এফসিপিএসে নতুন নীতিমালা
‘মেধাক্রমের ভিত্তিতে ভাতা সীমাবদ্ধ হলে প্রশিক্ষণার্থীরা আর্থিক অনিশ্চয়তায় পড়বেন’
মেডিভয়েস রিপোর্ট: বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ান্স অ্যান্ড সার্জন্সের (বিসিপিএস) এফসিপিএস কোর্সে উত্তীর্ণ প্রশিক্ষণার্থীদের ভাতা সীমাবদ্ধ করার নীতি একজন প্রশিক্ষণার্থী চিকিৎসককে আর্থিক অনিশ্চয়তা ও পেশাগত সীমাবদ্ধতায় ঠেলে দেবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) কার্যনির্বাহী সদস্য সর্ব মিত্র চাকমা।
এফসিপিএসের নতুন প্রশিক্ষণ নীতিমালা নিয়ে বুধবার (৩ জুন) নিজের ফেসবুক ওয়ালে দেওয়া এক পোস্টে এই আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
ডাকসুর এই কার্যনির্বাহী সদস্য বলেন, বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ান্স অ্যান্ড সার্জন্স (বিসিপিএস) কর্তৃক জারিকৃত নতুন এফসিপিএস প্রশিক্ষণ নীতিমালার কয়েকটি শর্ত গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। দেশের স্বাস্থ্যখাতের অন্যতম চালিকাশক্তি তরুণ চিকিৎসকদের প্রতি এমন নীতিগত দৃষ্টিভঙ্গি কেবল হতাশাজনক নয়, বরং ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্যও অশনিসংকেত।
তিনি আরও বলেন, নীতিমালায় প্রশিক্ষণরত চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বার পরিচালনা, সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান গ্রহণ এবং অন্য কোনো আয়ের উৎসের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার সুযোগ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মেধাক্রমের ভিত্তিতে ভাতা সীমাবদ্ধ করা, উৎসবভাতা ও অন্যান্য আর্থিক প্রণোদনা থেকে বঞ্চিত করা এবং দীর্ঘ সময় বাধ্যতামূলক কর্মস্থলে অবস্থানের শর্ত আরোপ করা হয়েছে। এসব বিধান একজন চিকিৎসককে কার্যত আর্থিক অনিশ্চয়তা ও পেশাগত সীমাবদ্ধতার মধ্যে ঠেলে দেয়।
‘বাস্তবতা হলো, একজন চিকিৎসক বিশেষজ্ঞ হওয়ার আগে দীর্ঘ শিক্ষাজীবন, কঠোর প্রশিক্ষণ এবং উল্লেখযোগ্য আর্থিক ব্যয় বহন করেন। সেই পর্যায়ে তার ন্যূনতম আর্থিক নিরাপত্তা, মর্যাদা ও জীবনযাত্রার বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে এমন শর্ত চাপিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। একজন প্রশিক্ষণরত চিকিৎসকের কাছ থেকে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব প্রত্যাশা করা হবে, কিন্তু তার বিনিময়ে ন্যূনতম সম্মান ও নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা হবে না, এমন নীতি ন্যায়সঙ্গত নয়’—বলেন তিনি।
সর্ব মিত্র বলেন, ‘আমি মনে করি, দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে চিকিৎসকদের অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে। যে নীতিমালা তরুণ চিকিৎসকদের নিরুৎসাহিত করে, তাদের আর্থিকভাবে দুর্বল করে এবং পেশাগত স্বাধীনতাকে সংকুচিত করে, তা দীর্ঘমেয়াদে দক্ষ ও প্রতিযোগিতাশীল বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তৈরির পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে।’
‘অতএব, বিসিপিএসের প্রতি জোরালো আহ্বান জানাচ্ছি, চিকিৎসক সমাজের যৌক্তিক উদ্বেগকে গুরুত্ব দিয়ে এই বিতর্কিত শর্তসমূহ অবিলম্বে পুনর্বিবেচনা করা হোক। দেশের স্বাস্থ্যখাতকে শক্তিশালী করতে হলে প্রশিক্ষণরত চিকিৎসকদের ন্যায্য অধিকার, মর্যাদা এবং আর্থিক বাস্তবতাকে স্বীকৃতি দিতে হবে’—দাবি ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্যের।
এর আগে গত ১৯ মে বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ান্স অ্যান্ড সার্জন্সের (বিসিপিএস) ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে জানুয়ারি থেকে জুন শিক্ষাবর্ষে এফসিপিএস-১ম পর্বে উত্তীর্ণ ৫ হাজার চার জন প্রশিক্ষণার্থীর পদায়ন ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত নতুন নীতিমালা অনুমোদন করে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়।
এ ব্যাপারে চিকিৎসা শিক্ষা-১ শাখার এক প্রজ্ঞাপনে জানানো হয় প্রশিক্ষণার্থীর পদায়ন ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত নতুন নীতিমালা প্রণয়নের লক্ষ্যে গঠিত কমিটির তৃতীয় সভা চলতি বছরের ১২ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হয় এবং সভায় গৃহীত সিদ্ধান্তসমূহ সচিবের অনুমোদন লাভ করে।
নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, এফসিপিএস ১ম পর্বে উত্তীর্ণ প্রশিক্ষণার্থীদের পদায়নের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর নির্ধারিত সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ক্যাটাগরি বিন্যাস অনুসরণ করা হবে। ‘এ’ ক্যাটাগরির প্রতিষ্ঠানে প্রতি ইউনিটে সর্বোচ্চ ২৪ জন, ‘বি’ ও ‘সি’ ক্যাটাগরিতে ২০ জন এবং ‘ডি’ ক্যাটাগরিতে ১৬ জন প্রশিক্ষণার্থী রাখার সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া প্রশিক্ষক হিসেবে অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক এবং নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে এফসিপিএস বা সমমান ডিগ্রিধারী সহকারী অধ্যাপক ও সদর হাসপাতালের কনসালটেন্টদের বিবেচনা করা হবে। ইউনিট প্রধানের তত্ত্বাবধানেই প্রশিক্ষণার্থী নিয়োগ দেওয়া হবে।
নীতিমালার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক, প্রশিক্ষণার্থীদের মেধা ও পছন্দের ভিত্তিতে সম্পূর্ণ অটোমেশন পদ্ধতিতে পদায়ন নিশ্চিত করা। অটোমেশন প্রক্রিয়ার বাইরে কোনো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রশিক্ষণার্থী গ্রহণ করতে পারবে না।
এ ছাড়া পদায়নপ্রাপ্ত প্রশিক্ষণার্থীদের নিজ নিজ উপজেলায় পাঁচ বছরের মধ্যে ন্যূনতম দুই বছর কর্মরত বা প্রশিক্ষণে থাকার শর্ত আরোপ করা হয়েছে।
প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়েছে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মেডিসিন ও গাইনি অ্যান্ড অবস বিভাগে অতিরিক্ত প্রশিক্ষণার্থীর চাপ কমানো না পর্যন্ত নতুন পদায়ন বন্ধ থাকবে।
সরকারি ভাতাভুক্ত প্রশিক্ষণার্থীদের ক্ষেত্রে প্রতি সেশনে সর্বোচ্চ এক হাজার জনকে মেধার ভিত্তিতে নির্বাচিত করা হবে। শুধুমাত্র অটোমেশন প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত প্রশিক্ষণার্থীরাই এ ভাতার জন্য বিবেচিত হবেন।
জাতীয় প্রয়োজন বিবেচনায় এনাটমি, ফিজিওলজি, ফার্মাকোলজি, বায়োকেমিস্ট্রি, প্যাথলজি, মাইক্রোবায়োলজি, ফরেনসিক মেডিসিন, কমিউনিটি মেডিসিন, এনেস্থেসিওলজি, ডার্মাটোলজি, হেমাটোলজি, সাইকিয়াট্রি, ট্রান্সফিউশন মেডিসিন, ফ্যামিলি মেডিসিন, ফিজিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন, রেডিওথেরাপি এবং রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিংসহ কয়েকটি বিষয়ে পদায়নের ক্ষেত্রে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
পর্যায়ক্রমে অন্যান্য বিষয়ের প্রশিক্ষণার্থীদের অবশিষ্ট আসনের বিপরীতে পছন্দ ও মেধাক্রম অনুযায়ী পদায়ন করা হবে। এই প্রক্রিয়ায় যারা নির্বাচিত হতে ব্যর্থ হবেন, তারা পরবর্তী সেশনে অগ্রাধিকার পাবেন বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এমইউ/