ঢাকা      বৃহস্পতিবার ২২, অগাস্ট ২০১৯ - ৭, ভাদ্র, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. ঐন্দ্রিল ভৌমিক

মেডিকেল অফিসার, পানিহাটি স্টেট জেনারেল হসপিটাল, ভারত ।


হাসপাতালের অতিথি

সরকারি হাসপাতালে কিছু রোগী বিছানা দখল করে বছরের পর বছর থেকে যায়। গৃহহীন, খাদ্যহীন, আত্মীয়-স্বজনহীন নরনারীর এর থেকে ভাল থাকার জায়গা আর কিই বা হতে পারে। তিন বেলা খাবার, মাথার উপর পাখা, লোডশেডিং হলে সাথে সাথে জেনারেটর, রোজ নতুন নতুন রঙের চাদর, চাইলেই হাসপাতালের ড্রেস আর না চাইলেও চারপাশে কথা বলার অজস্র মানুষ। তার সাথে আবার অসুখ বিসুখ করলেই ফ্রিতে চিকিৎসা।

মোদ্দা কথা একজনের বাঁচার জন্য যা যা দরকার একটা সরকারি হাসপাতালে পুরোটাই মেলে এবং সম্পূর্ণ নিখরচায়।

আমি যখন খড়গ্রাম গ্রামীণ হাসপাতালে চাকরি করতাম, তখন মকিনা (নাম পরিবর্তিত) বলে একজন হাঁপানির রোগী ভর্তি ছিল। আমি যে ডাক্তারবাবুর বদলি হয়ে গেছিলাম সেই দাদা হাসপাতালের সাথে আমাকে মকিনার চার্জ হ্যান্ড ওভার করে গেছিল।

মকিনার সারা গায়ে আবে ভর্তি। দেখতে অত্যন্ত কদাকার। ভিক্ষা করার জন্য একেবারে আদর্শ চেহারা।

শ্বাসকষ্ট কম থাকলেই সে ভিক্ষা করতে বেরিয়ে পড়ত। আবার দুপুরের খাওয়ার সময় ঠিক ফেরত আসত। ঈদ বা অন্য কোনো অনুষ্ঠানের দিনে বাইরে কোথাও খাবার জুটে গেলে কিচেনের কাউকে ফোন করে বলে দিত খাবে না।

খাবার নষ্ট হোক সে কোনো দিনও চাইত না। কোনো রোগী হাসপাতালের খাবার খেতে না চাইলে সে বোঝাত, ‘দেখ আমি পাঁচ বছর ধরে হাসপাতালের খাবার খাচ্ছি। এখনও একবারও পেটের রোগ হয়নি।’ তার ঐ কদাকার চেহারার দিকে চেয়ে রোগীরা আদৌ ভরসা পেত কিনা জানি না।

আমি খড়গ্রাম হাসপাতালে যোগ দিয়েই মকিনাকে হাসপাতাল থেকে ছুটি করানোর জন্য উঠেপড়ে লেগেছিলাম। মকিনা আমায় বলেছিল, ‘ডাক্তারবাবু, আমি পাঁচ বছর ধরে আছি, আর তুমি দুদিন এখানে এসেই আমাকে তাড়াবে। দেখা যাক তোমার কত ক্ষমতা।’

আমার ইগো রীতিমত আহত হয়েছিল। প্রথম কয়েকদিন এসিএমওএইচ অফিসে দৌড়াদৌড়ি করলাম মকিনাকে সরানোর জন্য।

শেষে একদিন তিন-চারজন সিস্টার দিদি মিলে বলল, ‘থাকুকনা ডাক্তারবাবু। মকিনা অনেকদিন ধরে আছে। মায়া পড়ে গেছে। তাছাড়া ও সেরকম ক্ষতিকর নয়।’

আমি বললাম, ‘কিন্তু হাসপাতালের একটা অমূল্য বেড দিনের পর দিন আটকে রাখবে?’

দিদিরা বলল, ‘আমরা একা একা নাইট করি। রাতে কিছু ঝামেলা হলে মকিনা পাশে দাঁড়ায়। মাতাল-দাঁতাল, নেতা-মন্ত্রী কোনো কিছু মানে না। আমাদের সাথে কেউ খারাপ ব্যবহার করলে ও গালাগালি দিয়ে তার ভুত ভাগিয়ে দেয়। এমনিতেই তো আমাদের হাসপাতালে একটা সিকিউরিটির লোকও নেই।’

অতএব মকিনা থেকে গেল। সাড়ে তিনবছর পরে ঐ হাসপাতাল থেকে আমার বদলি হওয়ার সময় মকিনাই সব থেকে বেশি কেঁদেছিল।

শহরের হাসপাতালে আসার পর আবার অন্য অভিজ্ঞতা হলো। মকিনার না হয় সাতকুলে কেউ নেই। কিন্তু এখানে যে সব রোগী ভর্তি থাকে তাদের অনেকেরই ছেলে মেয়ে, নাতি পুতি সব আছে।

তা স্বত্বেও বছরের পর বছর রোগী বেড আটকে হাসপাতালে পরে থাকে। ছুটি লিখলে বাড়ির কেউ নিতে আসে না।

আমাদের হাসপাতালের মেল এক নম্বর ওয়ার্ডে একজন রোগী ভর্তি ছিল প্রায় আড়াই বছর। বাড়ির লোকের কোনও সাড়া শব্দ পাওয়া যায়নি। সে মারা যাওয়ার পরে বাড়ির লোকের ঢল নামল। সুন্দর সুন্দর পোষাক আশাকের পুরুষ ও নারীরা ব্যস্ত ওয়ার্ডে ঘন ঘন যাতায়াত শুরু করল। কিছুক্ষণের মধ্যে কানে এল আলোচনা, এসব সরকারি হাসপাতালে কোনো চিকিৎসা হয় না। তাদের রোগী সম্পূর্ণ বিনা চিকিৎসায় মারা গেছে।

কী আর জবাব দেব। মৃত মানুষটি তখনও যে জামাকাপড় পরে আছে সেটা কোনো ডাক্তার বাবুর। তার বিছানার পাশে টেবিলের উপর যে থালা বাসন রয়েছে সেটা কোনো সিস্টার দিদির দেওয়া। প্রতিদিন পরম যত্নে এবং বিনা স্বার্থে তার মলমূত্র পরিষ্কার করে দিয়েছে ওয়ার্ডের কোনো আয়া দাদা অথবা সুইপার। অশক্ত মানুষটিকে ধরে ধরে দিনের পর দিন তারাই খাইয়েছে।

এদের মত নোংরা নরকের কীটের কোনও প্রশ্নের জবাব দিতেও ঘৃণা বোধ হয়।

ফিমেল ওয়ার্ডে দীর্ঘদিন ধরে ভর্তি আছে অন্তত পাঁচজন মহিলা। তার মধ্যে একজনের ছেলে, ছেলের বউ, নাতি-পুতি সব আছে। ছেলে লায়েক হওয়ার পর ঘাড় ধরে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। এখান ওখান ঘুরে তার ঠাঁই হয়েছে আমাদের হাসপাতালে।

বুড়ি বলে, ‘ছেলের জন্য আমার মন খারাপ হয় না। মন খারাপ হয় নাতি দুটোর জন্য। ওরা আমার বড্ড ন্যাওটা ছিল।’

কেউ টাকা পয়সা দিলে, জামা কাপড় দিলে বুড়ি জমিয়ে রাখে। পুজোর আগে বাড়ি যায়। নাতিদের জন্য জামা কিনে নিয়ে যায়। এমনকি নিজের সুপুত্রের জন্যেও জামা কাপড়। দিয়ে সেদিনই ফেরত আসে।

ইদানীং আরেকটা ট্রেন্ড শুরু হয়েছে। দূর্গা পুজোর ঠিক আগে আগেই অনেকেই বাড়ির বয়স্ক লোকটিকে হাসপাতালে ভর্তি করে যাচ্ছেন। আবার পুজো কাটলে ফেরত নিয়ে যাচ্ছেন। হাসপাতালে বাড়ির বয়স্ক মানুষটিকে গ্যারেজ করে তারা নিশ্চিন্তে রাজস্থান, লাদাখ অথবা কাশ্মীর ঘুরে আসছেন।

গত বছর নবমীতে এই সব মানুষগুলোর জন্য হাসপাতালের ওয়ার্ডে বড় পর্দায় পুজোপরিক্রমা দেখার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এবার আশা করা যায় আরও বড় পর্দার ব্যবস্থা হবে।

দয়া করে কেউ বৃদ্ধ মানুষকে বাড়িতে একা রেখে বেড়াতে চলে যাবেন না। নানা রকম বিপদ আপদ ঘটতে পারে। তার চেয়ে তাদের আমাদের পানিহাটি হাসপাতালে ভর্তি করে যেখানে খুশি গিয়ে স্ফূর্তি করুন। দেখবেন, হাসপাতালে তাদেরও সময় খারাপ কাটবে না।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


সম্পাদকীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

ডেঙ্গু রোগীদের ব্যবস্থাপনায় মশারীর বিকল্প প্রস্তাব

ডেঙ্গু রোগীদের ব্যবস্থাপনায় মশারীর বিকল্প প্রস্তাব

ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার জন্য সব সরকারি হাসপাতাল এবং কিছু কিছু বেসরকারি হাসপাতাল…

ডেঙ্গু নিয়ে ব্যবসা করার চেষ্টা করবেন না 

ডেঙ্গু নিয়ে ব্যবসা করার চেষ্টা করবেন না 

গুজবে কান দেয়া হুজুগে মনুষ্য জাতির এক সহজাত প্রবৃত্তি। এই সুযোগটাকেই কাজে…

বেসরকারি মেডিকেলে ভর্তি প্রক্রিয়া ও কিছু প্রস্তাবনা

বেসরকারি মেডিকেলে ভর্তি প্রক্রিয়া ও কিছু প্রস্তাবনা

কিছুদিন পরেই সকল সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল কলেজসমূহে ভর্তি পরীক্ষা। শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের সাথে সাথে…

আরো সংবাদ
























জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর