ডা. মুহসিন আব্দুল্লাহ

ডা. মুহসিন আব্দুল্লাহ

হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ, কলামিস্ট


১৮ জানুয়ারী, ২০১৭ ১০:৪০ এএম

স্বাস্থ্যসেবা আইনের খসড়া: অস্পষ্ট, খারাপ ও ভালো দিকসমূহ

স্বাস্থ্যসেবা আইনের খসড়া: অস্পষ্ট, খারাপ ও ভালো দিকসমূহ

স্বাস্থ্যখাতে, বিশেষ করে বেসরকারি খাতে চিকিৎসা ব্যবস্থায় শৃংখলা প্রতিষ্ঠার জন্য সরকার এ সংক্রান্ত নতুন আইন করতে যাচ্ছে । 'চিকিৎসা সেবা আইন, ২০১৬' নামে আইনটির একটি খসড়া প্রকাশ করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় । আইনটিতে বেশ কিছু ভালো দিক আছে । তবে কিছু বিষয়ে এখনো রয়ে গেছে অস্পষ্টতা । কিছু বিষয় অগ্রহণযোগ্য।

প্রথমেই নজর দেয়া যাক ধারা ৯ এর ১ (খ) তে । এতে বলা হয়েছে ‘সরকারি বা কোন সংবিধিবদ্ধ সংস্থায় চাকুরিরত স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী ব্যক্তি’ নির্ধারিত অফিস সময়ের বাইরে ও ছুটির দিনে ‘স্ব স্ব কর্মস্থলের জেলার বাহিরে’ ‘নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের লিখিত পূর্বানুমোদন সাপেক্ষে’ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা চেম্বারে চিকিৎসা সেবা দিতে পারবেন।

সরকারি চাকরিরত ডাক্তার/নার্স গন যারা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও সেবা প্রদান করেন তারা মূলত নিজ কর্মস্থলের আশেপাশেই তা করে থাকেন । নিজ কর্মস্থলের জেলার বাহিরে গিয়ে বেসরকারি সেবা প্রদান আদতে অসম্ভব প্রায় । সেক্ষেত্রে এই আইন বলবত হলে বাস্তবে অনেকেই আর বেসরকারিভাবে চিকিৎসা সেবা কার্যক্রমে যুক্ত থাকতে পারবেন না । আবার অনেকেই সরকারি চাকরি ত্যাগ করতে বাধ্য হবেন । 
এই ধারাটি সংশোধন করা দরকার । অন্যথায় বিশৃংখলা সৃষ্টির আশংকা থেকে যায় ।

ধারা ১৮ তে বিদেশী চিকিৎসা সেবা প্রদানকারীদের সম্পর্কে বলা হয়েছে – ‘সরকারের পূর্বানুমতি গ্রহণ সাপেক্ষে সরকারি-বেসরকারি চিকিৎসা সেবা প্রতিষ্ঠানে বিদেশী চিকিৎসা সেবা প্রদানকারী নিয়োগ করা যাইবে । 
এখানে সরকারের অনুমতির পাশাপাশি বিদেশী সেবাদানকারীদের বাংলাদেশে চিকিৎসা সেবা প্রদানের জন্য লাইসেন্সিং পরীক্ষা পাশ ও নিবন্ধনের বাধ্যবাধকতা রাখা দরকার ।

ধারা ৬ (১) অনুযায়ী, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পরিদর্শন, প্রবেশ, তল্লাশি ও জব্দ করার ক্ষমতা সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ ‘সরকার বা সরকার কর্তৃক ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ বা তৎকর্তৃক নিযুক্ত কোন কর্মকর্তা বা কমিটি কোন চিকিৎসা সেবা প্রতিষ্ঠানে যেকোন সময়ে প্রবেশ, পরিদর্শন, রেজিস্টার ও চিকিৎসা সেবা সংক্রান্ত যন্ত্রপাতি বা নমুনা বা কাগজপত্র পরীক্ষা এবং জব্দ করতে পারবে।

এখানে পরিদর্শক টিমে অন্তত একজন সরকারি ডাক্তারের অন্তর্ভুক্তি আবশ্যক করা উচিৎ ।

ধারা ২০ (১) এ বলা হয়েছে- স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক এই আইনের অধীনে পেশাগত দায়িত্ব পালনে বা চিকিৎসা প্রদানে অবহেলা অপরাধ হিসেবে গন্য হইবে ।

২(২) ধারা অনুযায়ী অবহেলাকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে- স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সেবা গ্রহীতার প্রাপ্য সেবা প্রদান না করা যাহা তাহার পক্ষে ‘বাস্তব অবস্থায় ও মানবিকভাবে’ পালন করা সম্ভব ছিল ।

আগেকার খসড়া আইনে পেশাগত অবহেলাকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছিল এভাবেঃ 'ভুল চিকিৎসা' যা দ্বারা 'রোগ মুক্তি ঘটে না' বা 'বিলম্বিত হয়'।

সে তুলনায় এবারের সংজ্ঞায়ন ভালো হয়েছে । তবে আরো স্পেসিফিক করা যায় কিনা তা নিয়ে ভাবা যেতে পারে ।

খসড়া এই আইনের কিছু ভালো দিক হলোঃ 
ধারা ২১(১) –এ চিকিৎসা সংক্রান্ত অভিযোগ আদালতে আমলে নেয়ার আগে ন্যুনতম দুইজন চিকিৎসক সহ তিন সদস্যের তদন্ত কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন আবশ্যক করা হয়েছে । কমিটিতে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অন্তর্ভুক্তি আবশ্যক করা হয়েছে।

২১(৪) ধারায় বলা হয়েছে - আদালতের নির্দেশনা ব্যতিত কোন স্বাস্থ্যসেবা প্রদনকারী ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা যাইবে না ।

ধারা ২০ (২) এ বলা হয়েছেঃ স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী ব্যক্তির প্রতি হুমকি প্রদান , ভীতি প্রদর্শন, দায়িত্ব পালনে বাধাদান, আঘাত করা সহ যেকোন ধরণের অনিষ্ট সাধন বা স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের কোন সম্পত্তির ক্ষতিসাধন, বিনষ্ট, ধ্বংস বা উক্তরুপ সম্পত্তি নিজ দখলে গ্রহণ অপরাধ বলিয়া গন্য হইবে।

ধারা ২১(৫) অনুযায়ী ২০(২) এ উল্লেখিত অপরাধ হবে আমলযোগ্য ও জামিন অযোগ্য।

এগুলো এই আইনের ভালো দিক ।

তবে ধারা ২২(২) অনুযায়ী ২০(২) এ উল্লেখিত অপরাধের শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে অনধিক পাঁচ লক্ষ টাকা অর্থদন্ড বা তিন বছর কারাদন্ড বা উভয় দন্ড।

শাস্তির পরিমাণ কম হয়েছে । শাস্তির মাত্রাকে আরো সংজ্ঞায়িত করা দরকার । ক্ষতির পরিমাণ বা আঘাতের প্রকৃতি অনুযায়ী অপরাধের শাস্তি নির্ধারণ হওয়া উচিৎ। ২০ লক্ষ টাকা ক্ষতিসাধন করলে অনধিক পাঁচ লক্ষ টাকা অর্থদন্ড কি গ্রহণযোগ্য? অথবা শারীরিকভাবে গুরুতর আঘাত করা হলে তিন বছর কারাদন্ড কি যথেষ্ট হবে? বিভিন্ন দেশে এইরুপ অপরাধের শাস্তি আরো বেশি ।

এখানে ‘অনধিক’ এর স্থলে ন্যুনতম শব্দ প্রয়োগ করা উচিৎ হবে ।

 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না