে হাসপাতালের অব্যবহৃত একটি রুমকে ব্যবহার উপযোগী করে ডেলিভারির জন্য নির্ধারণ করা হলো। পাশাপাশি চারটি বেড বসিয়ে একটি ডেলিভারি কমপ্লেক্স করা হয়েছে। যেখানে নির্ধারিত ছয় জন নার্সকে নির্দিষ্ট শিডিউলের মাধ্যমে ডিউটি দেয়া হয়।
মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য স্থান নির্ধারণ
উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সাধারণত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য একটিমাত্র সংরক্ষিত বেড থাকে। ডা. রুহুল আমিন মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নির্ধারিত ওই বেডটিকে থাই গ্লাস এবং ভালো পর্দা দিয়ে ঘিরে পুরুষ ও মহিলাদের জন্য পৃথক দুটি বেড করে দিয়েছেন।
হাসপাতালের অবকাঠামোগত পরিবর্তন
সাপাহার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ইউএইচএফপিও ডা. রুহুল আমিনের হাত ধরে হাসপাতালের কিছু অবকাঠামোগত পরিবর্তনও এসেছে। তিনি বলেন, হাসপাতালের প্রবেশ মুখে একটি বড় কালো সাইনবোর্ড দীর্ঘ দিন অকেজো পড়েছিল। ওই সাইনবোর্ডটিকে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা মানচিত্রে রুপান্তর করা হয়েছে। অর্থাৎ সাপাহার উপজেলার কোথায় কোন ধরণের স্বাস্থ্য সেবার ব্যবস্থা আছে তা একনজরে দেখে নেয়া যাবে।
সাপাহার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বেসরকারি হাসপাতালের মতো একটি রিসিপশন এবং একটি হেলপ ডেস্ক আছে। এছাড়া জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতি নিয়ে একটি বঙ্গবন্ধু কর্ণার তৈরি করা হয়েছে। পাশাপাশি দুস্থ মানুষের কথা বিবেচনা করে একটি মানবতার দেয়াল তৈরি করা হয়েছে হাসপাতালটিতে।
ডা. রুহুল আমিন বলেন, সাপাহার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একটি ডেন্টাল এক্সরে মেশিন ও HbA1C মেশিন রয়েছে রয়েছে। যা উপজেলা পর্যায়ে সাপাহার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সই প্রথম।
অবহেলিত যন্ত্রপাতি
ডা. রুহুল আমিন বলেন, হাসপাতালটিতে একটি এক্সরে মেশিন সাড়ে তিন বছর নষ্ট পড়েছিল। একটি জেনারেটর সাড়ে ১৭ বছর নষ্ট পড়েছিল, এসি নষ্ট ছিল সাড়ে আট বছর।
তিনি বলেন, ইউএইচএফপিও হিসেবে দ্বায়িত্ব নেয়ার পর আমার লক্ষ্য ছিল পরবর্তি এক বছরের মধ্যে এগুলো সচল করা। যা মাত্র সাড়ে চার মাসের মধ্যে সচল করা হয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালের কোনও যন্ত্রপাতি অবহেলা বা নষ্ট হয়ে পড়ে নেই। এছাড়া হাসপাতালের কোনও একটি লাইট নষ্ট হলে তা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ঠিক করা হয়।
হাসপাতালের পরিবেশ সুন্দরের কৌশল
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য হাসপাতালের সকল স্টাফদের নিয়ে সাপ্তাহিক একটি পরিচ্ছন্নতা দিবস পালন করা হয় হাসপাতালটিতে। এছাড়া এখানে বহিরাগতদের গাড়ি বা মোটরসাইকেল রাখার জন্য দৃষ্টিনন্দন একটি গ্যারেজ বানানো হয়েছে।
এমন উন্নয়নমূলক কাজ করার ক্ষেত্রে সবার সহযোগিতা কামনা করেন ডা. রুহুল আমিন। তিনি বলেন, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় বরাদ্দকৃত বাজেটের আট থেকে ১৫ শাতাংশ স্বাস্থ্যখাতের জন্য বরাদ্দ থাকে। যা আমরা অনেকেই জানি না। ফলে এর পূর্ণ ব্যবহার হয়। অন্য একটা কারণ হলো এ বাজেটের সাথে সমাজ সেবা বাজেটও জড়িত। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ বরাদ্দকৃত অর্থ সমাজসেবা খাতেই চলে যায়। তবে আমি সেটি যু্ক্তি দিয়ে আদায় করতে সক্ষম হয়েছি।
ডা. রুহুল আমিন বলেন, ‘আমি মনে করি আমার বাসায় যেমন পরিবেশ, কর্মক্ষেত্রেও তেমন পরিবেশ থাকা উচিত। ফলে যারা সেবা দিবে এবং যারা সেবা গ্রহণ করবে উভয়পক্ষই উপকৃত হবে।’
তিনি বলেন, ‘এগুলো করতে গেলে নিজেরও কিছু অর্থ খরচ হয়। কেননা সরকার তো আর বাগান বা পার্ক করার জন্য অর্থ দেবে না। ফলে পরিচ্ছন্নতার জন্য জন্য যে বরাদ্দ আসে সেটিকে ঘুরিয়ে ব্যবহার করতে হবে।’