বেসামাল খাবার-দাবার যেভাবে স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়ায়
ঈদ উৎসব, তাই যতো পারো খাও। ঘরে খাও, বাইরে খাও, দাওয়াত দিয়ে খাও, দাওয়াতে গিয়ে খাও। আর চারপাশের মানুষের খান, খান, কোরবানির গোস্ত খেলে কিচ্ছু হয় না—এ রকম অযৌক্তিক, অপরিণামদর্শী কথার তো শেষই নেই। কি অদ্ভুত মাইন্ড সেটআপ!
ফলশ্রুতিতে হার্ট অ্যাটাক। যে কারণে ঈদের পর দিন করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) হৃদরোগীদের ঢল।
ইসলামি রাষ্ট্রের প্রথম ইহুদি ডাক্তার যখন জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা এতো সুস্থ থাকো কীভাবে?
উত্তর হলো, 'আমরা এমন এক জাতি, যারা ক্ষুধা না লাগলে খাই না; আর যখন খাই, তখন পেট ভরে খাই না।’ (মিনহাজুল মুসলিম: ১৬৪)।
ক্ষুধা না লাগলে না খাওয়া, পেট খালি রাখা, কিছুটা সময় ক্ষুধার্ত থাকা এটাও ইসলামের শিক্ষা, একটা গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ।
'মানুষ পেটের চেয়ে অধিক নিকৃষ্ট কোনো পাত্র পূর্ণ করে না। মেরুদণ্ড সোজা রাখতে পারে, এমন কয়েক গ্রাস খাবারই আদম সন্তানের জন্য যথেষ্ট। তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন হলে পাকস্থলীর এক-তৃতীয়াংশ খাদ্যের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ পানীয়ের জন্য এবং এক-তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য রাখবে।’ (ইবনে মাজাহ)
সাইন্সও কিন্তু তাই বলে। পেট পুরে খেলে হাস ফাঁস লাগে। হজমের জন্য পাকস্থলী প্রয়োজনীয় মুভমেন্ট করতে পারে না। পাকস্থলীতে থাকা ১-২ মাত্রার তীব্র হাই্ড্রোক্লোরিক এসিড মিশ্রিত কিছু খাবার পাকস্থলীর উপরের দরোজা ভেদ করে উঠে আসে গলনালিতে। শুরু হয় প্রদাহ—রিফ্লাক্স ইসোফেগাইটিস।
ভরপেটে হৃদরোগীদের বুকের ব্যথা বাড়ে, হাঁটতে কষ্ট হয়। রক্ত ডাইভার্টেট হয় পাকস্থলীর দিকে, তাই চর্বির দলা জমে সরু হয়ে যাওয়া করোনারি রক্তনালীতে রক্তের চাপ আরো কমে যায়। শুরু হয় চিনচিনে ব্যথা।
গরু ও খাসির সেচুরেটেড ফ্যাট বানের স্রোতের মতো ঢুকতে থাকে আমাদের লাইফলাইন করোনারি রক্তনালীতে। আগে থেকে জমে থাকা চর্বির দলা হঠাৎ ফেটে যায়। তখনই বিপত্তি। ফাটা অংশে রক্ত জমাট বেঁধে বন্ধ হয়ে যায় পুরো রক্তনালী। থেমে যায় রক্তের স্রোত। অক্সিজেন ও খাদ্যের অভাবে পঁচতে শুরু করে হার্টের মাংশ। এটাই মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কসন, এম আই, হার্ট অ্যাটাক।
দুই খাবারের মাঝখানে পাকস্থলী খালি রাখলে খাদ্যনালী, লিভার ও অগ্নাশয় বিশ্রাম পায়। বিটা সেল বিশ্রাম নিয়ে সতেজ হয়, তৈরি করে পর্যাপ্ত ইনসুলিন, ঠেকায় মরণব্যধী ডায়াবেটিস। আলফা সেল গ্লুকাগন তৈরি করে ঝরায় শরীরের মেদ। তৈরি করে সুঠাম দেহ।
পাকস্থলীর তীব্র এসিড হাড় ও দাঁতসহ কঠিন বস্তু গলিয়ে দেয়। কিন্তু ক্ষুদ্রান্ত্রের পাতলা টিউব সেই এসিডের তীব্রতা সহ্য করতে অক্ষম। তাই মহান স্রষ্টা এক অদ্ভুত সাইন্টিফিক সেটআপ দিয়ে রেখেছেন। এসিড যুক্ত খাবার পাকস্থলীর শেষ সীমানার দরজাটা পেরোনোর সাথে সাথে পিত্তথলিটা সংকুচিত হয়, ছলাৎ করে এসে পড়ে তীব্র ক্ষারীয় পিত্তরস। মুহূর্তেই এসিড আর ক্ষার মিলে হয়ে যায় নিউট্রাল পানি ও লবন, এক সহনীয় দ্রবন।
খালি পেটেই পিত্তথলি পূর্ণ থাকে পিত্ত রসে। এজন্যই আল্ট্রাসনোগ্রাফির ডাক্তার সাহেবগণ খালি পেটে আসতে বলেন। পূর্ণ পিত্তথলিটায় কোন পাথর কিংবা পলিপ থাকলে সহজেই দেখা যায়।
‘অতি খেলে বাড়ে মেদ, অনাহারে বাড়ে খেদ’—হিরক রাজাকে নিয়ে হাসাহাসি করলেও কথাটা কিন্তু মন্দ বলেননি তিনি।