ঢাকা      বুধবার ২১, নভেম্বর ২০১৮ - ৭, অগ্রাহায়ণ, ১৪২৫ - হিজরী

বিসিএসে প্রশাসনে তৃতীয় হওয়া ডা. তাহমিদের জীবনের গল্প

মেডিভয়েস রিপোর্ট: বাবার ইচ্ছে ছিল ছেলেকে বড় একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে গড়ে তোলার। আর মায়ের স্বপ্ন ছেলেকে চিকিৎসক হিসেবে দেখা। ছোটবেলা থেকে তাহমিদ স্বপ্ন দেখতেন বড় হয়ে একজন বড় সরকারি কর্মকর্তার। ৩৫তম বিসিএসে মা তহমিনা বেগমের স্বপ্ন পূরণ হলো। আর ৩৭তম বিসিএসে পূরণ হলো বাবা মাঈনুল ইসলামের কাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন। 

যাকে নিয়ে এতক্ষণ কথা বলছি তিনি আর কেউ নন তিনি ডা. তাহমিদ তমাল। বর্তমানে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ভোলাহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক হিসেবে বর্তমানে দায়িত্বপালন করা ডা. তাহমিদ মেডিভয়েসকে জানিয়েছেন তার জীবনের গল্প।

বেড়ে ওঠার গল্প 
রাজশাহীর চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সুন্দরপুর ইউনিয়নের বাগডাঙ্গা গ্রামে শৈশব কেটেছে ডা. তাহমিদের। বেড়ে উঠেছেন সবুজ-শ্যামল পরিবেশে। বাবা মাঈনুল ইসলাম স্থানীয় বাজারের ফার্মেসি ব্যবসায়ী। ছোটবেলা থেকেই তাহমিদ মনে পুষতেন সরকারি কর্মকর্তা হওয়ার স্বপ্ন।

এ ব্যাপারে মেডিভয়েসকে ডা. তাহমিদ তমাল বলেন, আসলে ডাক্তার হবো এ ইচ্ছাটা আমার কখনই ছিল না। কিন্তু মায়ের ইচ্ছায় এইচএসএসি পাশের পর মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা দেই। প্রথমবারেই রাজশাহী মেডিকেলে চান্স পাই। ২০০৯ সালে মেডিকেল লাইফ শুরু হয়। ২০১৪ সালে এমবিবিএস পাস করি।

মেডিকেল লাইফের গল্প
রাজশাহী মেডিকেল কলেজের সময়কালটা সবচেয়ে আনন্দঘন কেটেছে তাহমিদের। পড়াশোনার পাশাপাশি বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে আড্ডা আর হৈ হোল্লরে কাটিয়েছেন এ মেধাবী শিক্ষার্থী। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা, গান আর জমজমাট আড্ডায় কীভাবে যে মেডিকেল লাইফটা শেষ হয়ে গেল। 

রামেক তাকে ব্যাপক টানে। মেডিভয়েসের সঙ্গে কথা বলার সময় স্মৃতিকাতর হন তাহমিদ। তিনি বলেন, আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো রাজশাহী মেডিকেলে পড়া। এটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন। ব্যাপক এনজয় করেছি মেডিকেল লাইফে। আমাদের বিশাল একটা ফ্রেন্ড সার্কেল ছিল। সবাইকে নিয়ে সবসময় আমরা আনন্দে থাকতাম। তবে যা করেছি তা পড়াশোনার পাশাপাশি করেছি, পড়াশোনা বাদ দিয়ে নয়।

মেডিকেল শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ব্যাপক চাপের কারণে পড়াশোনার বাইরে কোনো সময় পাওয়া যায় না-এমন কথা মানতে নারাজ ডা. তাহমিদ তমাল।

এ প্রসঙ্গে তিনি মেডিভয়েসকে বলেন, মেডিকেলে পড়াশোনার বাইরে সময় পাওয়া যায় না-এটা সত্য নয়। কারণ, যেকোনো কাজ ছোট হোক বা বড় হোক যদি নিয়মিত একটি নির্দিষ্ট সময় দেয়া হয় তবে সেক্ষেত্রে কাজটি বড় বা কঠিন থাকে না। আমি এবং আমাদের বন্ধুদের নির্দিষ্ট সময় থাকতো একাডেমিক পড়াশোনা করার।  আর বাকি সময়টা আমরা আনন্দ করতাম।

মেডিকেল লাইফে তাহমিদ নিজে কতটা সময় পড়তেন এমন বিষয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পরীক্ষার সময় বেশি পড়তে হতো, তবে অন্য সময় প্রতিদিন প্রায় দুই ঘণ্টা পড়লেই হয়ে যায়। এখানে রেগুলারিটিটাই ইমপোর্টেন্ট।’

এ বিষয়ে ডা. তাহমিদের কথা হল- কেউ যদি একাডেমিক ব্যাপারে নিয়মিত নির্দিষ্ট একটা সময় দেয় তাহলে তার মেডিকেল পড়াশোনাসহ যেকোনো পড়াশোনায় কোনো সমস্যা হবে বলে আমি মনে করি না। এজন্য দিনের পড়া দিনেই শেষ করতে হবে। পড়া কোনোমতেই জমানো যাবে না। 

বিসিএস প্রস্তুতির গল্প
মেডিকেল ইন্টার্নির কঠিন সময়ে ডিউটির ফাঁকে ফাঁকে বিসিএসের জন্য প্রস্তুতি নেন ডা. তাহমিদ তমাল। বাসায় এসেই সামান্য রেস্ট নিয়ে শুরু করতেন বিসিএস প্রস্তুতি। এজন্য নির্দিষ্ট কোনো গেম প্ল্যান ছিল না, কিন্তু তিনি সময় নষ্ট করতেন না। যতটুকু সময় পেতেন ততটুকুকে কাজে লাগাতেন।

যার কারণে ইন্টার্নি অবস্থাতেই ৩৫তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়ে স্বাস্থ্য ক্যাডারে যোগ দেন এ মেধাবী শিক্ষার্থী। কিন্তু থেমে থাকেনি তার পড়ালেখার প্রস্তুতি। এরপর থেকে প্রতিটি প্রিলিতেই তিনি উত্তীর্ণ হয়েছেন।

বিসিএস প্রস্তুতি হিসেবে প্রচলিত গাইড বই, কিছু রেফারেন্স বই, বাংলা ব্যাকরণ, ইংলিশ ব্যাকরণ বা গাইড, এসএসসি ও এইচএসসির বই ইত্যাদির দিকে জোর দিতেন। এছাড়াও একই সঙ্গে নিয়মিত দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পত্রিকা পড়া, বিভিন্ন মুভি দেখা ও গান শোনতেন তিনি।

ডা. তাহমিদের মতে, ৩৫তম বিসিএসের প্রস্তুতিটাই তাকে একটা ভিত্তি গড়ে দিয়েছে। এর পর থেকে তিনি টু দ্যা পয়েন্ট ফোকাসড ছিলেন। যার কারণে পরের বারও তিনি বিসিসিএস প্রিলিতে উত্তীর্ণ হন। ৩৭তম বিসিএসে তিনি প্রশাসনে তৃতীয় হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। 

বিসিএসে তার সফলতার মূল রহস্য জানতে চাইলে তিনি অকপটে বলেন, পরিশ্রম, অধ্যাবসায়, ধৈর্য এসবের সমন্বয় হলে সফলতা আসবেই।

বিসিএসে প্রস্তুতির রুটিন সম্পর্কে 
স্বাস্থ্য ক্যাডার থেকে প্রশাসনের যাওয়ার বিষয়ে ডা. তাহমিদ বলেন, এটা হচ্ছে, কিছুটা শখের বশে, কিছুটা ব্যক্তিগত জেদের বশে। আমার বন্ধুরা যেখানে প্রশাসনের ক্যাডারে যেতে পারে আমি ডাক্তার হওয়ার কারণে মেধাবী হওয়ার পরও সেখানে কেন যেতে পারব না?

এটা প্রমাণ করার ইচ্ছা থেকেই মূলত পরের পরীক্ষাগুলো দেয়া। 

প্রশাসনে যাওয়ার পর কোন কোন বিষয় বিশেষ গুরুত্ব দেবেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে মেডিভয়েসকে ডা. তাহমিদ বলেন, আমার দুটো টার্গেট থাকবে। প্রথমতঃ সরকারের পক্ষ থেকে অর্পিত দায়িত্ব যথাযথ পালন করা। দ্বিতীয়তঃ চিকিৎসকদের কর্মস্থলটা নিরাপদ করতে ভূমিকা রাখা, তাদের বিভিন্ন অব্যক্ত কথাগুলো নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পৌঁছে দেয়া। 

তিনি আরও বলেন, কর্মস্থলে চিকিৎসকদের নিরাপত্তার বিষয়টা প্রধান সমস্যা বলে মনে হয়। যদি তাদের কর্মস্থলের নিরাপত্তার জন্য কিছু করতে পারি তাহলে আমি খুব খুশি হবো, এ বিষয়ে আমি চেষ্টা করবো। 

চাকরি জীবনে সততার বিষয়টা সবার আগে গুরুত্ব দেবেন তাহমিদ। তিনি মনে করেন, যে কোনো চাকরিতে সততার বিষয়টা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া শৃংখলা ও মানবিকতার বিষয়টাও তিনি প্রাধান্য দেবেন। যদিও মানবিকতার বিষয়ে চিকিৎসকদের তুলনায় প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের কাজের সুযোগ কম থাকে।

বিসিএস পরীক্ষার্থীদের জন্য পরামর্শ
চিকিৎসকদের মধ্যে যারা বিসিএস দেবেন তাদের উদ্দেশে ডা. তাহমিদের পরামর্শ হলো, দুই নৌকায় পা দেয়া যাবে না। আগে সিদ্ধান্ত নিতে হবে আপনি কী করবেন? যদি বিসিএসে অংশ নেয়ার পরিকল্পনা করেন তখন পরিপূর্ণ সময় বা ফোকাসটা সেখানেই দিতে হবে। এই ফোকাসটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ, একজন চিকিৎসক যখন বিসিএস দেয়ার পরিকল্পনা করবেন তখন শুধু বিসিএস প্রস্তুতিই নেবেন।

একই সঙ্গে পোস্ট গ্রাজুয়েশন ও বিসিএস পরীক্ষা দিলে কোনোটাই ঠিকমত হয় না বলে মনে করেন তিনি। এছাড়া একবার দুইবার না হলে হতাশ হওয়া যাবে না। সিরিয়াসলি মনোযোগ দিয়ে পড়লে আজ হোক কাল হোক একসময় বিসিএস তার হবেই।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বাংলাদেশ থেকে পাস করা ডাক্তাররা ভারতে মানসম্মত সেবা দিচ্ছে: শ্রিংলা

বাংলাদেশ থেকে পাস করা ডাক্তাররা ভারতে মানসম্মত সেবা দিচ্ছে: শ্রিংলা

মেডিভয়েস রিপোার্ট: বাংলাদেশ থেকে পাস করা ডাক্তাররা ভারতে মানসম্মত সেবা দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন…

শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের ডা. তাহসিনা আর নেই

শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের ডা. তাহসিনা আর নেই

মেডিভয়েস রিপোর্ট: বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের প্রথম ব্যাচের ছাত্রী ডা. তাহসিনা ইউনুস…

ঢামেকে অবৈতনিক প্রশিক্ষণের জন্য দরখাস্ত আহবান

ঢামেকে অবৈতনিক প্রশিক্ষণের জন্য দরখাস্ত আহবান

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগে ৬ মাস অবৈতনিক প্রশিক্ষণ গ্রহণের জন্য…

৩৯তম বিসিএস’র দ্বিতীয় পর্বের ভাইভা শুরু ২ ডিসেম্বর

৩৯তম বিসিএস’র দ্বিতীয় পর্বের ভাইভা শুরু ২ ডিসেম্বর

মেডিভয়েস রিপোর্টঃ ৩৯তম বিসিএসে (স্বাস্থ্য ক্যাডারের বিশেষ বিসিএস) এমসিকিউ পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের দ্বিতীয়…

ভোটের মাঠে সরব চিকিৎসকরা

ভোটের মাঠে সরব চিকিৎসকরা

মেডিভয়েস রিপোর্ট: সামনেই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ নির্বাচনের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে…

খুলনা সিভিল সার্জন কার্যালয়ে ‍দুদক

খুলনা সিভিল সার্জন কার্যালয়ে ‍দুদক

মেডিভয়েস ডেস্ক: স্বাস্থ্য সনদ বাবদ অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণের অভিযোগে খুলনার সিভিল সার্জন…

আরো সংবাদ














জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর