অধ্যাপক ডা. এম এ সামাদ
প্রধান, কিডনি রোগ বিভাগ,
আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
২৫ মার্চ, ২০২২ ১০:০২ এএম
মেদহীন ও ধূমপানমুক্ত জীবনে মিলবে কিডনির সুরক্ষা
কিডনি রোগের চিকিৎসা খুবই ব্যয় বহুল। আমাদের দেশে শতকরা ১০ ভাগ লোকও এ রোগের ব্যয়ভার বহন করতে পারে না। ডায়ালাইসিস করা অনেক কষ্টের। তাই সচেতনতার মাধ্যমে রোগটি প্রতিরোধ করতে হবে। এ রোগের ভয়াবহতা থেকে মুক্তি পেতে জীবন-যাপনে সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। এজন্য সরকার, মিডিয়া ও পাঠ্যপুস্তকের মাধ্যমে সচেতনতার ব্যাপক প্রচার করা দরকার।
কিডনি রোগের বেশিরভাগ কারণ জীবন-যাপন পদ্ধতির সঙ্গে জড়িত। অস্বাস্থ্যকর জীবন-যাপনের ফলে এ রোগটি বেশি হয়। তিনটি কারণে প্রায় আশি ভাগ কিডনি বিকল হয়ে থাকে। যথা- ১. ডায়াবেটিস ২. উচ্চ রক্তচাপ ৩. নেফ্রাইটিস।
ডায়াবেটিস জীবন-যাপন পদ্ধতির সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। যারা অলস থাকে, যাদের ওজন বেশি, জাঙ্কফুড খায় (জাঙ্কফুডে চিনি, লবণ ও চর্বি অধিক মাত্রায় থাকে) ও অতিরিক্ত খাবার খায়, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাদের ডায়াবেটিস হয়। যারা বেশি কাঁচা লবণ খায়, কোলেস্টেরল যুক্ত খাবার খায়, যাদের ওজন বেশি ও অলস জীবন যাপন করে তাদের উচ্চ রক্তচাপ হয়। এসব থেকে পরবর্তীতে কিডনি রোগ হয়।
ধূমপান কিডনি অকেজো করে
মানব দেহের ২৫০ ভাগের একভাগ ওজন হলো কিডনি। কিডনিতে সারা দেহের চারভাগের একভাগ রক্ত প্রবাহিত হয়। অর্থাৎ কিডনিতে রক্তনালী অনেক বেশি থাকে। ধূমপানের সাথে কিডনি অকেজো সরাসরি যুক্ত। ধূমপান সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে রক্তনালীর। এটি রক্তনালীকে অকেজো করে। ফলে হার্টের অসুখ হয়। হার্ট অ্যাটাকের প্রধান ঝুঁকির কারণ ধূমপান। যখন ধূমপান করা হয় তখন হার্টের রক্তনালী অকেজো হয়ে সেই সঙ্গে কিডনির রক্তনালীও অকেজো হয়ে যায়। ধূমপান বদঅভ্যাস, এটি কিডনি, হার্টকে ধ্বংস করছে, ক্যান্সার হচ্ছে। অথচ চাইলে সহজে বাজে অভ্যাসটি ত্যাগ করা যায়।
অতিরিক্ত ওজন
অনেকে রেস্তুরেন্টে গিয়ে ফাস্টফুড খায়। এসব খাবারের মধ্যে মাখন, ক্রিম ও চর্বিযুক্ত মাংস ভরপুর থাকে। ফলে মানুষ ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপসহ নানা রোগে আক্রান্ত হয়। কারণ, রেস্তুরেন্ট থেকে বাসায় ফিরে কম্পিউটার ও মোবাইল টিপে সময় পার করেন, কোনো ব্যায়াম করেন না, এতে ওজন বেড়ে যায়। ওজন সরাসরি কিডনিকে অকার্যকর করে। ওজনের কারণে কিডনির যে ছাকনি থাকে সেটি নষ্ট হয়ে যায়। ওজন বেশি হলে শরীরের হাড় ক্ষয় হয়ে যায়, শরীরের ব্যথা করে। শুরু হয় ব্যথার ওষুধ সেবন। ব্যথার ওষুধ সেবনের ফলে কিডনি অকেজো হয়। এ ছাড়া ওজন বেশি হলে ডায়াবেটিস হয়, প্রেসার বেড়ে যায়, হার্ট ডিজিজ হয়। ফলে কিডনি অকেজো হয়। হার্টের সঙ্গে কিডনির গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে, হার্টে অসুখ হলে কিডনিতে সরাসরি আক্রমণ হয়। ওজন এভাবে মানব দেহের ক্ষতি করে।
ব্যথার ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
ব্যথার ওষুধ খাওয়া খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। অনেকে যেকোনো ব্যথা হলেই ব্যথার ওষুধ খায়। যেমন: কোমরে, পেটে ও মাথা ব্যথা হলেই ব্যথার ওষুধ খায়। যাদের একটু বয়স হয়েছে এবং হাঁটু ও কোমরে ব্যথা আছে, তারা বছরের পর বছর ব্যথার ওষুধ খেতে থাকে। এ ব্যথার ওষুধ কিডনি অকেজো করে দেয়।
সময়মতো চিকিৎসা
কিডনিতে পাথর ধরা পড়লে সময়মত চিকিৎসা না করালে কিডনি অকেজো হয়ে যায়। বারবার কিডনিতে ইনফেকশন হচ্ছে অথচ সময়মতো চিকিৎসা করছেন না। এতে কিডনি অকেজো হয়ে যায়। আবার জন্মগ্রহণের সময় অনেক শিশু ছোট ছোট ত্রুটি নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। যেমন: প্রস্রাবের নালীতে একটি ভাল্ব থাকে। এ ভাল্ব থাকার কারণে শিশু প্রস্রাব করতে অনেক কষ্ট হয়। চাপ দিয়ে প্রস্রাব করতে হয়। প্রস্রাব সামনের দিকে না এসে থলি থেকে উল্টো কিডনিতে চলে যায়। এতে কিডনি আস্তে আস্তে বেলুনের মতো ফুলে যায়, ফলে কিডনি অকেজো হয়ে যায়। অথচ এটি অপারেশন করতে মাত্র ছয় মিনিট লাগে। যদি এটি অপারেশন করা হয় তাহলে কিডনির কোনো ক্ষতি হয় না। অনেক সময় শিশুদের কিডনি থেকে হার্টের নালী সরু হয়ে আসে। এর ফলে, কিডনি রোগ হয়। সময়মতো চিহিৃত করে চিকিৎসা করতে পারলে শিশুদের আর কিডনি নষ্ট হয় না। এক্ষেত্রে মা-বাবাকে সচেতন হওয়া জরুরি। দেশে অসংক্রমক রোগের কারণে ৭০ ভাগের মানুষের মৃত্যু হয়। অথচ নিয়মিত ব্যায়াম করলে এসব রোগ প্রতিরোধ করা যায়। সচেতন হলে সংক্রমক রোগগুলোর ৮০ ভাগ প্রতিরোধ করা যায়। যেমন: খাবার পূর্বে ভাল করে হাত ধুয়ে নেওয়া, খাবার-দাবার ঢেকে রাখা, মাস্ক পরিধান করা।
সরকারের করণীয়
ইউনিয়ন পর্যায়ে যেসব কমিউনিটি ক্লিনিক আছে সেখানে দুই-তিনটা পরীক্ষা করার মতো ব্যবস্থা করতে হবে। যেমন: জিএফআর (গ্লোমেরুলার ফিলট্রেশন রেট), ক্রিয়েটিনিন ও ইউরিন পরীক্ষা। এসব পরীক্ষা সহজে করা যায়। এগুলোর জন্য তেমন কোনো যন্ত্রপাতি লাগে না। এসব পরীক্ষার মাধ্যমে ৮০ ভাগ রোগ প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়ে। পাশাপাশি কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে কিডনি রোগ প্রতিরোধে সচেতনাতার জন্য ব্যাপক প্রচার করতে হবে। যেমন: লক্ষণ গুলো কি? কারা ঝুঁকিতে রয়েছে? প্রতিরোধে করণীয় কি? এসব বিষয়ে একবারেই গ্রাম পর্যায়ে বুঝাতে হবে।
রোগীরা যাতে দ্রুত চিকিৎসা নিতে পারনে, এজন্য থানা পর্যায়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। এবং জেলা হাসপাতালগুলো অবশ্যই নেফ্রোলজিস্ট রাখার ব্যবস্থা করা। সেই সঙ্গে ডায়ালাইসিস সেন্টার স্থাপন করা। কিডনির বায়োপসি লাগানোর ব্যবস্থা থাকতে হবে। জাতীয় পর্যায়ে একটি গাইড লাইন তৈরি করতে হবে। সে অনুসারে চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। অর্থাৎ প্রাথমিক অবস্থায় কিভাবে চিকিৎসা দিবে? কতদিন পরপর এ বিষয়ে ফলোআপ করতে হবে?
যেসব রোগীর হিমো ডায়ালাইসিস দিতে হয় তাদের সপ্তাহে তিনবার করে ডায়ালাইসিস দিতে হয়। প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে তিনবার সদরে হাসপাতালে আসতে রোগীদের অনেক কষ্ট হয়। এজন্য প্রতিটি থানায় অন্তত ছয় বেডের একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা দরকার। যেখানে এসে প্রতিটি রোগী ডায়ালাইসিস দিতে পারে। এ ছাড়া সদর হাসপাতালে একটি বড় ডায়ালাইসিস কেন্দ্র স্থাপন করা।
কিডনি একেবারে অকেজো হয়ে গেলে চিকিৎসা হলো প্রতিস্থাপন। কাজে কিডনি সংযোজনের জন্য জুনিয়র চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং যারা প্রতিস্থাপন করতেছেনে তাদেরকে সহযোগীতা করা। বড় বড় মেডিকেল কলেজগুলোতে কিডনি প্রতিস্থাপন চালু করা।
বিদ্যমান আইনে শুধু নিকট আত্মীয় থেকে কিডনি দেওয়ার বিধান রয়েছে। এক্ষেত্রে দেখা যায়, ডোনার যখন কিডনি দিতে চায় তখন পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে হয়। এতে অনেক কিছু মিলতে হয় কিন্তু চূড়ান্ত পর্যায়ে অনেক সময় কিছু একটা মিলে না বা কোনো জটিলতা তৈরি হয় তখন আর প্রতিস্থাপন করা যায় না। এজন্য নিকট আত্মীয় ছাড়াও অন্য যে কেউ চাইলে যাতে কিডনি দিতে পারে সেটি বিদ্যামান আইনে সংযুক্ত করা।
দেশে চুরি করে কিডনি বিক্রি করা হয়। এটি রোধে সরকারকে দায়িত্ব নিতে হবে। যেমন: ইরানের মতো রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সরকারিভাবে বৈধভাবে যে কেউ কিডনি দান বা বিক্রি করতে পারে সেই ব্যবস্থা করা। তাহলে যারা কিডনি চুরি করে ক্রয়-বিক্রয় করে ধান্ধা করে যাচ্ছে সেটি রোধ করা যাবে।
আমেরিকার মতো দেশ বলছে, চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধ জরুরি। কারণ চিকিৎসার ব্যয় অনেক বেশি। আমাদের দেশের সরকারও প্রতিরোধের উপর গুরুত্ব দিচ্ছে। কিন্তু এটি কতটুকু কার্যকর হবে তা নির্ভর করছে এ কাজের সঙ্গে সরকারের কর্তাব্যক্তি যারা সংশ্লিষ্ট আছেন তাদের মনোযোগের ওপর।
এএইচ