ঢাকা      মঙ্গলবার ২৩, অক্টোবর ২০১৮ - ৮, কার্তিক, ১৪২৫ - হিজরী



ডা. জয়নাল আবেদিন টিটু

সদস্য, বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশন,
সদস্য, বিসিএস (হেলথ) অফিসার'স এসোসিয়েশন।


প্রেসক্রিপশনে ওষুধের ট্রেড নাম লিখাই উত্তম

দুর্নীতি দমন কমিশন ডাক্তারদের ব্যাপারে বেশ কয়েকটি সুপারিশ করেছে । বেশিরভাগ সুপারিশই ভাল । তবে, এর মধ্যে দু'একটি নেতিবাচক সুপারিশও আছে।

নেতিবাচক সুপারিশগুলোর একটি হল, 'ডাক্তারগণ ট্রেড নামে ওষুধ লিখবেন না, ওষুধ লিখতে হবে জেনেরিক নামে'। এই সুপারিশটি করার আগে, যারা এই বিষয়ে বিশেষজ্ঞ তাদের মতামত নেয়া প্রয়োজন ছিল ।

আইনের উদ্দেশ্য জনকল্যাণ এবং সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষা করা । এই সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হলে জনকল্যাণ ব্যাহত হবে । কারণ, বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে রোগীদের জন্য ওষুধের ট্রেড নামই লিখা উত্তম ।

একজন ডাক্তার রোগী দেখার পর ওষুধ প্রেসক্রাইব করেন । সেই রোগী পাঁচ বা সাতদিন পর ফলো আপ নেওয়ার জন্য পুনরায় ডাক্তার সাহেবের কাছে যান । রোগের উপসর্গ (symptoms and signs) কতটুকু কমলো, তার ভিত্তিতে ডাক্তার সাহেব তার প্রেসক্রাইব করা ওষুধের কার্যকারিতা (efficacy) বুঝতে পারেন । ওষুধ প্রেসক্রাইবিং ডাক্তার ছাড়া আর কেউ এ অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে না ।

নিজের অভিজ্ঞতা থেকে উদাহরণ দেই ।

(Amoxyclillin & Clavulonic acid) ওষুধটি Augmentin এবং Klavox ট্রেড নামে কিনতে পাওয়া যায় । বড় বড় ইনজুরী, টনসিলে পূঁজ জমে যাওয়া, কানে মাড়িতে পূঁজ হওয়া-- এসব ক্ষেত্রে গ্ল্যাক্সো কোম্পানীর Augmentin খুব ভাল কাজ করে । কিন্তু, একই জেনেরিক নামের Klavox-এর efficacy এর ধারে কাছেও নেই ।।

Peripheral neuropathy-তে Pregabalin প্রেসক্রাইব করতে হয় । সব কোম্পানির Pregabalin-এ কিছু না কিছু পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া আছে । কিন্তু বাংলাদেশের স্থানীয় একটি কোম্পানির Pregabalin-- যার ট্রেড নাম ''Ne..", এর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া সব চেয়ে কম।। কাজ করে খুব ভাল । একজন ডাক্তার তার প্রতিদিনের পরিক্রমায় এমন অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন করে থাকেন ।

যদি জেনেরিক নামে ওষুধ লিখার বিধান চালু হয়, তাহলে ডাক্তার সাহেবকে জেনেরিক নামেই ওষুধ লিখতে হবে । রোগী যখন দোকান থেকে ওষুধ কিনতে যাবেন, তখন ট্রেড নামটি কে চয়েস করবে ? ওষুধের দোকানী ? কোন কোম্পানীর ওষুধ ভাল, আর কোন কোম্পানীরটা খারাপ, তা তো তার জানা নেই । ওষুধ ব্যবসায়ীর, ফার্মাসীতে মাস্টার্স ডিগ্রীর মত একাডেমিক ডিগ্রী নেই, এবং একজন ডাক্তারের মত একাডেমিক বা ক্লিনিক্যাল ট্রায়েলের অভিজ্ঞতাও নেই ।

যে কোম্পানীর ওষুধ বিক্রয় করলে বেশি টাকা লাভ হবে, তিনি তা-ই বিক্রয় করবেন।। এতে রোগী ভাল হল না খারাপ হল, তা তার বিবেচ্য নয় । যদি কোন বাজে কোম্পানী ওষুধের মূল উপাদান না-দিয়ে আটা বা ময়দা দিয়ে ওষুধ বানায়, আর বিরাট লাভের লোভ দেখিয়ে ওষুধের দোকানদারের মাধ্যমে বিক্রয় করে, তাহলে রোগীর মরণ ছাড়া আর কিছু হবে না।

অনেকেই বলছেন, ডাক্তার সাহেব নির্দিষ্ট ওষুধ কোম্পানী থেকে উপহার পেয়ে, সেই কোম্পানীর ওষুধ লিখেন । জেনেরিক নামে ওষুধ লিখলে এই প্রবণতা বন্ধ হবে । হ্যাঁ, তখন খাল কেটে কুমির আনা হবে । নিশ্চিত থাকুন, তখন ওষুধের দোকানী নির্দিষ্ট ওষুধ কোম্পানি থেকে নগদ টাকা বা উপহার গ্রহণ করে আপনাকে বাজে কোম্পানীর ওষুধ গছিয়ে দিবে।

আমি নিজে কোন ওষুধ কোম্পানি থেকে কোন উপহার গ্রহণ করি না । যে উপহার সৎ এবং ন্যায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়, সেই উপহার গ্রহণ করা আমি অসঙ্গত মনে করি। আমার দুই দশকের ডাক্তারি জীবনে কোনদিন কোন ডায়াগনোস্টিক সেন্টার থেকে এক পয়সাও কমিশন গ্রহণ করিনি । এই হারাম পয়সাকে ঘৃণা করি, যেমন হারাম মনে করে ঘৃণা করি কুকুরের পায়খানাকে । এমনকি, যারা হারাম উপার্জন করে, তাদের সাথে আত্মীয়তা বা বন্ধুত্ব---কোনটিই তৈরি করি না ।

আইন করার আগে দেশের জনমানুষের মানবিক বোধ, নৈতিক বোধ উচ্চকিত করার জন্য ব্যাপকভাবে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দিন। দেশের মানুষের নীতি নৈতিকতা সংশোধন হলে এত আইন তৈরি করার প্রয়োজন হবে না ।

একজন ডাক্তার ক্রমাগত ট্রায়েল এবং অভিজ্ঞতার কারণে কোন কোম্পানির ওষুধ ভাল আর কোনটি খারাপ তা ভাল করেই জানেন । একজন ওষুধের দোকানি বা একজন রোগীর পক্ষে তা জানা সম্ভব নয় । দুর্নীতি দমন কমিশনের অন্যান্য সুপারিশ ভাল হলেও, ওষুধের জেনেরিক নাম লেখার এই সুপারিশটি একটি মন্দ সুপারিশ। এটি আইনে পরিণত হলে মানুষের অকল্যাণ হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


সম্পাদকীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

গুগলে সার্চ দিয়ে রোগের লক্ষণ জানার আগে যা জানা উচিত

গুগলে সার্চ দিয়ে রোগের লক্ষণ জানার আগে যা জানা উচিত

প্রায় সবার হাতের নাগালে ইন্টারনেটের সুবিধা চলে আসায় আমরা অনেকেই অসুস্থ হলে…

‘অধিকার অর্জন করতে হলে আন্দোলনের পথে হাঁটো’

‘অধিকার অর্জন করতে হলে আন্দোলনের পথে হাঁটো’

৭ অক্টোবর চিকিৎসক সম্মিলনীতে সরকার প্রধান বুঝিয়ে দিলেন– ‘অধিকার অর্জন করতে হলে…

শব্দযুদ্ধ?

শব্দযুদ্ধ?

ভদ্র মোরা, শান্ত বড়ো, পোষ-মানা এ প্রাণ বোতাম-আঁটা জামার নীচে শান্তিতে শয়ান।" …

আরো সংবাদ














জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর